জলপদ্ম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কাজী জাওয়াদ লেখক ও সাংবাদিক

সামজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবন তখনো হয়নি। না হওয়াটাই ভালো ছিল। আমি সত্তর দশকের প্রথম ভাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলছি।

কলা ভবনের গুরুদোয়ারার দিকটায় ছোট একটা দরজা ছিল। সেই দরজা থেকে গ্রন্থাগার পর্যন্ত ছিল শান বাঁধানো পায়ে হাঁটার পথ। বাঁদিকে এক টুকরো মাঠ। তার অপর পারে দুটো গোল দালানের মধ্য দিয়ে দেখা যেত মধুদার ক্যান্টিন।

সাংবাদিকতা বিভাগে আমাদের ক্লাস হতো সন্ধ্যায়। তাই দিনের বেলা হল থেকে বের হতাম এগারোটার দিকে। ওই পথ ধরে চলে যেতাম শরীফ মিয়া বা পেড্রোয় কবিদের আড্ডায়। কিংবা গ্রন্থাগারের বারান্দায় বসে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে। একটি পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার ছিলাম বলে সকালের দিকে টিএসসিতে অনুষ্ঠান থাকলে তার খবর সংগ্রহ করতেও যেতাম।

একদিন গ্রন্থাগারের দিকে যেতে যেতে অপর দিকে থেকে আসা একটা মেয়ের সঙ্গে চোখাচোখি হলো। সে তাকিয়ে আছে অপলক। গভীর সে দৃষ্টি। জীবনানন্দ যে এমন চোখেই নীড় দেখতে পেয়েছিলেন তাতে কোন সন্দেহ নেই।

সেদিন ওই পর্যন্তই।

পরদিন সকালে বের হওয়ার আগে আবার মেয়েটির মুখ ভেসে উঠলো কল্পনায়। পথ চলতে দেখা একটা মুখ আবার দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। তাই চোখ দুটো স্মৃতি থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করলাম। হলো না। কীসের অজানা টানে সূর্য সেন হল থেকে দ্রুত চলে এলাম কলা ভবনে। ডাকসু কক্ষের সামনে দিয়ে এগিয়ে যাই কোণার দরজার দিকে। কী কান্ড! বের হতেই দেখি পথটার অন্য প্রান্তে মেয়েটি। একা হেঁটে আসছে। নীল-সাদা শাড়িতে চমৎকার লাগছে। মাঝে মাঝে দু’একটা ছেলে মেয়ে আমাদের মধ্যে চিকের মত আড়াল বানানোয় দেখাটা আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। খুব ভালো করে দেখলাম। বেশ লম্বা, একহারা গড়ন। কাছাকাছি এসে সে আমার বাঁদিক দিয়ে চলে যাচ্ছিল। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন থেকে দেখলাম এক পুরুষ্টু বেণী আঁচলের পাশপাশি পিঠ বেয়ে নিতম্বের নিচে নেমেছে। বিনন বাঁধনে জড়িয়ে গেলাম।

তার পরদিন দেখা নেই।

তার পরদিন দেখা নেই।

তার পরদিনও দেখা নেই।

এভাবে কয়েকদিন গেল।

তারে না দেখিতে পাই, থাকি পরের দিনের আশে।

আবার একদিন দেখা। ওর চোখে প্রশ্ন – এ কদিন কোথায় ছিলে?

আমার চোখে জবাব – কখন আসবো বলোনি তো।

চোখে চোখে-ই আমাদের কথা হতো। কেন, হতে পারে না বুঝি? গল্প কবিতায় ‘চোখের ভাষা’ কথাটি পড়েছি। সেটা সত্য হলে চোখের ভাষায় কথাও হতে পারে। যদিও অসুবিধা ছিল। ঠিক জানা হতো না কেউ কারো কথা বুঝতে পারছে কী না?

এভাবেই দিন আসে দিন যায়, আমাদের না-বলা কথা এগিয়ে চলে।

এর মধ্যে খবর নিতে শুরু করেছি। ও একটা প্রভাবশালী দলে সক্রিয়। আমার জন্য আশাহীনতার পথে এক ধাপ। এক দুর্দান্ত বিভাগের ছাত্রী। গগনে ব্যর্থতার কালো মেঘ জমে। সেই দলে, সেই বিভাগে অনেক নামী ছাত্র। তাদের তুলনায় আমি তুচ্ছ। এমন কোন গুনই নেই যা ওই বিভাগের একটা মেয়ের মনে ছাপ ফেলতে পারে। তার নামও জেনেছি – জলপদ্ম। ছেলে বন্ধুর ব্যাপারটা জানা হয়নি।

অনেকটা সোনার হরিণ হারানোর মতো নিজেকে দমিয়ে রাখি। পাঠ সংগ্রাম চলতে থাকে। এক সময় ডাকসু নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হলো। হলে হলে বিভিন্ন দলের প্রার্থী তালিকা সংগ্রহ করছি পত্রিকার কাজে। রোকেয়া হলে ওর দলের নেত্রী জানিয়েছিল, পরদিন দুপুরের দিকে গেলে প্রার্থী তালিকা দিয়ে দেবে। নির্ধারিত সময়ে যেয়ে দরোয়ানকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন – আপা এখানেই ছিল, একটু দাঁড়ান উনি হয়তো এখনই আসবেন। নেত্রী চামেলী হাউসের দিক থেকে এলেন আর তখনই  সেই মেয়েটিও গেট দিয়ে হলে ঢুকলো। নেত্রী ওকে থামালেন। জিজ্ঞেস করলেন – কোথায় যাচ্ছো?

– রুমে যাচ্ছি।

– তুমি একটু আমার রুম থেকে প্রার্থী তালিকাটা এনে ওঁকে দেবে?

– হ্যাঁ, দিচ্ছি।

নেত্রী বিদায় নিয়ে বের হয়ে গেলেন। ও আমাকে বললো – আমার সঙ্গে আসুন।

একটু চমকে গেলেও নিজেকে সামলে নিলাম। ওর সঙ্গে মূল ভবনে গেলাম। মনে হচ্ছিল, কতকাল ধরে হাঁটছি পাশপাশি কারো মুখে কথা নেই। আমাকে নিয়ে টিভিরুমে বসিয়ে পাখা ছেড়ে দিয়ে বললো – আপনি বসুন, আমি আসছি। আমি বসে বসে ঘামছি আর হঠাৎ দুজনে নির্জনে একা হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতিটা ভাবছি। সে ফিরে এলো দেরি না করেই। এসে বসলো সোফায় আমার পাশে। বললো- আমি বলছি আপনি লিখুন।

ভেবেছিলাম অন্যান্য হলের মতো একটা কাগজ ধরিয়ে দেবে তাই নোটবই বা কাগজ নিয়ে যাইনি। বললাম – কাগজটা আমাকে দেয়া যায় না।

– কাল রাতেই ঠিক করা হয়েছে, আর কপি নেই।

– আমিতো কাগজ আনিনি . . .

এক অদৃশ্য মৃদু হাসি মোনালিসার মতো ওর ঠোঁটের উপর খেলে গেল। হাতের দুটো কাগজের একটা এগিয়ে দিল। সাদা। প্রশ্ন – কলম আছে?

– না। আমার সলাজ উত্তর।

ব্লাউজে গোঁজা একটা কলম বের করে দিল। মেয়েরা এক পলকেই অনেক কিছু দেখে নেয়। ও দেখেছিল আমার কাছে কাগজ কলম কিছু্ই ছিল না।

ওর ত্বকের সুগন্ধ মাখানো কলমটি ধরে তালিকার নাম লেখা শুরু হলো। ও বলছে, আমি মাথা নিচু করে লিখছি। ধীরে যত্ন করে। আমার কাকের-ঠ্যাং-বকের-ঠ্যাং হাতের লেখা আদর্শ লিপির মতা করার প্রাণপন চেষ্টা করছি। উপরে পাখার বাতাসটাকে খুব কমজোর মনে হচ্ছিল। দর দর করে ঘামছিলাম। মাঝে মাঝে মুখ তুলে দেখেছি ও নির্মিমেষ আমাকেই দেখছে। এক সময় লেখা শেষ হলো।

আমি জিজ্ঞেস করছি – আপনি কী ভালো ছাত্র নয়, সাধারণ একটা চাকরি করে এমন কোন ছেলের সঙ্গে ঘর বাঁধতে, জীবন কাটাতে রাজী হবেন?

– ছেলেটাকে জানলে ভেবে দেখতে পারি।

– ধরুন ছেলেটা যদি . . .

– তাহলে যাই? ওর কথায় সম্বিত ফিরলো। কথাগুলো তাহলে মনে মনে ভাবছিলাম!

– হ্যাঁ। ধন্যবাদ। আর কথা বাড়াতে পারিনি। পরে অনেকবার ভেবেছি ও আমাকে হলের ভিতরে নিয়ে গিয়েছিল কেন? কোন বিশেষ কথা কি শুনতে চেয়েছিল?

এরপর ডাকসুর নির্বাচন ভন্ডুল হলো। দেশের রাজনীতিতে পরিবর্তন হলো। বাকশাল আমলে সব পত্রিকা বন্ধ করে দেয়ায় বেকার হলাম। অভাবে পড়লাম। বেশ কষ্ট করেই পাঠ শেষ করে আবার সাংবাদিকতায় ফিরে গেলাম। বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার সময়ে বা পরে ওর সম্পর্কে আর কিছু্ই জানতাম না। জীবনের শিল-নোড়া হৃদয়বৃত্তির অস্পষ্ট ঘটনাটা মুছে দিয়েছিল।

তারপর বহু বছর কেটে গেছে। কখনো কখনো ছাত্র জীবনের কথা মনে হতে ওর কথাও মনে পড়েছে। আবার ভুলেও গেছি। অবসর নিয়েছি। প্রবাসে আছি। প্রযুক্তির বিবর্তনে স্মৃতিচারণের নতুন উপায় উদ্ভাবন করেছি। যেসব জায়গায় জীবন কেঁটেছে গুগল মানচিত্রে সেগুলো দেখার এক অভ্যাস হয়েছে। তাতেই দেখেছি এখনকার সামাজিক বিজ্ঞান ভবনের ছবি। মনে হয়েছে – তখন এই দালানটা না থাকাতেই ওকে দেখেছিলাম। কল্পনায় ওর সঙ্গে সংসার করেছি।

* * *

কাহিনিটা এখনেই শেষ হতে পারতো। হয়নি যে – বুঝতেই পারছেন। আকস্মিক ভাবেই এক বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পেলাম। (বলা ভাল, বন্ধুটি কিংবা অন্য কেউ এই কাহিনির বিন্দু বিসর্গও জানতো না।) খবরটা সে আমাকে জানানোর জন্যও বলেনি। জানলাম, জলপদ্ম ইউরোপের কোন দেশে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় বেশ উঁচু পদে কাজ করতো। কী এক কঠিন অসুখে কিছুদিন আগে বিশ্ব সংসার থেকে বিদায় নিয়েছে।

খবরটা চৈতন্যে ব্যাথা-না-ব্যাথার এক টংকার দিয়ে গেছে। শুধু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে, জলপদ্ম, তুমি কী আমার বুকের সাগরে ভাসতে চেয়েছিলে?

ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box