জমিয়ে রাখা শীতের সকাল

প্রভাতী দাস

(ভার্জিনিয়া থেকে): ৩:১৮’য় ঘুমটা খুব হঠাৎ করেই ভেঙে গেল। শীতের রাত, হিটিং চলছে বিরতিহীন, ঝিঁঝিঁ পোকার মত শব্দ করে একটানা। এবারে শীত এখনো জাঁকিয়ে না পড়লেও গতকাল সকালেই ফ্রিজিং এর কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছেছিলো তাপমাত্রা। বেশ কণকণে বাতাস জামা-সোয়েটার ভেদ করে হাড়ে গিয়ে লেগেছিলো, বাড়ি ফিরেও কাঁপুনি কমছিল না। লেপমুড়িয়ে শুয়ে পড়েছিলাম একটু আগেভাগেই। এখনও সকালের অনেকটাই বাকী। জেগে উঠে এ দিব্যি বুঝতে পারছি, আর ঘুমানো সম্ভব নয়। নীচে গিয়ে চা বানিয়ে টিভি দেখার কথা ভাবলাম একবার, ল্যাপটপ খুলে কিছু পড়া বা লেখার চেষ্টা করা যায়, অথবা সোফায় কম্বল মুড়িয়ে বসে সকাল দেখার চেষ্টা করা যায়; কিচ্ছুই না করে সেই কতকাল ধরে জমিয়ে রাখা শীতের সকালগুলোর মোড়ক খুলতে শুরু করলাম একে একে।

শীতের সকালগুলো কেমন করে জানি রাতের আঁধার ফিকে হবার আগেই কুয়াশায় মোড়ানো পথ ধরে বেরিয়ে পড়ার ডাক পাঠাতো । নেভী এসে দরজায় ছোট্ট হাতের মৃদু টোকা বাজানোর আগেই, আমি তৈরি। পা টিপে টিপে ঘর পেরিয়ে, আলতো হাতে দরজা ভেজিয়ে একছুটে গৌরীপুর কলেজ চত্বরে। ফুল তোলা, শিউলি, স্থলপদ্ম। ফিরতি পথে বাজারের বটগাছের তলায় আবুনীর মায়ের ভাপাপিঠে। সেই সব শীত সকালগুলো স্থলপদ্ম আর ভাপাপিঠে-খেজুর গুড়ের ঘ্রাণে মোড়ানো অনেক যত্নে।

বগুড়া শহরের শীতের সকালগুলোও জমিয়েছি, কিছুটা বুঝি নিজের অজান্তেই। জয়ার ঠাম্মা এসে ডেকে নিতেন তখন। লাল-ইটের ধুলোমাখা পথ ধরে তাঁর সঙ্গে হেঁটে যেতাম, জয়া, কুট্টি, আমি। মুখার্জি বাড়ির বাগান থেকে জয়ার ঠাম্মা তুলসী তুলবার আগে হাতে তালি বাজিয়ে গুনগুন করে গাইতেন, ‘ডালে কৃষ্ণ শাখে হরি, সরো কৃষ্ণ তুলসী তুলি’। তারপর তুলসী গাছ ঝাঁকিয়ে ঝরে পড়া পাতাগুলোই শুধু তুলে নিতেন। আমাদের ফুল-তুলসী তোলা শেষ হলেই, মুখার্জি কাকা ডেকে নিতেন তাঁদের খাবার ঘরে। কাঠের চুলায় ফুটন্ত ঘিয়ের মধ্যে লুচি ভেজে তুলতেন তাঁদের বাড়ির ঝি, রমা মাসি। মাটিতে আসন বিছিয়ে কাঁসার থালায় করে ঘিয়ে ভাজা লুচি সামান্য খাবার পরই মুখ ফিরে আসতো। সেইসব সকালগুলো জয়ার ঠাম্মার তুলসীর তলার গুনগুনে এখনও সুরেলা; তাদের গায়েপায়ে মুখার্জি বাড়ির ঘিয়ে ভাজা ফুলকো লুচির গন্ধ মাখা।

জমিয়ে রাখা কত কত শীতের সকাল …বরিশালের সকাল ছাদ বাগানের গাঁদা ফুলে হলুদ-কমলা… চিটাগাঙের সকাল বিমান অফিসে পৌঁছে যাবার তাড়ায় ও আর নিজাম রোড ধরে দ্রুত ছুটে চলার… কুমিল্লার সকালগুলো সর্ষেফুলের মধুগন্ধভরা… রংপুরের …।

৩:১৮ ‘য় ঘুম ভেঙে গেলে সেইসব সকাল ছুঁয়ে ছুঁয়ে এইসব সকালের জন্য অপেক্ষা করা যায়। এইসব সকালে ৮:২৮’শে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সারাদিন হাই নেকে’র আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রেখে সেইসব সকালের ঝুলি হাতড়ানো যায়…।

ছবি: গুগল