জীবন আমার, আমার করে রইলো না

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকনকচাঁপা কচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

পুরস্কার পাওয়ার পরে এমন অবস্থা হলো যেন আমি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছি। প্রোডিউসার ডিরেক্টর সবাই প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সবার কথা আগেই বলেছিলাম! হতে পারেন, উনারা অভিজ্ঞ মানুষ, অনেক কিছুই আঁচ করতে পারেন। আমি কখনওই পারিনা।এরপর গানের চাপ আরও বেড়ে গেলো। বেশীরভাগ গান গাচ্ছিলাম বুলবুল ভাইয়ের। এমন অবস্থা দাঁড়ালো যে বুলবুল ভাইয়ের ছবিতে পাঁচটা ছয়টা সাতটা গান নায়িকার হলে সেগুলো সব আমার গাইতে হতো। আলাউদ্দিন আলী ভাইয়ের কাছেও নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠলাম। আবু তাহের , আলী আকবর রুপু, শেখ সাদী খান, আনোয়ার পারভেজ উনাদের গান ও গাইতে থাকলাম।আলম ভাইয়ের রাগ বা গোস্বা ভাঙলো, উনি প্রায় বারো বছর পর আমাকে ডাকলেন,এবং ডেকে একাধারে গান গাওয়াতে থাকলেন। ছবির গানে সুরকার হিসেবে নাম লেখালো শওকত আলী ইমন ও আলী আকরাম শুভ এবং ইমন সাহা।তারাও রেগুলার আমাকে গাইতে ডাকা শুরু করলো। যখন তখন ফিল্মের গানের ডাক, সে যে কি এক অভাবনীয় আনন্দ, আমি বলে বুঝাতে পারবো না।গান গাইলে সঙ্গে সঙ্গে পেমেন্ট পাওয়া যায়।তাতে সংসার সচ্ছল হয়ে উঠছিলো।সচ্ছলতা সুখ আনে বলাই বাহুল্য। আমি আপাদমস্তক সুখী মানুষ হয়ে উঠছিলাম।কিন্তু সংসার বা সমাজ সামাজিকতা আমার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছিলো। আমি অনেক চেষ্টা করে ঘরের কাজ আগের মতই করার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু দিনশেষে দেখা গেলো কিছু কাজ বাকীই থেকে যাচ্ছিলো। যেমন কোনদিন হয়তো ভাবলাম আজ তোয়ালে গুলো কাপড় কাচা সোডায় সেদ্ধ করে ধোবো কিন্তু কিছুতেই সেটা পারলাম না।হয়তো বাচ্চাদের হোমওয়ার্ক আছে তা করাতে পারলাম না।হয়তো পরের দিন কিছু রান্না করেই দৌড়াবো রেকর্ডিং এ, কিন্তু আর রান্নার সময় হলো না।শুধু একটু ভাত সেদ্ধ করেই চলে যেতে হলো সেখানে পুরো পরিবার ডিমভাজা দিয়ে ভাত খেলো। এভাবে আমি পিছিয়ে পড়ছিলাম সংসারের কার্যক্রম থেকে। তবে অসুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আমি গান গেয়েই গেছি।মাদারটেক বাসাবোর রাস্তা বছরের সবসময়ই কাটা থাকতো। খানাখন্দ, রিকশা, কতকিছুর সঙ্গে যুদ্ধ করে স্টুডিওতে গেছি। একটা জিনিস আমি প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি যে কনকচাঁপা সবসময় ইনটাইম।বিকেল পাঁচটা বললে পাঁচটা, অবশ্যই তা সাড়ে পাঁচটা নয়, রাত তিনটা বললে তিনটাই।রাত বিরেত, রোজার ঈদের দিন, কোরবানি ঈদের দিন, এমন কোন দিন নাই যে আমার ডাক আসেনি অথবা আমাকে কেউ ডেকে পাননি।আমি আমার জীবনসঙ্গীর সহায়তায় চব্বিশ ঘন্টাই এভেইলেবল ছিলাম।গায়ে একশো চার জ্বর নিয়েও গান গেয়েছি, আত্মীয় স্বজন মারা গেলেও চোখের জল মুছেও গান গেয়েছি।

বুলবুল ভাই সে সময় এমন ব্যস্ত ছিলেন যে প্রায় প্রতিদিন উনার একটা দুইটা গান থাকতো। এবং ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়েছিল যে ওনার গান মানেই আমার গান।আমি হয়তো সকালে রেকর্ড করে বাসায় গিয়ে সংসারের ঝুলি খুলে ধরেছি।তখনই ফোন এলো আরেকটা গান গাইতে হবে এখনই।আমি হয়তো ফ্রিজ থেকে মাছ গোস্তো ভিজিয়েছি রান্না করবো কিন্তু গান আমাকে ডাকছে। অগত্যা সেগুলো আবার ফ্রিজে ঢুকিয়ে চলে গেছি গান গাইতে। অথচ আমি তখনও জানিনা কি কথা, কি সুর, আমি শুধু জানি গাইতে হবে ঠিকভাবে। আমি স্টুডিওতে গেছি।সুরকার সুর তুলে দিয়েছেন, আমি তা মিনিট পাঁচেকের মধ্যে গলায় তুলে মিনিট বিশেকের মধ্যে গেয়ে আবার বাড়ি ফিরে গিয়ে সেই মাছ গোস্তো আবার নামিয়ে রেঁধে সংসার গুছিয়ে মাঝরাতে ঘুমুতে গেছি আর ভেবেছি আমি কি মেশিন হয়ে যাচ্ছি? না, মেশিন আমার হওয়া যাবেনা। মেশিনের গান ভালো শোনায়না।আমাকে মায়াবতী মানুষ হতে হবে।এ গান আমার অফিসের কাজ নয় গান আমার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। আমাকে হৃদয়বান হয়ে গান গাইতে হবে, সংসার দেখতে হবে কিন্তু আমার আমি? আমার আমি কি পারবে সব কিছু সামাল দিয়ে পথ চলতে। রাতের ঘুমের মধ্যে অথবা শুরুতেই মনে হতে লাগলো আমার জীবন আমি কৈশোরেও হাতে পাইনি, যৌবনেও সেভাবে পাচ্ছিনা।এজীবনে জীবনকে কি আর নিজের করে পাবোনা?

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]