জীবন থেকে লেটারবক্স ও হারিয়ে যাবে কি…

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে । প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

তুষার কান্তি সরকার

তুষার কান্তি সরকার

প্রায় দুই যুগ আগের কথা। মা খুব ভোরে উঠতো। রান্না করতো হরেক পদ। আমি গরম ধোঁয়া ওড়া ভাত খেয়ে রওনা দিতাম ঢাকায়। ঘরের দরজা পেরোতেই মা বলে উঠতো- ‘দুগ্গা, দুগ্গা’। এরপpostboxর বাড়ি উঠোনে দাঁড়িয়ে মা আমার বাঁ হাতের কড়ে আঙুলে আস্তে করে কামড় দিত। এতে সন্তানের মঙ্গল হয়। ধর্মীয় ব্যাখা আছে।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে পথের পাশে শীতলা মন্দির। মা মন্দির থেকে ধুলো (শীতলা দেবীর আর্শীবাদ) নিয়ে আমার মাথায় দিত। আমিও মার বাধ্য ছেলের মত মন্দিরে প্রণাম করতে ভুল করিনি কোনোদিন।
গাঁয়ের পথ ধরে এগিয়ে যেতাম বড় রাস্তার দিকে। মা চলতো পাশেপাশে। এক সময় বড় রাস্তায় পৌঁছে ভ্যানে উঠলে মা বলতো,
-পৌঁছে চিঠি দিস বাবা।
মায়ের কণ্ঠ ভেজা।
চোখে জল নিয়ে মা তাকিয়ে থাকতো যতক্ষণ আমাকে দেখা যেত।
আমি ভ্যান থেকে নেমে বাসে চড়তাম। সকাল পেরিয়ে দুপুর হতো। তারপর বিকেল পেরিয়ে রাতে পৌঁছাতাম ঢাকায়।
স্নান সেরে খেয়েদেয়ে বসতাম মাকে চিঠি লিখতে। ‘মা আমি ভালোভাবে পৌঁছেছি’।
পরদিন সকালে চিঠি ফেলতাম চোঙের মতো লেটারবক্সে।
সেই চিঠি মায়ে হাতে পৌঁছাতে সাত, দশ এমনকি বিশ দিনও লাগতো। বিশ দিন আগে ভালোভাবে পৌঁছানোর সংবাদ মা পেত বিশদিন পরে।
প্রযুক্তির উৎকর্ষে এখন মুহূর্তের সংবাদ মুহূর্তে পাচ্ছে মানুষ। ঢাকা আসতে এখন আর রাত হয় না। মাকে ফোন করে বলি,
-মা আমি এখন এখানে, এখন ওখানে, এখন রিকশায়, এখন বাসাতে।
সময় বদলে গেছে। আমার মা এখনো আগের মতোই আছে। এখানো দরজা পার হতেই ‘দুগ্গা, দুগ্গা’ বলে। এখনো মন্দির থেকে ধুলো নিয়ে মাথায় দেয়। আমিও মন্দিরে প্রণাম করি। মা এখনো ঢাকায় আসার সময় আমার সঙ্গে আসে বড় রাস্তা পর্যন্ত। মা এখনো চোখে জল নিয়ে তাকিয়ে থাকে যতক্ষণ বাস দেখা যায়।
দুই যুগ পরে হয়তো আমার মা আর থাকবে না। মায়ের মতো কি লেটারবক্সও হারিয়ে যাবে আমাদের জীবন থেকে?

ছবিঃ লেখক ও সংগ্রহ