জীবনে এলো পরিবর্তন

উর্মি রহমান

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকব। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়

বাংলা বিভাগের ডেস্কে কাজ করার সময়

জীবন বেশ চলছিলো। রূপক স্কুলে খুশি ছিলো। প্রচুর বন্ধু-বান্ধব হয়েছে। ওর বাবা মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর একবার লন্ডন এলো। আমাকে ফোন করে রূপকের খবর জানতে চাইলো। জাহাঙ্গীরের সঙ্গে কথা বলতে আমার কোনো অসুবিধা ছিলো না। আমরা আধুনিক মানুষ। বনিবনা হয়নি, আলাদা হয়ে গেছি। আমি অন্ততঃ তিক্ততা পুষে রাখিনি। ঢাকায় একবার বইমেলার সময় মেলার মাঠে দেখা হলে আমরা কথা বলেছিলাম, যার বেশী অংশই ছিলো রূপককে নিয়ে। পরদিন অনেকে আমাকে ফোন করে জানতে চেয়েছে সত্যি আমি জাহাঙ্গীরের সঙ্গে কথা বলোিছ কিনা। আমি বলেছিলাম, “হ্যাঁ বলেছি, জাহাঙ্গীর তো আমার শত্রু নয়। সবচেয়ে বড় কথা সে আমার ছেলের বাবা।” জাহাঙ্গীরের এক বন্ধু (যে আমারও বন্ধু ছিলো) বলেছিলাম, ‘আমার কাছে এখন আপনার আর জাহাঙ্গীরের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

শুধু আপনার সঙ্গে হয়ত হাসি-ঠাট্টা করবো, তার সঙ্গে করবো না।’ জাহাঙ্গীর লন্ডন এলে কথায় কথায় বললো, সে রূপকাকে নিয়ে একদিন ঘুরতে চায় আর কিছু ছবি তুলতে চায়। কিন্তু কে ছবি তুলে দেবে? আমি গিয়েছিলাম ওদের সঙ্গে রূপকের ছবি তুলে দিতে। ওয়েস্টমিনস্টার ব্রিজ, পার্লামেন্ট হাউজ, টেমস নদী। আমার সহকর্মী বন্ধুদের কেউ কেউ আমাকে বকেছিলো, ‘তোমার কি দরকার ছিলো গিয়ে ছবি তুলে দেবার?’ আমি সেটা করেছিলাম আমার ছেলের মুখ চেয়ে। ও খুব খুশি হয়েছিলো। তার অনেক পরের কথা। রূপক খানিকটা বড় হয়েছে। এর মধ্যে একদিন স্কুল থেকে এসে আমার কাছে জানতে চাইলো ,‘মা, ডিভোর্স কি?’ বললাম, ‘তুই বুঝবি না।’ ও বললো, ‘তুমি বুঝাও, আমি বুঝবো।’ ওকে বলেছিলাম, ‘দু’জন মানুষ যখন আর বন্ধু থাকতে পারে না, তখন তারা আলাদা হয়ে যায়।’ ও বেশ মাথা নেড়ে চলে গেলো। তার ক’দিন পর আবার এসে বললো, ‘মা, তুমি একটা রি-ম্যারী করো না কেন?’ বুঝলাম মিশ্র জাতির বাচ্চাদের বিশেষ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ ইংরেজ বাচ্চাদের আলোচনা শুনে ওর এসব কথা মনে হয়েছে।

সাগর, উর্মিলা এবং আমি

পশ্চিমা বিশ্বে এসব খুব স্বাভাবিক ঘটনা। আমি বললাম, ‘তাতে তোর কি লাভ হবে?’ ও বললো, ‘তাহলে আমি একটা আব্বা পাবো।’ আমি বললাম, ‘তোর তো আব্বা আছে।’ ও বললো, ‘না, তোমার সঙ্গে একটা আব্বা চাই।’ বুঝলাম ও চারপাশে সবাইকে দেখে ওর জীবনে একটা পারিবারিক পরিবেশের অভাব অনুভব করছে। এ নিয়ে আর কথা হয়নি। তবে আবার বিয়ে করার কোনো পরিকল্পনা আমার ছিলো না। আমি কাজ করে যাচ্ছি। সেই সঙ্গে সহকর্মী বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা চলছে। প্রায় আমরা দল বেঁধে বাইরে রেস্টুরেন্টে খেতে যাই। বিলেতে আবার একটা মজার প্রথা আছে। কারো জন্মদিন হলে সে সবাইকে বলে তার সঙ্গে বাইরে খেতে যেতে। প্রথমবার গিয়ে তো আমি বেশ বিব্রত হয়েছিলাম। গিয়ে দেখি যার জন্মদিন সে কিন্তু বিল পরিশোধ করেনি।

যার যার খাবারের দাম তাকেই দিতে হয়েছে। জানলাম সেটাই প্রথা। আমি প্রস্তুত না থাকলেও ব্যাগে বিল পরিশোধের মত যথেষ্ট টাকা ছিলো। এরকম আমরা বাংলা বিভাগের কেউ কেউ খেতে যেতাম। সাগর আসার পর, তার সঙ্গে কয়েকবার যাওয়া হয়েছে। সঙ্গে বেশীর ভাগ সময় লিসা (সামিয়া জামান) থাকতো। কোনোদিন অন্য কেউ কেউ। ফেরদৌস কোরেশীভাই প্রায়ই সিনেমা দেখাতেন। তিনি অবশ্য সবার টিকেট কাটতেন। তবে আমরাও কখনো কখনো জোর করতাম, সেদিনের ছবিটা আমি দেখাবো বলে। সাগর এ ব্যাপারে মোটামুটি সফল হতো। এ ভাবেই চলছিলো। হঠাৎ একদিন সাগর আমাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিলো।

আমি এত অবাক হয়েছিলাম যে, সঙ্গে সঙ্গেহ ‘না’ বলে দিয়েছিলাম। লিসা বোঝালো, ‘তুমি যদি কখনো বিয়ে করো, তাহলে সাগরদাকেই করা উচিত।’ আমি তবু অনেক ভাবছিলাম। এর মধ্যে সাগরের সঙ্গে রূপকের বেশ ভাব হয়ে গিয়েছিলো। অনেক ভাবলাম। তারপর রূপককে জিজ্ঞাসা করলাম। ও তো খুব খুুশি হয়ে উঠলো। আমি কয়েকদিন পর রাজী হলাম। কিন্তু সাগরকে বললাম, সরাসরি বিয়ে করবো। ঝুলিয়ে রেখে কোর্টশীপ নয়। তারপর সবাইকে জানালাম। বলাবাহুল্য সবাই খুব খুশি হলো। ১৯৮৯ সালের জুলাই মাসে আমরা বিয়ে করলাম। তবে তার আগে-পরের অনুষ্ঠান সম্পর্কে পরবর্তী কিস্তিতে জানাবো। কারণ এ ব্যাপারে কিছু মানুষের কথা না বললেই নয়।


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box