জীবনের যতো দুঃখ আনন্দের খানাখন্দ!

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

জীবন মানে জীবন। জীবনে সুখ দুঃখ হাসি কান্না আছেই, সে আর নতুন কি।সাধারণ ঘরের সাধারণ মানুষ আমি, কিন্তু গানের উত্তরোত্তর সাফল্য আমার ঘরে দক্ষিণা বাতাস হয়ে আসছিলো। আমি জীবনে খুব ধীরে থিতু হচ্ছিলাম। আমার জীবনসঙ্গী আমার গানের ব্যাপারে এমন ভাবে সাহায্য করছিলেন যে গান গাওয়া ছাড়া আমার আর কোন চিন্তাই করতে হতো না। আমার মাশুক তখন চতুর্থ শ্রেনীর ছাত্র। ফারিয়াকে প্রথম শ্রেনীতে ভর্তি করাবো কিন্তু বাসা হলো রামপুরা মহানগর প্রজেক্টে আর কোচিং মগবাজারের কোন এক জায়গায়। শ্বশুর শাশুড়ী তখন শান্তিনগর থাকেন আর আমার বাবা-মা তাদের বাড়ি মাদারটেক। আমি মহা বিপদে পড়লাম। রোজদিন রেকর্ডিং, স্টুডিও থেকে বাসায় ফিরতেই আবার ফোন আসে স্টুডিওতে যাওয়ার জন্য। আমি বাচ্চাদের কাদের কাছে রাখবো, তাদের কে পড়াবে, রেকর্ডিং করার বা অনুষ্ঠানে গাইবার সময় তারা কার কাছে থাকবে এই সমস্যাগুলো আমাদের গানের জগতের নিরবচ্ছিন্ন উন্নতির পথে এলোমেলো সমস্যা হয়ে দাঁড়ালো!

আমার বাসায় থাকবর জন্য একবার বোনদের ধরে নিয়ে আসি, আব্বা আম্মাকে রেখে দেই, একজন মাস্টার্স পড়া মেয়েকে লজিং মাস্টার হিসেবে রাখি এমন জোড়াতালি দিয়ে জীবন চলছিলো। সত্যি সত্যিই জীবন বড়ই এলোমেলো হয়ে উঠলো। মাশুক চতুর্থ শ্রেনীর শেষ ছয়মাস শুধু ঘরে বসে আব্বার কাছে পড়াশোনা করলো। সেটা কি কম কষ্টের ব্যাপার! আব্বা তাঁর সংসার ছেড়ে থাকতে পারেন না বিধায় মাদারটেক থেকে সেই রামপুরা মহানগর প্রজেক্টে আসেন মাশুককে পড়াতে।পড়িয়ে আব্বা আবার বাসায় চলে যান,আমি বাসার উপর থেকে আব্বার চলে যাওয়া দেখি।অনেক দিন হয়তো খালি বাসা, একলা বাসায় বাচ্চাদের রেখে আব্বা যেতে পারেন না। সেটাও অনেক কষ্টের ব্যাপার। এভাবে একসময় মাশুককে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে ভর্তি করালাম। আর ফারিয়া কোচিং শেষে ভিকারুননিসা স্কুলে ভর্তি হলো। ক্লাস শুরু করলো। খুব কষ্ট হতো অতো দূর থেকে ওদের স্কুলে আনা নেয়া করানো।

কোনদিন আব্বা নিয়ে যান কোনদিন বাচ্চাদের বাবা নিয়ে যান স্কুলে। ফারিয়া খুব ভিতু টাইপ মেয়ে,স্কুলের হোমওয়ার্ক বুঝতে পারছিলোনা।সেগুলো আবার স্কুলের টিচার, ক্লাসের বন্ধুদের বাসায় গিয়ে সংগ্রহ করা লাগছিলো। অসম্ভব এবং ভয়ানক হয়ে উঠলো জীবন কিন্তু তখনও জানতাম না জীবনে আরও কতো ভয়ংকর ব্যাপার থাকতে পারে!

স্কুল থেকে ফিরেই কয়দিন ধরে দেখছিলাম ফারিয়া বমি করে। ছোট মানুষ অথচ তার চোখের নীচে কালি! ডাক্তার দেখালাম, ডাক্তার এসজিপিটি টেস্ট দিয়েই বললেন আপনার কন্যাকে এখনই হাসপাতালে ভর্তি করেন। সামর্থ্যের মধ্যে পড়ে এমন একটা ক্লিনিক এ ভর্তি করালাম ফারিয়াকে। তার জন্ডিস ধরা পড়েছে অনেক কঠিন ভাবে। চিকিৎসা চললো প্রায় বারো দিন। এতো লম্বা সময় ধরে ক্লিনিক এ চিকিৎসা! আমরা যাতে একটু আরাম করে থাকতে পারি সেজন্য বড়ো কেবিন নেয়া হলো। একবার বাচ্চার কাছে থাকি, একবার বাসায় যাই পথ্য রাঁধি আবার ক্লিনিক এ যাই।কি একটা অবস্থা! এর মধ্যেই সেজেগুজে অনুষ্ঠানে যাই, রেকর্ডিং স্টুডিওতে যাই, হাসিমুখে গান গাই।এভাবে করে ফারিয়া একটু সুস্থ্য হলে তাকে বাসায় নিয়ে গিয়েই টের পেলাম মাশুকের ও শরীর খারাপ। সেও বমি করে ঘর ভাসাচ্ছে! এবার আর টেস্ট না করিয়ে সোজা ওই ক্লিনিকেই নিয়ে গেলাম। ডাক্তার বললেন বাসার পানিতে সমস্যা। মাশুকের অবস্থা ভয়াবহ রকমের খারাপ। ডাক্তার স্যালাইন দিলেন, সে স্যালাইন এর পানি মনে হয় সব পেটে জমলো। বাচ্চাটার পেট ফুলে ঢোল।আমি ভাবি আমার বাচ্চাটাকে কি আর আমি সুস্থ্য করে বাসায় নিতে পারবো? মায়ের মন, খালি কু ডাক দেয়।মাশুকের চিকিৎসা হচ্ছিলো কিন্তু কাজ হচ্ছিলো খুব ধীরে ধীরে। এই অবস্থাতেও দিনে একটা দুইটা করে ছবির গান গাই! ক্লিনিক থেকে স্টুডিও, স্টুডিও থেকে ক্লিনিক। কি ভয়ানক অবস্থা। আমার বাচ্চাদের ডক্টর ছিলেন বিশিষ্ট শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আবিদ হোসেন মোল্লা। উনি অসম্ভব ভালো ডাক্তার এবং ভালো মানুষ।মাস ধরে আমরা ক্লিনিক এ আছি, খরচান্তের ব্যাপার। উনি যখন সকাল বিকাল রাউন্ড দেন তখন দেখি উনি বাইরে দাঁড়িয়ে কুশলাদি জিজ্ঞেস করেন, ঔষধ দেন কিন্তু কেবিনে ঢোকেন না! কয়েকদিন ব্যাপার টা বুঝতে পারিনি। একদিন জিজ্ঞেস করলাম ডাক্তার সাহেব, আপনি বাইরে দাঁড়িয়ে সাজেশন দেন কেনো! উনি যা উত্তর দিলেন তা আমার এবং আমার হাজব্যান্ড এর সারাজীবন মনে থাকবে।উনি বললেন ভেতরে ঢুকলেই আমার রাউন্ডের খাতায় হিসাব কাউন্ট হবে, আপনারা এতো দিন ধরে এভাবে বিপদে পড়ে আছেন, এটুকু আমি করতেই পারি ভাই,আমার ভিজিট বড় ব্যাপার নয়।আপনার বাচ্চাটা সুস্থ্য হোক!

আমার বাচ্চাটা খুব ধীরে হলেও সুস্থ্য হয়ে উঠলো। আমরা ডাক্তার আবিদ হোসেন মোল্লা ভাইয়ের কাছে চিরকৃতজ্ঞ হয়ে বাড়ি ফিরলাম। এবং সঙ্গে সঙ্গেই বিশুদ্ধ পানির ফিল্টার লাগালাম বাড়িতে। বাচ্চাদের টিফিন বাসা থেকে খুব যত্ন করে গুছিয়ে দেয়া শুরু করলাম।

 আজ এতোদিন পর এই কথা লিখতে গিয়ে আমি আবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লাম। জীবনের এই চড়াই উৎরাই খানাখন্দ পেরিয়ে জীবন পাড়ি দেয়া চাট্টিখানি কথা নয়! হাসপাতালে থাকার সময় বুলবুল ভাই ইচ্ছে করেই যে গানগুলো আমার নয় সেটাও আমাকে দিয়ে গাওয়ালেন সে কথাও আমার মনে পড়ছে।এবং ডন কোম্পানির বাবুল ভাই , বুলবুল ভাই, কিশোর দা, মিলু ভাই তারাও ক্লিনিক এ গিয়ে আরও কিছু বাড়তি টাকা এবং অনেক ফলমুল খাবার দাবার সহ হাতে গুঁজে দিয়ে এসেছিলেন সে কথাও স্পষ্ট মনে আছে।

অনেক দিন পর আমি আবার তাঁদের সেই ভালোবাসার কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছি। কিন্তু এমন বিপদে আমার একবারও মনে হয়নি যে শিল্পীর সংসার থাকতে নেই।বরং আমি খুব মনোকষ্টে ভুগেছি যে আমি আমার সংসারের জন্য সঠিক ভাবে কিছুই করতে পারছিনা! আর এতোদিন পর আমার নতুন উপলব্ধি হচ্ছে, ঠিক এই মুহুর্তে আমার মনে হচ্ছে এই খানাখন্দও আমাকে অনেক পরিপক্ব করে বুঝিয়ে দিয়েছে যে জীবনে এমন উঁচুনিচু ভালো মন্দ শান্তি অশান্তি সুখ অসুখ থাকে কিন্তু তাকে সামাল দেয়াই একজন শক্তিমান মানুষের কাজ।আমি সেটা পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করেছি আমার জীবনসঙ্গী শ্বশুর শাশুড়ী বাবামা ভাইবোনের হাত ধরে। আমার পরিবার আমাকে আমার একান্ত পরিবার গড়তে সাহায্য করেছে। আলহামদুলিল্লাহ।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]