জীবনের ঘোরগ্রস্ত বছর গুলো আমার

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

মেরিল প্রথম আলো পাঠক জরিপ পুরস্কার পাওয়ার পরে আমার দিননামচা কি কিছুটা বদলালো? হ্যাঁ। বদলে গেলো। আমি ১৯৯৯ সালের কথা বলছি। বিয়ের ফুল  ছবির “তোমায় দেখলে মনে হয়” গানটির জন্যই এই পুরস্কার। স্বাভাবিক ভাবেই ছবির গানের ব্যস্ততা ভয়াবহ ভাবে বেড়ে গেলো।প্রায় প্রতিদিন একটা দুইটা করে গান থাকতো আমার। আমি আবারও সব্যসাচী সঙ্গীতজ্ঞ শ্রদ্ধেয় আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ভাইয়ের কথা স্মরণ করছি।উনি তার প্রতিটি ছবির প্রায় সব গানই আমাকে দিয়ে গাওয়াতেন,এখন যেন নির্ভরতা আরও বেড়ে গেলো। স্টুডিও থেকে বাড়ি আমার ফেরাই হয়না এমন অবস্থা। রেয়াজ করার অবস্থা তথৈবচ। কারণ রেয়াজ করবো কখন!  নাওয়া খাওয়া বাচ্চা সংসার মেহমান!  কি একটা অবস্থা!  হারমোনিয়াম খুলে রেয়াজ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ালো। বক্স হারমোনিয়ামের একটা বাক্সো থাকে।

বাজানোর আগে তা খুলে তুলে অ্যাডজাস্ট করে নিয়ে রেয়াজ করা সময় সাপেক্ষ আবার তানপুরা দিয়ে সুর বেঁধে বেঁধে রেয়াজ করাও মুশকিল। তাই আমি আমার ইলেক্ট্রিক সারং এর সাহায্য নিলাম। আমার গানের ঘরের মাটিতে পাতা ফরাস এ বসে সারং অন করে নিলেই রেয়াজ করতে পারি।কিন্তু মনে হচ্ছিলো রেয়াজ যদি রাঁধতে রাঁধতে গোসল করতে করতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আধা বসা আধা শোয়া হয়ে রেয়াজ করতে পারলে আমার সময় অনেক বাঁচতো।কিন্তু আমার বাসাটা তো শুধু আমার একলার না।বাসায় আমার মা বাবা শ্বশুর শাশুড়ী অনেক মুরুব্বি স্থানীয় সবাই যখন তখন আসেন। তাই গানের ঘর ছাড়া আর কোথাওই আমার গলা সাধা সম্ভব হয়নি।প্রতিটি রেকর্ডের পরে কোথাও কোন কমতি থাকলে আমার মনে হতো আমার গলা সাধা ঠিকঠাক হচ্ছেনা হয়তো। দিনের বেলা রেকর্ড করে ফিরলে রাতে ঘুমের মধ্যে মনে হতো মাথার ভেতর গানটির মিউজিক বাজছে! গাড়িতে উঠলেও বসে বসে মনে মনে সারগম করতাম। কি মুশকিল!  আমি যেন কি এক ঘোরের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম। আমার জীবন সঙ্গী আমার মনের অবস্থা বুঝতে পারছিলেন।অথবা আমিই উনাকে বলেছিলাম। তারপর উনি আমাকে ধীরে ধীরে কাউন্সেলিং করছিলেন। উনার বক্তব্য আমার কণ্ঠ সিজন্ড।অনেক বেশি রেয়াজের প্রয়োজন নেই।আর গান তো রোজই কখনো কখনো গাওয়াই হচ্ছে।

আমি আস্বস্ত হতে গিয়েই মন খুতখুত করছিলো।উনি বললেই চলো তোমার ওস্তাদজীর কাছে নিয়ে যাই।উনি কি বলেন শোন।আবারও বলছি আমার ওস্তাদজী বাংলাদেশের প্রথিতযশা কণ্ঠশিল্পী জনাব বশীর আহমেদ। আমি আমার জীবনসঙ্গীর সঙ্গে ওস্তাদজীর  বাসায় গেলাম।ওস্তাদজী খুব সহজ সরল ভাবে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন কি হয়েছে তোমার!  আমি বললাম গান রেকর্ডিং, প্রোগ্রাম, বিদেশ ট্যুর এর চাপে আমার আলাদা করে পর্যাপ্ত পরিমাণে গলা সাধা হচ্ছেনা হয়তো। ওস্তাদজী মিষ্টি হেসে বললেন আমাকে গান শোনাও! আমি কি যে এক পরিস্থিতিতে পড়লাম। গলা দিয়ে গান বেরুচ্ছে না! ওস্তাদজী অনেক ক্ষন ধৈর্য ধরে কপট ধমক দিয়ে বললেন গাও! আমি গাইলাম ওস্তাদজীর প্রিয় গান শ্রদ্ধেয়  হৈমন্তী শুক্লার ‘এতো কান্না নয়

আমার … এ যে চোখের জলের মুক্তোহার আমার পরতে ভালো লাগে বঁধু তোমারি পতজ চেয়ে।’ ওস্তাদজী অনেকক্ষন চুপ করে থাকলেন। আমার জীবনসঙ্গী ও চুপ।ওস্তাদমা শ্রদ্ধেয় মীনা বশীর ও চুপ। আমি এবার ভয় পেতে থাকলাম।ওস্তাদজী নিরবতা ভাঙ্গলেন। বললেন কনক,তুমি আমাকে কাঁদাতে এসেছো! আমি এবার কেঁদে ফেললাম। আমি ওস্তাদজীকে বাঘের চেয়েও ভয় পাই তেমন কোন কারণ ছাড়াই। ওস্তাদজী বললেন শোন মেয়ে,তোমার রোজকার গলা সাধার কমবেশির জন্য ভয় পেতে হবে না।গানের ভেতরেই তুমি বাস করছো।অনেক বেশি অথবা বাড়তি রেয়াজ তোমার দরকার নেই।তুমি তো ধ্রুপদ সঙ্গীত শিল্পী নও! তুমি আধুনিক গানের শিল্পী। তোমার কণ্ঠে সুপার ফাইনেস্ট থ্রোইং দরকার। দরকার সুক্ষ্ম উপস্থাপন, কারুকাজের দানা মুক্তোর মতো সুডৌল কিন্তু শক্ত।

তোমার রোজ মাত্র আধাঘন্টা গলা সাধলেই যথেষ্ট। এরচেয়ে একটুও বেশি না।বরঞ্চ তুমি যেদিন বেশি গাইবে সেদিন রেয়াজ তো দূরের কথা তুমি কথাই বলবে না।একদম ভয়েজ রেস্টে চলে যাবে। তোমার জন্য আমার অনেক দোয়া। তোমার কণ্ঠ আগের চেয়ে অনেক পরিণত আর স্পষ্ট আবেগ স্পষ্ট সুরে আরও মিষ্টি হয়েছে। তুমি আমার ছাত্রী ভাবতে আমার গর্বে বুক ভরে ওঠে।তোমার জন্য আমার দোয়া আজীবনের।বাড়ি ফিরতে ফিরতে আমি সেদিন অনেক কেঁদেছি আমার অপর্যাপ্ত গলাসাধা জনিত কারণে মন ছোট হয়ে যাওয়া থেকে মুক্তি পাওয়ায় এবং ওস্তাদজীর প্রশংসায়। কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে যেন আমি ঘোরগ্রস্ত অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচলাম কিন্তু রেয়াজ করতে আমার মন আরও অস্থির হয়ে গেলো। আসলে এমন ঘোরের মধ্যে থেকে শিল্পের জন্য আধাপাগল টাইপ না হলে শিল্পী হওয়া যায়? অথবা উল্টো করে বললে বলা যায় ঘোরগ্রস্ত আধাপাগল মানুষই শিল্পী হয় বা শিল্পী হওয়ার পথে এগোয়।তবে আমি যে কি তা এখনো আমার অজানা।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box