জীবন আমার, আমার হাতে রইলো না, রইলো না

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

জীবনের সর্বোচ্চ ব্যাস্ততম জীবন এসে গেলো আমার জীবনে। ছবির গানের জন্য যেন আমি ফায়ার ব্রিগেড এর কর্মীদের মতো হয়ে গেলাম। হয়তো ঘুমুতে যাবো, এলার্ম বাজলো আমি জাস্ট ইউনিফর্ম পরে পাইপ লাইন ধরে পিছলা খেয়ে নীচে নেমে কাজে যোগ দিলাম। দাঁত ব্রাশেরও সময় নাই।যেমন বলছি এমনই সময় দাঁড়ালো। বেশীরভাগ সময় শ্রদ্ধেয় বুলবুল ভাই, আলী ভাই, আলম ভাই, আবু তাহের ভাই, শওকত আলী ইমন,ইমন সাহা,আলী আকরাম শুভ, আলী আকবর রুপু উনাদের গান গাচ্ছিলাম।কিন্তু ব্যাপারটা এমন দাঁড়ালো যে যারা একটা ছবিও হাতে নেন তাঁদের ছবিতেও আমার গান থাকে। যেমন মোস্তাক আহমেদ, আলাউদ্দিন মিয়া, দেবেন্দ্রনাথ, একে আজাদ মিন্টু, মাকসুদ জামিল মিন্টু, খায়েম আহমেদ, মিল্টন খন্দকার, এরফান টিপু, পিয়ারু খান, পারভেজ রব, কাজী জামাল,ফরিদ আহমেদ ,তানসেন খান, কাজী হাবলু, বাউল শিল্পী ইব্রাহিম, আশরাফ উদাস, মুজিব পরদেশী এমন আরও ভালো সুরকার যাদের কারো নাম হয়তো ফেলে যাচ্ছি তাদের সবাই আমাকে দিয়ে গান করিয়েছেন। ব্যাপারটা যে শুধু ছবিতে গাওয়া তা নয়, ব্যাপারটা পরীক্ষা নেয়ার মতো দাঁড়িয়ে গেলো।যেমন আশরাফ উদাস সাহেব আমাকে গান তুলে দেয়ার সময় খুবই কিউরিয়াস মুখভঙ্গি নিয়ে হারমোনিয়াম এ হাত দিলেন। খুবই তৃণমুল পর্যায়ের পল্লী গীতি।কিন্তু তারমধ্যে আবার অনেক কারুকাজ। উনি আমাকে দিয়ে গাওয়াবেন বলে অনেক পরিশ্রম করে সুর করেছেন। হারমোনিয়ামে হাত দিয়েই উনি মিটিমিটি হাসেন। গান তুলে দেন অল্প একটু আবার মিটিমিটি হাসি।আমি একটু বিব্রত হচ্ছিলাম। প্লেব্যাক করার ব্যাপারটা যেহেতু পিছনের কাজ তাই আমি একদম সাদাসিধা সালোয়ার কামিজ পরে এমনভাবে স্টুডিওতে যেতাম যে মহরত মানে ছবির শুরুয়াৎ এর যে অনুষ্ঠান হয়, আনুষ্ঠানিক ভাবে মাইক্রোফোন এ বিসমিল্লাহ বলে রেকর্ড শুরু হয় সেটা মহরত, তো অনেক ডিরেক্টর ছবির অভিনয় দিয়েই মহরত করেন। কিন্তু অনেক ছবি আবার গান দিয়েই মহরত হয়।স্টুডিওতে নায়ক নায়িকারা আসেন সেজেগুজে। আমি হয়তো জানিই না আজ মহরত।কত আর জানবো! গিয়ে দেখি সবাই, মেহমানরাও পুরোপুরি মেকআপে এসেছেন। আমিই খালি সাদামাটা ভাবে ওড়না ঘোমটার মতো পেঁচিয়ে উপস্থিত। যারা আমাকে প্রথম দেখেছেন তারা বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে থাকতেন।

আমি কিছু মনে করতাম না তবে এটাও ঠিক রোজকার কাজে অ-দরকারী সাজগোছ কখনো আমাকে দিয়ে সম্ভব ছিলো না।আর মিউজিক ডিরেক্টররা কখনো এগুলো নিয়ে কোন কথা বলেননি।যাইহোক যা বলছিলাম, আশরাফ উদাস ভাইয়ের হাসি দেখে ভাবছিলাম কনকচাঁপার এমন ম্রিয়মাণ উপস্থিতি দেখে হয়তো উনার এই মৃদুহাসি। কিন্তু তা নয়,উনি গান টা ভাসা ভাসা তুলে দিয়ে বললেন ‘শোনেন, এই হইলো গানের খাঁচা।আপনি এবার প্রাণ আনেন।মেলা তো আপনার গান শুনছি, মেলা আপনার নাম শুনছি।এখন আমাকে তার প্রমাণ দেন।’ আমি পরীক্ষা দিতে দাঁড়িয়ে গেলাম।সেটা সিরিজ পল্লীগীতির গানের ছবি ।গান শেষে উনি মহরতের মিষ্টি মুখে দিয়ে রেকর্ডকৃত গান শুনতে গিয়ে কেঁদে ফেললেন এবং বললেন ‘বুবু,আপনি আমাকে আরও বিস্ময়ের মধ্যে ফেলে দিলেন।’ আমি নতমুখী। কিইবা বলার আছে।উনি আমার সাহেবকে বললেন প্রডিউসারকে আমি অন্য শিল্পীর নাম বলছিলাম। উনি বললেন না, এনাকেই লাগবে।খুবই ক্রিটিকাল পল্লীসঙ্গীত। এর মোচড় আর ভাঙা চোরার কায়দাই অন্যরকম। উনি গাইতে পারবেনা।প্রডিউসার নারাজ,বলেন আর কোন কথা নাই।তখন আমিও ইচ্ছে করেই একদম মারফতি পালাগানের প্রশ্নোত্তরের খেলার মতো চাল দিলাম এবং ভালোই একটা দুইটা উষ্টা রাখলাম গানে!উনি পানির মতো করে গেয়ে তো দিলেনই তাও আবার নিজে থেকেই আরও অন্যমাত্রায় নিয়ে প্রাণ সঞ্চার করে আমাকে পাল্টা জবাব দিলেন। বুবু, ‘আপনি কি আমার খেলা ধরতে পারছিলেন?’ আমি বললাম ‘না’ উনি অবাক। বলে আমি তো গান তোলার সময়ই হিন্টস দিলাম। আপনি টের পাননি? আমি উত্তর দিলাম  ‘এটা আমার রোজকার কাজ।কাজ সম্পন্ন করাই আমার কাজ।আমি দিনের কাজ দিনে শেষ করার জন্য নিজের সঙ্গে পরীক্ষা পরীক্ষা খেলি’।তখন উনি উচ্চহাসি হেসে বললেন, ‘এজন্যই আমি আপনাকে পরীক্ষায় বসাতেই পারিনি।আপনি কথায়ও পাকা।আপনাকে আমার শ্রদ্ধা।’ মোহাম্মদ ইব্রাহীম সাহেবের একটা বিখ্যাত গান আছে, যদি তুমি না থাকো পাশে মরণে কি আছে জীবনে আমার। ববিতা আপার লিপে সম্ভবত আমার একমাত্র গান।সে গান তোলার সময় ও উনি এমন পরীক্ষাই নিচ্ছিলেন। কিন্তু গানটা তো চিরায়ত সুরে করা। আমি পানির মতো গেয়ে দিলাম।উনি খুবই খুশি হলেন।গানটা আবারও হিট হলো। এরপর গেয়েছি মুজিব পরদেশীর সুরে আমার লাইন হইয়া যায় আঁকাবাঁকা। এই গান তুলে দেয়ার সময় পরদেশী ভাই বললেন, ‘আপনে তো বলে কারুকাজের মাষ্টার। দেন তো দেখি কেমন কারুকাজ পারেন গানের মধ্যে!’ আমি এই ধরনের কথাকে আগ্রহ ভরেই পজিটিভ ভেবে গ্রহণ করতাম। গেয়ে দিলাম।উনি বললেন, ‘আপনি তো শুনছিলাম কারুকাজের মাষ্টার এখন দেখি কারুকাজের ওস্তাদ!’ হাহাহা। আমি আবারও বলি ‘ভাই,এটা আমার রোজকার কাজ।’

এভাবেই এই স্টুডিও এই স্টুডিও এই পরীক্ষা ওই পরীক্ষা দিয়ে গান গাইছিলাম দিনরাত। আমার বাচ্চারা আমাকে একদমই পাচ্ছিলো না।তারাও ধৈর্য ধরা শিখে গেছে। ফারিয়া মাশুকের সঙ্গে সবসময় আব্বা আম্মা থাকতেন। আমি সবার কাছে সমান ভাবেই কৃতজ্ঞ।আমার আব্বা আম্মা পালা করে ওদের স্কুলে নিয়ে যেতেন নিয়ে আসতেন। বাসায় শিক্ষক আসলে ওদের পড়ার সময় আব্বা ঠায় বসে থাকতেন। ফারিয়ার জন্য একান্ত ভাবে একটা মেয়ে ছিলো চম্পা। যে আসলে ফারিয়ার সহচরী ছিলো। আমি সবার উপর সবকিছু ফেলে আমার জীবন সঙ্গীকে সঙ্গে নিয়ে গান গেয়ে চলতাম জলে স্থলে অন্তরিক্ষে। দেশে বিদেশে মঞ্চে স্টুডিওতে নানান টিভি চ্যানেলে দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে নিজের ঘুম খাওয়ার ও শিডিউল ছিলো না।আজ রাত দশটায় ফিরে বারোটায় ঘুমাতাম তো পরদিন রাত তিনটায় ফিরে ভোর বেলা ঘুমিয়ে উঠতাম আসর ওয়াক্তে। আমাকে সবাই এভাবে সাহায্য না করলে, আমার জীবনসঙ্গী তার ক্যারিয়ার ত্যাগ না করলে একলা একলা আমি এতো কাজ সঠিক ভাবে করতেই পারতাম না।এই কথা যেমন সত্য ঠিক এটাও সত্য এই গানের জন্য আমার নিজের জীবন নিজের জন্য নিজের করে একদিনের জন্য নিজহাতে পাইনি। আর ওই সময় জীবন আমার হাতে একটুও ছিলো না। তারজন্য আমার এতো টুকু আফসোস নেই।তবে একটা ঘরোয়া জীবনের জন্য মন আমার সবসময় কাঁদেই।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]