ছোটবেলা আসলে নরম একটা মনকেমন

কলকাতা থেকে রিনির ফোন। রিনি মানে বাচিক শিল্পী রিনি বিশ্বাস। প্রাণের বাংলার জন্য ধারাবাহিক ভাবে লিখতে চাচ্ছেন ওর ছেলেবেলার গল্প, বেড়ে ওঠার গল্প। এক কথায় রাজি আমরা। সামনের দিনে মিষ্টি সব লেখার স্বাদ পাবেন প্রাণের বাংলার পাঠকরা। সেইসঙ্গে তো অবশ্যই থাকবে রিনির শহর কলকাতার ভিন্ন কৌণিকের ছবি, থাকবে অন্যরকম কিছু মানুষের গল্প। এখন থেকে প্রাণের বাংলারনির্বাচিতবিভাগে নিয়মিত ছাপা হবেআলোক রেখার মতোএই ধারাবাহিকটি। আশা করছি আপনাদের ভালো লাগবে – সম্পাদক (প্রাণের বাংলা)

রিনি বিশ্বাস

 

(কলকাতা থেকে): ছোটবেলা আসলে নরম একটা মনকেমন; বুকের বাঁদিকে হতে থাকা চিনচিনে একটা ব্যথা; চারপাশের সব অগোছালো দিনগুলোকে ফেলে রেখে একছুট্টে ওখানে ফিরতে চাওয়ার ইচ্ছে আর তা না পারার জন্য গলার কাছে দলা পাকিয়ে ওঠা একতাল কষ্ট! একতলা ভাড়াবাড়িতে দুটো ঘর, এঘর ওঘরের দুধার ঘিরে টানা বারান্দা। একটা রাস্তার দিকে, অন্যটা ঘরের কোল ঘেঁষে; ভিতরের ওই বারান্দা দিয়েই রান্নাঘরে যাতায়াত; বেশ বড় বড় ঘরদুটোই; একবার বিশাল (ছোটবেলায় অবশ্য নিজেকে বাদ দিয়ে আর সবই ছিল ‘বিশাল’) একটা আলমারি ঘরে ঢোকানো হবে, রাস্তার দিকের বারান্দার দেয়ালে মাদুর বিছিয়ে তারপর তাকে আধশোয়া করে ঘরে আনা হল যাতে নতুন আলমারিতে ঘষা না লাগে; রিনুর জীবনে এটাই ছিল মনে রাখার মত প্রথম বড় ঘটনা! একদম ছোটবেলাটা শুধু মা বাবা আর পিসির সঙ্গেই কেটেছে রিনুর ; মাঝেমধ্যে ঠাকুরমা-কাকা, দাদুমণি-দিম্মার সঙ্গেও তার দেখাসাক্ষাত হত; কিন্তু তার দিনরাত জুড়ে ছিল ওই পিসি আর মা-বাবা’ই.. তাদের ভাড়াবাড়ির দুটো ঘরের একটাতে রিনু রাতে ঘুমোয় তার মা-বাবার মাঝখানে; ওটাই তাদের শোবার ঘর; পাশের ঘরটা পিসির; পিসি থাকে আর থাকে বই; যখন যেই বাড়িতেই রিনু থেকেছে, দেখেছে বই ওর খুব কাছের, বাড়ির একজনই বলা যায়.. পরে বুঝেছে ‘বই’ আসলে রিনুর ‘পরম আত্মীয়’; পড়তে শেখার অনেক আগে থেকেই রিনু দেখে বাড়িতে সবার হাতে বই; মা বাবার অফিস ফেরতা অবসর সময়ে, পিসির দুপুরের টুকরো বিশ্রামে এমনকি সারাদিনের শেষে ঘুমোতে যাবার আগেও.. পড়তে শেখার সঙ্গে সঙ্গেই তাই রিনুও বই বগলদাবা করে চলতে শুরু করে! আবছা একটা ভোর (কুট্টিবেলার এই একটিই মাত্র ভোর) রিনু খুব ‘পষ্ট’ মনে করতে পারে- খাটের উপরে সে দাঁড়িয়ে, মায়ের বুকে মাথা রেখে, স্কুলে যাবে বলে তৈরি হচ্ছে; তখন সে নার্সারিতে পড়ে; সাদা শার্ট আর লাল টিউনিক পরিয়ে দিচ্ছে মা; আর লাল টাই! ব্যস্। আর মা নেই; পুরো ছবিতে আর কোথাও মা নেই…এরপর বাবার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে টুক করে স্কুলে ঢুকে যাওয়া, ফিরে যতই ঘোরো এঘর-ওঘর, মা নেই; বাবাও নেই; দুজনেই অফিসে; মনখারাপ হয়; কান্না আসে; ভুলিয়ে দেয় পিসি; রিনুর সবভালোর শুরুতেই পিসি জড়িয়ে পড়ে অনায়াসে; পিসির হাত ধরে স্কুল থেকে ফিরতে ফিরতেই রিনুর প্রথম কচুরিপানার ফুল চেনা, বিকেলে পাশের মাঠে গিয়ে দৌড়োতে দৌড়োতে ভয় পেলেই পিছনে তাকিয়ে দেখে নেওয়া পিসি আছে তো! দুপুরের ভাতের গরাসে, রাতে রান্নাঘরে রিনুর রুটি তৈরি করার ফাঁকেও সেই পিসিই.. কি অদ্ভুত কান্ড! এক্কেবারে ছোটবেলার দিনগুলোতে মা বা বাবার মুখটা মনেই আসেনা! সেখানে শুধুই রিনু আর পিসি.. ক-ত বড় হয়ে রিনু প্রথম জানতে পারে, পিসি তার নিজের নয়!!! বাবা মারা যেতে মেয়ে নিয়ে দুরবস্থায় পড়েছিলেন এক অসহায় মা.. লোকের বাড়ি কাজ করতে যাবে মেয়ে, এমন ভাবনাও তাঁদের পক্ষে ছিল অসম্ভব… দুর্বিপাকে যদিও তেমনটাই মেনে নিতে হয় সেই মাকে… একারণেই পিসিকে আমার পাওয়া… সব মন্দেরই ভালো দিক থাকে…জানার পরে এমনটাই মনে হয়েছিল রিনুর… একেকদিন রিনুর রাতের দুধ রুটি খাবার সময়ে বাবা চলে আসতো; তারপর কি হত সবটা মনে পড়েনা কিন্তু চুপ করে বসে,কথা না বলে খেয়ে নিলেই লজেন্স দেবে বাবা, এই কথাটা বলতো বাবা… এটা কেমন দিব্যি মনে আছে! যদিও কোনদিনই রিনু ওই লজেন্স পায়নি, মুখে আঙুল দিয়েও তার বকরবকর থামতোইনা! অনর্গল কুটুর কুটুর করে কথার খই ফুটতো সেই ছোট্ট থেকে.. অথচ অচেনা পরিবেশে মেয়ের মুখ থেকে একটা শব্দও বের করতে হিমসিম খেতে হত মা-বাবাকে; রাতে ঘুমের মাঝখানে শুয়ে শুয়েই রিনু বোতলে দুধ খেতো; মায়ের আলতো হাতে ধরা দুধের বোতল, পাশেই বাবার হাত আর রেকর্ড প্লেয়ারে রবি ঠাকুর.. ছোটবেলার মনভালো করা কয়েক মুহূর্তের আবছা ছবি..একটা শেওলা সবুজ পর্দা.. তাতে হলুদ ফুলছাপ… অল্প হাওয়ায় সেই পর্দা নিজের মনে উড়তো আর কোনদিন সাগর সেন, কোনদিন দেবব্রত বিশ্বাস গাইতেন রবি ঠাকুরের গান… সঙ্গে মায়ের গলা…গুনগুন…(চলবে)

ছবি: গুগল