ছোটবেলার মত কান্না না পেলেও খালি হয়ে যায় ভেতরটা

জয়দীপ রায়

তারপরে একসময় ট্রেন এসে থামে মনোহরপুর জংশনে। রাত তিনটে পঞ্চাশ। কাঁটায় কাঁটায় শিডিউলড্ টাইমেই একনম্বর প্ল্যাটফর্ম ভরে দাঁড়ায় আপ হাওড়া কোরাপুট এক্সপ্রেস।
ট্রেনের এই আপডাউনের কনসেপ্টটা খুব গোলমেলে। শিয়ালদা থেকে বনগাঁ লোকাল ছাড়লে আপ হয়। আবার শিয়ালদা থেকেই নামখানা লোকাল ছাড়লে ডাউন হয়। একবার একজন বুঝিয়ে দিয়েছিল। আপ আর ডাউন জায়গাটার উচ্চতার উপর নির্ভর করে। মিন সি লেভেল। শিয়ালদার চেয়ে বনগাঁ উঁচুতে তাই বনগাঁ গেলে আপে যেতে হয়। নামখানা নীচুতে। সমুদ্রের দিকে। সেইজন্যে ডাউন। 
ট্রেন হাওড়া ছাড়ার আগে থেকেই কোথায় নামা হবে সেটা নিয়ে কনফিউশন ছিল। যাব সারান্ডা। বারবিলের কাছে বোলানিতে জঙ্গলের মধ্যে একটা গেস্ট হাউসে থাকবো। সারান্ডা গেস্ট হাউস। পিতম দিল যোগাযোগটা। বললো ওখানে থেকেই থলকোবাদ কিরিবুরু মেঘাতাবুরু সব ঘুরে নেওয়া যাবে। লতিফ তার নাম্বার দিয়ে বলল, পার্ক সার্কাসের মানুষ ওরা। খানা বহত বড়িয়া বানায়।
বারবিল যাবার সবচেয়ে ভাল ট্রেন হল হাওড়া বারবিল জনশতাব্দী এক্সপ্রেস। টিকিট সবসময়ই অ্যাভেইলেবল্। কিন্তু ছাড়ে সেই সাতসকালে। দুপুরবেলা পৌঁছায়। ফলে দিনটা মাটি। আমরা গেস্ট হাউস মালিকের বারণ না শুনে বম্বে লাইনের মনোহরপুরের টিকিট কাটলাম। মনোহরপুর থেকে বারবিল মাত্র ষাট কিলোমিটার। ট্রেন থেকে নেমে সকাল ছ’টা নাগাদ গাড়ি ছাড়তে পারলে আটটা সাড়ে আটটার মধ্যে পৌঁছে যাব আমরা।
লতিফ মিঁঞার ছেলে বলল, মনোহরপুর হো কে আয়েঙ্গে, মাগর এরিয়া পুরা নক্শালাইট হ্যায়। বারবিল আনেকি কোই গাড়ি বাড়ি নহী মিলেগি। ও বারবিল থেকেও কোনও গাড়ি ঠিক করতে পারলো না। কেউই রাজি হচ্ছে না। যা হয় হবে। হাওড়া থেকে ট্রেন ছেড়ে দিল।
ট্রেনে একজন বললো, মনোহরপুরে ওই রাতদুপুরে নামতে যাবেন কেন। ফালতু ডিসটার্বড্ এরিয়া। চক্রধরপুর নেমে যান। অনেক বড় জায়গা। সকাল ছ’টা বিশে একটা ইন্টারসিটি ছাড়ে, ন’টার মধ্যে আপনাদের বারবিল ধরিয়ে দেবে।
বিদ্যুতের মামা, যিনি বড়াজামদা থাকেন, বললেন, কোনও অসুবিধা হবে না মনোহরপুরে। গাড়ি পাওয়া যাবে না, একটা কথা হল! দিনের আলো ফুটলে আর ভাড়া দিলে বারবিল কেন রসিকবিলে যাবার গাড়িও পাওয়া যাবে। মনোহরপুর দিয়েই যাও বরং, পাহাড়ি রাস্তা, দেখতে দেখতে যেতে পারবে।

ট্রেন টাটা ছাড়ল। আমরা রাতের ট্রেনে পান্ডব গোয়েন্দা বাবলু বিলু ভোম্বলের মত গল্প করতে করতে একসময় চক্রধরপুরও পেরিয়ে গেলাম। মোহনদার কথামত প্ল্যাটফর্ম থেকে তীক্ষ্ণ গলা ভেসে আসল না, খারাব সে খারাব চায়ে..। রাত দুটোয় আর আমাদের মত কে জেগে আছে চা খাবার জন্য। আরও কিছুক্ষণ গল্প করার পর মনোজের মোবাইল অ্যাপ জানিয়ে দিল দশমিনিটের মধ্যে মনোহরপুর আসছে। প্যাক আপ্। শেষরাতের নকশাল অধ্যুষিত ষ্টেশনে আমাদের একা ফেলে দিয়ে কোরাপুট চলে গেল গোটা ট্রেনটা। 
ট্রেন চলে যাবার পর আমরা খেয়াল করলাম আমরা প্রচুর নকশালদের মধ্যে এসে পড়েছি। ওয়েটিং রুম ভর্তি বিভিন্ন বয়সি মাওবাদী। পুরুষ মহিলা বাচ্চা, কালো পাথর কুঁদে তৈরী করা মাওবাদী। কে যেন বলে দিয়েছিল ষ্টেশন চত্বরের বাইরে যাবেন না। আমরা ব্যাগগুলো দুজনের জিম্মায় রেখে বাইরে গেলাম। আলো ফুটতে এখনও এক দেড় ঘন্টা বাকি। প্ল্যাটফর্মের সমান্তরাল যে মোরাম রাস্তাটা চলে গেছে সেখানে অনেক মানুষ। মহিলা বেশী। কেউ কাঁচা ছোলাগাছ বিক্রি করছে। কেউ পুড়িয়ে খাচ্ছে। শীত এদিকে এখনও পুরো মরেনি। আগুন জ্বালিয়ে হাত সেঁকা ছোলাগাছ পোড়ানো সবই চলছে। শুধু সবাই সবাইকে সন্দেহের চোখে দেখছি যেন। ষ্টেশনের বাইরে বের হতে কে যেন বারণ করে দিয়েছিল না!
একটাই চায়ের দোকান খোলা ছিল। দোকানদার বেশ আলাপী। চায়ের প্রশংসা করে আমরা জিজ্ঞেসই করে ফেললাম, বারবিল যায়েঙ্গে। অ্যায়সে কোই প্রবলেম তো নহী হ্যায়?
-বারবিল সাইড মে আভি কম প্রবলেম হ্যায় । আগর আপ আনন্দপুর সাইড মে জানা চাহতে থে তো হম মানা করতে। আপ থোড়া ইন্তজার করিয়ে, সুবহ হোনে দিজিয়ে। ফির নিকলিয়ে।
আমরা ষ্টেশনের ভিতরে এসে ট্রেনের আড্ডাটা কন্টিনিউ করলাম। আলো না ফোটা অব্দি। গাড়ি পেতে খুব অসুবিধা হল। গাড়িই নেই তো কাকে রাজি করাবো। একজন বোলেরো ড্রাইভার একঘন্টা ধরে অপেক্ষা করিয়ে ফোনে বললো, অওর কোই গাড়ি না মিলে তো ফোন করিয়েগা। অনেক খুঁজে পেতে একটা গাড়ি ঠিক হল। বোলেরোই। গাদাগাদি করে সাতজনকে ঢুকিয়ে গাড়ি সারান্ডার রাস্তা ধরলো।
রাস্তা কেমন ছিল জানিনা। ঘুম যখন ভাঙল, দেখলাম লতিফবাগান চলে এসেছি। একটা কাঠের বাংলোর সামনে গাড়ি দাঁড়িয়ে। বাংলোর দুপাশে ছোট ছোট অনেকগুলো কটেজ। পেছনেই কারো নদী চলে গেছে। এটা একটা বড়সড় প্রপার্টি। ব্যাডমিন্টন কোর্ট, একটা ছোট গল্ফ কোর্স, নানানরকম ফলের বাগান সব নিয়ে বিঘে পাঁচেকের আস্তানা। কিন্তু সবকিছুতেই যত্নের অভাব। একটু ধাতস্হ হয়ে নিয়ে ব্রেকফাস্ট করে বেরোলাম ঝরনা দেখতে। গভীর জঙ্গলের মধ্যে নাকি এক অনিন্দ্যসুন্দর ঝরণা আছে।
আর একটা বোলেরো এসে আমাদের তুলে নিয়ে গভীর জঙ্গলে ঝরণা দেখাতে চলে গেল। প্রথমেই পড়লো বোলানি। এক ক্ষয়িষ্ণু জনপদ। আগে সব ছিল। দুটো লৌহ আকরিক মাইনসে কর্মরত দশ হাজার কর্মীর রোজনামচা নিয়ে কলকল করতো বোলানি। এখন অটোমেশনের পর একশ একশ দুশো শ্রমিক কর্মচারী দুই মাইনসে। এ পাহাড় থেকে ও পাহাড় কনভেয়ার বেল্টে করে টাটকা তুলে আনা লাল আকরিক যাতায়াত করছে। আর বোলানি গঞ্জ আস্তে আস্তে ডার্ক শেডের ধুলোর পরতে ঢাকা পড়ছে। আমরা ধুলোমাখা দু:খী সভ্যতা ছেড়ে ক্রমে জঙ্গলের দিকে এগিয়ে গেলাম। 
গহীন জনমানবশূণ্য জঙ্গলের মধ্যে সরু রাস্তা দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে চলার পর একসময় ইন্দ্র বলে উঠলো, অব পয়দল চলনা পড়েগা। ইন্দ্র বোলেরোর ড্রাইভার। হাসিমুখ সরল মনের মুন্ডা উপজাতির একজন মানুষ। আমরাও হাঁটতে লাগলাম। নিশ্ছিদ্র জঙ্গলের মধ্যের এক সরু আঁকাবাঁকা পায়েচলা পথ দিয়ে। নেশাগ্রস্হের মত। হঠাৎ করে বড় পর্দার সিনেমার মত দেখা দিল ঝিকরা ফলস্। এরকম ফলস্ কখনও দেখিনি। ঝরণা। চান করতে গিয়ে মনে হল মাথার পরে বিরাট এক রেইন শাওয়ার। অনেক উপর থেকে পাথরে বাড়ি লেগে ফোঁটায় ফোঁটায় ফেটে যাওয়া জলে সূর্যের আলো পড়ে যেন স্ফটিক নেমে আসছে। স্লো মোশনে।
ইন্দ্র পাহাড়ের পরে একটা গুহামত দেখিয়ে বললো, বছর পনেরো আগেও ওই গুহাটায় একটা ভাল্লুক থাকতো। তারপরে আর খুব বেশিক্ষণ আমরা ওখানে থাকিনি। সটান আস্তানায় ফিরে এসে পেটভরে খেয়ে ভরা বিকেলে ঘুমিয়েছি।
যখন ঘুম ভাঙল শেষ আলো। হঠাৎ করে মনে হল কি কি যেন করা হল না। কি সব কথা যেন কাকে বলার ছিল। কিছুই মনে পড়ে না। ছোটবেলার মত কান্না না পেলেও কেমন খালি হয়ে যায় যেন ভেতরটা। বসন্তকালে যেরকম হয়। তারপর যখন রাত হয়ে যায়, তুষারও গীটার বাজিয়ে ক্লান্ত, ক্যাম্প ফায়ারের আগুনও নিবে এসেছে প্রায়, সমবেত কন্ঠস্বর অনেক চড়ায় উঠে গেয়ে ফেলে, ব্যথা মোর উঠবে জ্বলে, উর্ধপানে…
কেউ যেন কেঁদে ওঠে হাহাকার করে। ছোটবেলা থেকে আমাদের জমানো সমস্ত গিলে নেওয়া কান্নাগুলো বৃন্দগানের শরীর থেকে পিছলে পিছলে পড়ে।

তারপর সারান্ডা শুতে যায়।