জিঙ্গেল এর আমি, আমার জিঙ্গেল

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

জিঙ্গেল আমি বেশি একটা করিনি।হঠাৎ দু’একটা করেছি।সেটাই স্মৃতিময় হয়ে আছে।জিঙ্গেল হলো কোন দ্রব্যের এ্যাডভার্টাইজমেন্টের গান।প্রথম করি গুড়ো দুধ মিলুপার জিঙ্গেল। মিলুপা ইনফ্যান্ট বেবি ফুড।সুরকার শ্রদ্ধেয় আনিসুর রহমান তনু ভাই ডাকলেন নাখালপাড়া অবস্থিত ঝংকার স্টুডিওতে।অনেক নামকরা স্টুডিও ছিলো সেটি।এখানে আমি আমার দ্বিতীয় অডিও অ্যালবাম বা ক্যাসেট নীলাঞ্জনার রেকর্ডিং করেছি। এই স্টুডিওর বিশেষত্ব ছিলো এখানে খুব ভালো গান রেকর্ড হতো। যাই হোক তনু ভাই ডাকলেন।জিঙ্গেল খুব কম সময়ে গেয়ে বক্তব্য ফুটিয়ে তুলতে হয়।শুনতে খুব সহজ হলেও তিরিশ অথবা বিশ সেকেন্ডে বক্তব্য ফুটিয়ে তোলা অবশ্যই কঠিন। তো গাইলাম “পুষ্টিতে তৃপ্তিতে মিলুপা কচি মুখের হাসিতে মিলুপা, বাড়ন্ত শিশুদের মিল্ক সেরিয়াল মিলুপা মিলুপা মিলুপা” খুব সহজ সুর কিন্তু মায়ের আবেগ দিয়ে গাইতে হবে।তখনও আমি মা হইনি।তারপর ও মায়ের আবেগ। তনুভাই বার বার বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন মায়ের আবেগ কেমন! শেষ লাইনটা কার্টুন এর মতো ভয়েজে গাইতে হবে।টেম্পো স্লো করে টেনে টেনে মিলুপা মিলুপা মিলুপা এই লাইনটি আমি গাইছিলাম কিন্তু সেটা যখন নর্মাল স্পীডে বাজানো হচ্ছিলো বেশি চিকন হয়ে যাচ্ছিলো। আমার হাজব্যান্ড তো সবসময় আমার সঙ্গেই থাকেন, তনু ভাই তাঁর বন্ধু।তনু ভাই বললেন দোস,এই জায়গাটা তুই গা।উনি দোনোমোনো করে রাজি হয়ে গেলেন।উনি তো একসময় গায়কই ছিলেন। যাইহোক উনি গেয়ে দিলেন, ব্যাপারটা দারুণ দাঁড়ালো। এরপর আমি আরও অনেক জিঙ্গেল করেছি কিন্তু কোন প্রোডাক্টের জন্য করেছি আমি তা ভুলে গেছি। আশির দশকের কথা।তারপর আবারও মিলুপা ইনফ্যান্ট মিল্কের জিঙ্গেল গাইলাম। আমার খাতায় আরো জিঙ্গেল এর কথা লেখা আছে কিন্তু কিসের তা লেখা নাই।তখন কি আর জানতাম যে আমার এভাবে লিখতে হবে? কিন্তু খেরোখাতায় কবে কোথায় কি গেয়েছি কত সম্মানী পেয়েছি তা ঠিকই লেখা আছে। জিঙ্গেল এ আমার ফোকাস ছিলো না দেখেই হয়তো এই নামগুলো কিছু বাদ পড়ে গেছে।এর জন্য এখন আফসোস হচ্ছে।যাইহোক তারপর আরও দু’য়েক বছর পরে আমি গাইলাম এপি ফিফটিন বেবী পাউডার এর জিঙ্গেল। সুরকার শ্রদ্ধেয় আনোয়ার উদ্দিন খান।খুবই গুনী সুরকার এবং ভীষণ সজ্জন ব্যাক্তি।আমাদের খুব স্নেহ করতেন। তখন ডন স্টুডিও  ছিলো মালিবাগে । গাইলাম ” এপি ফিফটিন বেবী পাউডার সোনামণি মাখেরে চুম দিয়ে ঘুম দিলাম সোনামনির দু’টি চোখেরে এপি ফিফটিন বেবী পাউডার সোনামণি মাখেরে” যেদিন রেকর্ডিং সেদিন আমরা বাসা বদলাচ্ছিলাম। আমার মাশুক তখন চার মাসের বাচ্চা।কারো কাছে রেখে যাওয়ার মতো অবস্থা ছিলো না।বাচ্চা নিয়েই স্টুডিওতে গেছি।আমার মাশুক ভয়ানক শান্ত বাচ্চা।কোন জ্বালাতন নাই।গাওয়া শেষ হলে জিঙ্গেল এর ভিডিও করবেন অভিনয় শিল্পী ও নির্মাতা সদরুল পাশা।উনি আমার বাচ্চাকে দেখে বললেন এতো সুন্দর বাচ্চা মাশআল্লাহ! আপনার বাচ্চাকে দেবেন এই অ্যাডে? অভিনয় করুক? আমরা ডিসিশন নিতে পারছিলাম না।উনি সময় দিলেন ভাবার। আমরা ভেবে ওনাকে জানালাম ঠিক আছে ও এটাতে থাকবে।তারপর যেদিন ভিডিও শ্যুটিং হবে সেদিন মাশুককে নিয়ে গেলাম।অ্যাডে যিনি মায়ের অভিনয় করবেন তিনি মেকাপ নিচ্ছেন। ক্যামেরা স্টার্ট হবার আগে বাচ্চা কোলে নেবেন, মাশুক আর তার কোলে যায়ই না।যায়না তো যায়ইনা।কি একটা অবস্থা। এদিকে সেট ভাড়া নেয়া। পাশা ভাই বললেন আপনিই ওকে কোলে নিয়ে বসেন।কিছুই করতে হবেনা। বাচ্চা কোলে নিয়ে শুধু গাইবেন। আপনি তো ওর মা, আপনার মাতৃত্ব সবচেয়ে বেশি ফুটে উঠবে।আমি খুবই দ্বিধায় পড়ে গেলাম। এর আগে একটা নামকরা জুয়েলার্স, যাদের আমি প্রথম ক্রেতা ছিলাম তাদের একটা অ্যাডে গয়না পরে অভিনয় করার জন্য মেলা অনুরোধ করেছে কিন্তু আমি একদমই রাজি হতে পারিনি। গয়না পরে বউ সেজে গান গাওয়া আর যাইহোক আমাকে সাজেনা।কিন্তু পাশা ভাইয়ের অনুরোধ ফেলা যাচ্ছিলো না।পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে রাজি হয়ে গেলাম। বাসা থেকে ঘরোয়া শাড়ি আনা হলো। সামান্য মেকআপ নিয়ে বিছানায় বসে মাশুককে কোলে নিয়ে লিপসিং করছিলাম।ভালোই হচ্ছিলো কিন্তু বাঁধ সাধলো সাবানের বাবল।এই প্রযুক্তি তখন নতুন এসেছে। আমাদের উপর এই বাবল অ্যাপ্লাই করতেই বাচ্চা আমার ভয় পেয়ে গেলো। সে আর চোখই মেলেনা! কি মুশকিল! তখন পাশা ভাই বললেন বাবল স্টপ।বাবলের ভিডিও সুপার ইম্পোজ করা হবে।ভিডিও শেষ হলো। পাশা ভাই অনেক বড় একটা অ্যামাউন্ট দিলেন আমার ছেলেকে।এরপর আমি একচেটিয়া গেয়েছি শরীফ মেলামাইনের জিঙ্গেল। শরীফ মেলামাইনের পরিবার আমাকে পয়মন্ত ভাবতেন। নতুন নতুন ডিজাইন শুরু করতেই একটা করে নতুন জিঙ্গেল গাইতাম। সুরকার থাকতেন ফুয়াদ নাসের বাবু ভাই।প্রায় দশ বারোটা শরীফ মেলামাইনের সিরিজ জিঙ্গেল করেছি। তখন সত্যিকার অর্থে জিঙ্গেল এর রানী ছিলেন সুমনা হক।বাবু ভাই, রিপন খান, মোস্তাক আহমেদ, আনিসুর রহমান তনু ভাই ওনারাই একচেটিয়া জিঙ্গেল সুর করতেন। তবে ফুয়াদ নাসের বাবু ভাই রিপন খান ভাই-ই বেশি জিঙ্গেল করতেন এবং সুমনা আপাকে দিয়েই গাওয়াতেন। সেখানে শরীফ মেলামাইন পরিবার আমাকে ছাড়া কাউকে দিয়ে গাওয়াতেন না।তারপর শুরু হলো ডায়মন্ড মেলামাইন।তাদের ও কয়েকটি জিঙ্গেল করেছি।একটা শ্যাম্পুর জিঙ্গেল করেছিলাম।এই ক্ষেত্রে আমি নাম বলছিনা, রেকর্ডিং এর সময় আমার লম্বা চুলে তাদের নির্মাতার নজর গেলো।প্রায় মাসখানেক ধরে তারা পিছে লেগেই থাকলেন। আমার চুল তাদের দরকার। আমার মন সায় দেয়না! একদমই সায় পাচ্ছিলাম না মনের ভেতর থেকে। কিন্তু সরাসরি না করা যাচ্ছিল না সম্পর্কের কারণে। যাতে পিছিয়ে যায় তার জন্য অনেক বড় অংক চেয়ে বসলাম। তারা তাতেই রাজি। কিন্তু আমাকে বলা হলো চুল ইঞ্চি দুয়েক কেটে ফেলতে যাতে একটা বাউন্স আসে আর আমাকে পাঁচ ছয় পাউন্ড ওজন কমাতে।এবার মোক্ষম সুযোগ পেয়ে আমি বেঁকে বসলাম।আমি বললাম আমি ওজন ও কমাতে পারবো না।কারণ আমার হাইট বা বডি মাস্ক ইন্ডেক্স অনুযায়ী যা থাকার কথা তারচেয়ে সবসময় দ দু’তিন পাউন্ড ওজন আমার বেশি রাখতে হয় গানের কন্ঠের পেলবতার জন্য। কাঠ কাঠ হলে গলার মাখন ভাবটা থাকেনা। আমি ওজন ও কমাবোনা চুলও কাটবোনা।এবার ঝেড়ে বললাম আমি আসলে এটা করবোওনা, পারবোওনা।ওনারা মনোক্ষুণ্ণ হলেন।

আমি ভাবলাম যাই হোক, আমি তো বাঁচলাম। এসব এখন সবই স্মৃতি।জীবন এতো ছোট, যখন জীবন এর ভেতর দিয়ে যেতে হয় তখন কেউই বোঝেনা!

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]