জলতরঙ্গের প্রেম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

তাহমিন সুলতানা

শেষ পর্ব 

মেধার খুব জ্বর হলো।
অনেক মিস করে সে কাউকে, মনন।
সারাদিন শুয়ে থাকতে আর কার ভালো লাগে?
কিন্তু ওর গায়ে কোন শক্তি নেই যে ওঠে দাঁড়ায়। সারা গায়ে ব্যথা,কিছু খেতে ও পারে না। ছোট কাজের মেয়েটাকে নিয়ে ডাক্তার দেখাতে গেলো। ডাক্তার রাজ্যের টেস্ট করাতে দিলেন। পপুলার এ টেস্টগুলো করিয়ে তার পর বাসায় এসে ক্লান্ত হয়ে পড়ে মেধা। মেয়েটা আছে বলে একটু পর পর জ্বর মাপছে, মাথায় পানি ঢালতে পারছে। মা খুব টেনশন করছেন, সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা, চলে আসবেন তারপর কাজের মেয়েটার ছুটি।

খুব ইচ্ছে করছে, যদি কথা বলা যেতো, কিন্তু কল করতে পারবে না মেধা। বারণ আছে। মনন নিজেই কল করবে, সময় করে। মেধার মনে হচ্ছিলো এমন যে, মনন কথা বললেই জ্বর ভালো হয়ে যাবে!

নিউইয়র্কে এসে প্রথম কয়েক মাস মনন খুব মজা করেছে। নিউইয়র্কে তার অনেক বন্ধু , সবার সঙ্গে বেড়িয়ে আর পার্টিতে যোগ দিয়ে,তার ভালোই সময় কাটছিলো । কি কাজ করবে, কোথায় থাকবে, বাচ্চারা কোথায় পড়বে, এসব ঠিক করতে করতে অনেক দিন পার হয়ে গেলো। মাঝে মাঝে সুযোগ পেলে কথা বলে। মনন বেশি কথা বলতে পারে না, কিন্তু কিছু বললে তা একদম সিরিয়াস। মেধা এই জিনিসটা পছন্দ করে আবার ভয় ও পায়, কেন ভয় পায় জানে না।

মনন হঠাৎ দেশে চলে আসে, কি একটা কাজে, সারপ্রাইজ! এয়ার পোর্ট থেকে ভিডিও কল!
আনন্দে কান্না চলে আসে মেধার। কি করবে?
আজ কত কথা বললো মনন! মনে হলো কত দিন পরে!
খুব শীঘ্রই দেখা হবে।
মেধার জন্য অনেক চকোলেট, আর কিছু জরুরি ওষুধ নিয়ে এসেছে, আর কিছু সাজ গোজের জিনিস।

-আপনার জ্বর হয়েছে, বলেননি কেন?
-তাহলে যে দেখা করা যেতো না! মেধা বললো।
কফিশপে দেখা হলো। আপনি আপনি করে বলা যাবে না, মনন বললো।
-আচ্ছা, আপনি ও তো আপনি করে বলছেন! আমি সহজে পারবো না, সময় লাগবে।
এর পরে একটি দিন ঠিক করে ধানমণ্ডিতে সেই বন্ধুর বাসায় যাবে। যদিও মেধা লজ্জা পায়, এ ছাড়া কোনো ওয়েও নেই। এই দেখা হওয়ার বিষয়টি অনেক কঠিন আর ভীষণ দামী ওদের জন্য। তার কারণ দুজনেরই সামাজিক পরিচয় আছে, পরিবার, বন্ধু-বান্ধব। সব চিন্তা করতে হবে, আর এই বন্ধু ছাড়া অন্য কাউকে বিষয়টা শেয়ার করাও যাবে না! আর সময় বের করাও কঠিন। তবে কিচ্ছু করার নেই! এ বুড়ো বয়সের প্রেম! কঠিন, কিন্তু মনে হয় এটাই প্রথম প্রেম! কেন? দু’জনেই প্রথমবার প্রেম করেই তো বিয়ে করেছিলো, কত স্বপ্ন, আর আশা নিয়ে, মেধা তো ফয়সালের জন্য এমন বেঁকে বসেছিলো, যে ভাবাই যায় না, সে প্রেম মাত্র ক’বছরেই হালকা হয়ে যায়! আর মনন তো তার স্ত্রী অনন্যাকে অনেক ভালোবাসা, শুধু তার একটা মেজাজ আছে, যা মনন আর নিতে পারে না! একটু শান্ত হলে কতো ভালো হতো!  আসলে হয় না, সব মনের মতো।
এই সব কথা বলে আর এখন কি হবে,  যা হবার তা হয়েছে এখন থেকে আমরা ভাল থাকবো, বলে মনন। -কিভাবে? জিজ্ঞাসা করে মেধা।
-এভাবেই, আপনার জন্য আমি থাকবো, আর আমার জন্য আপনি, থাকবেন। বিপদের সময় ঝাঁপিয়ে পড়বো এক জন অন্য জনের জন্য, কেমন? বলে মনন! মেধার কথাগুলো শুনতে বেশ ভাল্লাগে। কিন্তু বাস্তবতা অনেক কঠিন। এতো সহজ নয়, বলে মেধা।
-কেনো!
-কেনো নয়, আমাকে সবাই জিজ্ঞেস করবে না, ইনি কে!

 -তখন কি বলবো?
-হুম,

 হলে কি করবো?
-কিচ্ছু না। কিছু করার দরকার নেই। এমনি ভালো।
মেধাকে ভালবেসে জড়িয়ে ধরে মনন। এতেই সুখ অনেক।

মেধা রিপোর্ট নিয়ে আসে ডেঙ্গু! হায়, প্লাটিলেট পরীক্ষা করতে দিয়ে যায়। মা কে বলা যাবে না, ঝামেলা করবে, মেধা কাউকে কিছু বলবে না, ঠিক করে। আর অফিসে এমনিতেই চার পাঁচ দিন ছুটি কাটিয়েছে, আর নেওয়া যাবে না। মনের মধ্যে ভাল লাগার রেশটুকু অনেকক্ষণ থেকে যায়। বাসায় গিয়ে গুন গুন করে গান গেয়ে উঠে মন।

সকালে অনেক বৃষ্টি নামে, আর ঘুম থেকে উঠতে দেরীতেই নাস্তাটা না খেয়েই বের হয়ে আসে মেধা। পথের জাম, আজ ও অফিসে লেট! বসের কঠিন কথা গুলো মাথায় নিয়ে কাজ করতে করতে হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যায় মেধা। কলিগরা ছুটে আসে, তাড়াতাড়ি পাশের জেনারেল হাসপাতেলে নিয়ে যায়।
মোবাইলে কল করার জন্য মেধার কলিগ অঞ্জলি’দি ব্যাগ খুলতেই ব্লাড রিপোর্ট দেখতে পেয়ে ডাক্তারকে দেখালো।
ডাক্তার দেখলেন রিপোর্ট!
বললেন – উনারতো ডেংগু হয়েছে! আর প্লাটিলেট-এরও টেস্ট করতে দিয়েছেন,  আপনারা এসব জানতেন?
কেউ জানতো না! ও কাউকে বলে নি তো!
খুব কষ্ট পেলেন অঞ্জলি’দি! আমাকেও  বলল না মেয়েটা?
ফোন করে মেধার মাকে জানালেন, তিনি আসছেন। মনন এর নাম টা দেখে তাকেও একটা ফোন করলেন, জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি মেধার কে হন? ”
-বন্ধু। কেন আপা,  কি হয়েছে মেধার?
– ডেংগু, হয়েছে। ভাবলাম যদি সাহায্য লাগে! তো ও অফিসের পাশেই হাসপাতালে আনা হয়েছে, আপনি পারলে চলে আসুন। প্লিজ।
মনন বললো, জি আমি এক্ষুনি আসছি, ধন্যবাদ আপনাকে আপা। রেখে গাড়ি বের করলো।
ইচ্ছে ছিলো একবার ওরা রাজশাহী, যশোর রোডে লংড্রাইভে যাবে, খুব সুন্দর ভিউ! মেধা কখনো যায় নি, রাস্তার পাশে পুরানো গাছগুলো আর দূরের সবুজ মন কেড়ে নেয়! কবে  যাবে? ভাবছে এবার ভালো হলেই যাবে মেধাকে নিয়ে।
গাড়ি ছুটছে..!
দেশে মননের একমাত্র টান হলো মেধা। ওর জন্যই দেশে আসবে, কেন না এক সময় বন্ধুরা ও ব্যস্ত হয়ে পড়বে, তাদের সংগে আর তেমন দেখাও হবে না হয়তো। আমেরিকার গ্রীণকার্ড হয়ে গেলে আর কি, বছরে এদিকের কোন ব্যবসা আবার শুরু করা যাবে। তখন মেধার সঙ্গে অনেক ভাল সময় কাটাবে মনন।
ভাবতে ভাবতে হাসপাতালের সামনে চলে এলো মনন। দ্রুত সে রিসিপশনের তথ্য অনুযায়ী লিফটের সাত এ উঠে গেলো। ২০৭ নং বেড। মেধা দেখলো মনন এসেছে!

ওর পড়নে এমন অদ্ভূত পোশাক কেন? মনন এসেছেন, না?

 চলুন তাহলে, আমরা যাই! অনেক দূর যেতে হবে  তো আমাদের, তাই না?
মনন অবাক হয়ে ছুটে যায় কাছে। হাতটা ধরে, মেধা শক্ত করে ধরে মননের হাতটা সেই প্রথমবারের মত, নির্ভরতা আর আস্থার হাত। মেধার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। ডাক্তার রিপোর্ট হাতে মেধার বেডের কাছে আসেন। তার পেছনে,নার্স আর ওর মা ও ছুটে আসেন। কি হয়েছে? জিজ্ঞেস করেন কেউ!
মেধার ফ্যাকাসে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে সবাই।
আর মেধা লংড্রাইভে চলে যায় দেবদূতের মতো সে অদ্ভূত পোশাকে আসা মননের হাত ধরে। ও আজ খুবই খুশি, সুখী ও।(শেষ )

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]