জীবন আমার বোন ৪৯ বছরে…

মাহমুদুল হক

‘জীবন আমার বোন’ উপন্যাসের বয়স হলো ৪৯। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় ঔপন্যাসিক মাহমুদুল হকের লেখা এই উপন্যাস। ১৯৮২ সালের পর মাহমুদুল হক আর লেখেননি।নীরবতার পর্দায় ঢেকে ফেলেছিলেন তিনি নিজেকে। কেন এই কথাশিল্পী বিমুখ প্রান্তরে ঘর বেঁধেছিলেন সে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। তাঁর লেখালেখির সময়টাও সর্বোচ্চ বছর দশেকের।কিন্তু ওই সময়ের ভিতরেই তিনি লিখে ফেলেছিলেন, ‘অনুর পাঠশালা’, ‘খেলাঘর’, ‘কালো বরফ’, ‘নিরাপদ তন্দ্রা’, ‘পাতালপুরী’-এর মতো উপন্যাস অথবা গল্প গ্রন্থ ‘প্রতিদিন একটি রুমাল’। মুক্তিযুদ্ধ, পরবর্তী সময়ে সামাজিক বাস্তবতার নানা দিক তাঁর আলাদা ভাষা ভঙ্গির হাত ধরে উঠে এসেছে। অথচ খুব বেশি পরিমাণে লেখেননি মাহমুদুল হক। হয়তো পৃষ্ঠা গুনে পাঁচ’শ পৃষ্ঠার একটি উপন্যাসের সমান হবে তাঁর উপন্যাস সমগ্রের আয়তন। কিন্তু তবুও তিনি বাংলাদেশের কথা সাহিত্যে অনন্য এক লেখক। জীবন আমার বোন উপন্যাসটি পাঠকের চেতনায় গেঁথে আছে গভীর ভাবে।

উপন্যাস আধুনিক গদ্য ভাষার পুত্র-কন্যা। ১৯৭২ সালে উপন্যাসটি যখন প্রকাশিত হয় তখন ৫৬ হাজার বর্গমাইলের ভিতরে ভিন্ন এক বাস্তবতা। দেশ সবে স্বাধীন হয়েছে। সমাজের এক ধরণের কাঠামো ভেঙে তৈরি হচ্ছে ভিন্ন মাপের কাঠামো। সেই অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের ঠিক পূর্বকালের প্রেক্ষাপট আর রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে মাহমুদুল হক রঞ্জু আর খোকা-দুই ভাইবোনের কাহিনি আর উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরেকটি আঙ্গিক হিসেবে ব্যবহার করলেন তাঁর উপন্যাসে। এ উপন্যাসটি মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকায় লেখা। উপন্যাসে যে সময়কালের উল্লেখ আছে তাতে পাঠকের এ সিদ্ধান্ত অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু এ উপন্যাসের একটি কেন্দ্রীয় চরিত্র খোকার কারণেই উপন্যাসটিকে পুরোপুরি মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাসের আখ্যা দেয়া যায় না হয়তো। খোকার জীবন কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে নিবেদিত হয়নি। সময়ের দাবিকে অস্বীকার করে উপন্যাসের নায়ক খোকা মুক্তিযুদ্ধ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। সে মেয়েদের শুধু মাংসপিণ্ড ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারে না। খোকা সেই উত্তাল সময়ের ঘোরের ভিতরে বেঁচে থাকে শুধু তার বোনের জন্য। জীবন তার কাছে বোনের মতো।

তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, এই উপন্যাসটি এত বছর ধরে এত তীব্র ভাবে বেঁচে থাকলো কেন? হয়তো উপন্যাসের গভীর আত্মার ভিতরে এক ধরণের সততা আর সরলতার জন্য।উপন্যাসের অস্তিত্ববাদী কেন্দ্রীয় চরিত্র খোকার ভণ্ডামি আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত রুখে দাঁড়ানোর জন্য।

বাংলাদেশের কথা সাহিত্যে মাহমুদুল হকও তাঁর ‘জীবন আমার বোন’ উপন্যাস সব ভণ্ডামি আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে ভীষণ ভাবে বেঁচে থাকলো। নতুন সময়ের পাঠকদের কাছে এ উপন্যাসের মূল্য অবশ্যই ভিন্ন হবে।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box