জীবন নিষ্ঠুরতর, কারণ সে মৃত্যুকে ভোলায়

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

চার দশক ধরে প্রায় পাঁচ’শ গল্প লিখেছেন। লিখেছেন বহু উপন্যাস।কথা সাহিত্য লিখতে লিখতে প্রকাশ করেছেন কবিতার বই।তিনি নরেন্দ্রনাথ মিত্র। বাংলা সাহিত্যে বেশ অনেকটাই অনালোচিত থেকে যাওয়া এক শক্তিমান চরিত্র।

খুব শৈশবে মা হারিয়ে ছিলেন। সেই মাতৃবিয়োগের স্মৃতি তাকে তাড়া করেছে শেষ জীবনেও, ছায়া ফেলেছে লেখায়।ডায়েরিতে তিনি লিখেছেন,‘বাল্য কৈশোর পার হয়ে প্রথম যৌবনে, যখন মা নয়, নারীর মধ্যে মনোরমাদের আমি দেখতে পাচ্ছি তখন আমার খেয়াল হয়েছিলো আমার মা কেমন দেখতে ছিলেন সে কথা জানবার।’

‘তোমাকে বাসি ভাল একথা ক্ষণে ক্ষণে/ বলিব তোমা ভাবি সদাই মনে মনে/ বলিতে যবে যাই কথা না খুঁজে পাই/ হতাশ হয়ে ফিরি আপন গৃহকোণে’। ‘মূক’ নামের মোট ষোলো লাইনের এই কবিতাটি প্রকাশ পেল দেশ পত্রিকার শ্রাবণ সংখ্যায়।কবির নাম নরেন্দ্রনাথ মিত্র। কাহিনিকার নরেন্দ্রনাথের এত তো পাঠক, কিন্তু ক’জনই বা জানেন তাঁর কবিতার কথা? অথচ প্রায় টানা কুড়ি বছর ধরে কবিতা লিখেছেন তিনি।

‘নিরিবিলি’ নামে নিজের  কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করলেন নরেন্দ্রনাথ। আর সেই বই নিয়ে লিখলেন স্বয়ং বুদ্ধদেব বসু।

‘কবিতা’ পত্রিকায় কী লিখলেন বুদ্ধদেব?‘‘শ্রী নরেন্দ্রনাথ মিত্রের পাঠকসংখ্যা আজ বিপুল, কিন্তু এ-বইখানা পড়ে (বা দেখে) আজকের দিনে কম পাঠকেরই সন্দেহ হবে যে এর প্রণেতা ও তাঁদের প্রিয় কথাশিল্পী একই ব্যক্তি।’’

প্রথম থেকেই নরেন্দ্রনাথকে কবিতা লেখার জন্য উৎসাহ দিতেন বুদ্ধদেব বসু। ‘কবিতা’ পত্রিকায় অনেক কবিতা ছাপিয়েছিলেন তিনি।

তবুও নরেন্দ্রনাথ মিত্র ছিলেন এক বিষণ্ণ কবি। মনকেমন করা অনুভূতি তাঁকে ঘিরে রাখতো সর্বক্ষণ। শুধু জীবনে নয়। সাহিত্যেও। তাঁর ডায়েরি সে কথাই বলে। নিজের জীবনের দুঃখের কথা না লিখতে পারার দুঃখ ।

কোনও দিনই কোনও কিছুতেই মুখ খোলেননি তিনি। কাউকে বলেননি নিজের বেদনার কথা। অবশ্য সে সব কথা লিখে গিয়েছেন ডায়েরিতে।

একবার প্রখ্যাত সাহিত্যিক সুবোধ ঘোষের বড় ছেলের জন্মদিনে গিয়েছিলেন নিমন্ত্রণ পেয়ে। তার কিছু দিন পরই আনন্দবাজার পত্রিকার লিফটে সুবোধ ঘোষের সঙ্গে দেখা। সুবোধ ঘোষ চিনতেই পারেননি নরেন্দ্রনাথ মিত্রকে। কষ্ট পেয়েছিলেন এরকম আচরণে। কিন্তু কাউকেই কিছু বলেননি নিভৃতচারী লেখক। শুধু ডায়েরিতে লিখলেন, সুবোধ ঘোষ নিশ্চয় কোনও কারণে সমস্যায় আছেন, তাই এই ব্যবহার! যে বন্ধুদের সান্নিধ্য পেতে চেয়েছিলেন তাঁরা এই মানুষটির সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ খুব একটা করেননি। কিন্তু এক ধরণের চুপ করে থাকাই ছিলো অভিমানী মানুষটির একমাত্র সঙ্গী। লেখার সময় কখনোই নিঃশব্দে লিখতে পারতেন না নরেন্দ্রনাথ মিত্র। লেখার সময় মুখে বলে বলে লিখতেন। গদ্যের মাঝেও এক ধরণের ছন্দের ওঠাপড়াটুকু হয়তো নিজের কানে শুনে নিতে চাইতেন।

নরোদ্রনাথের পাওয়া মেডেল বিক্রি করে দিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী। বিক্রির টাকা দিয়ে কেনা হয়েছিলো নাতনির পায়ের মল। ‘সান্ত্বনা পুরস্কার’ গল্পে এই ঘটনাটা নিয়ে এসেছিলেন তিনি। গল্পে মুখ্য চরিত্র রাতে এক পুরস্কার অনুষ্ঠান থেকে ফিরছেন। বাড়ি ফিরে প্রশ্ন করছেন, ‘আমি তো কোনও দিন প্রথম হইনি। পুরস্কারও পাইনি!  না, ছোটবেলায় অবশ্য একটা সিলভার মেডেল পেয়েছিলাম।’ বাড়ি ফিরে তিনি ড্রয়ারে সেই মেডেল যখন খুঁজছেন স্ত্রী এসে বলছেন, সেটা গলিয়ে নাতনির পায়ের মল কেনা হয়েছে।

স্ত্রীর সঙ্গে

নরেন্দ্রনাথ কলকাতায় প্রথম জীবনে উঠেছিলেন একটা মেসে। সঙ্গী ছিলেন বাংলা সাহিত্যের আরেক নক্ষত্র নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়। একই ঘরের মধ্যে দুই উঠতি সাহিত্যিক গল্প লিখছেন। ঘরে চেয়ার-টেবিলের কোনও বালাই নেই। দুজনেই যে যার বিছানায়। একজন উপুড় হয়ে শুয়ে নিঃশব্দে কলম চালাচ্ছেন, আর অন্যজন সামনে টিনের বাক্স রেখে তার ওপর খাতা রেখে লিখছেন। প্রথম জন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় আর দ্বিতীয় জন নরেন্দ্রনাথ। তখন কলকাতার শোভাবাজারের সেই মেসে একটি ঘরে পাঁচ জন। নরেন্দ্রনাথ, ভাই ধীরেন্দ্রনাথ, বন্ধু নারায়ণ আর বাকি দুই বোর্ডার গেঞ্জিকলের শ্রমিক। মাথাপিছু মাসিক ভাড়া দুই টাকা।

স্ত্রী শোভনার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। বিয়ে করতে না চাইলেও বিয়ে যখন হলো, তখন স্ত্রীকে চিঠি লিখে কবিতা পড়াতেন। গল্পের বই পাঠাতেন। শিল্পবোধ তৈরি করে দিয়েছিলেন স্ত্রী‘র মধ্যে। তবে নরেন্দ্রনাথ মিত্রের অস্ফুট প্রেমকে শোভনা কোনও দিন গ্রহণ করতে পারেননি।  এক মহিলার বাড়িতে আনাগোনা ছিলো। তিনি নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ছবি তুলতে আসতেন। অপ্রকাশিত পরিচয়ের আড়ালেই তিনি রয়ে গেছেন আজও। বাংলাদেশের সেই ভদ্রমহিলার উপস্থিতি নরেন্দ্রনাথের স্ত্রী পছন্দ করতেন না।

নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ‘রস’ গল্প নিয়ে হিন্দীতে সিনেমা হয়েছিলো। ‘সওদাগর’ নামে সেই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন অমিতাভ বচ্চন। সত্যজিৎ রায় তাঁর গল্প ‘মহানগর’ অবলম্বনে ছবি করেছিলেন। পরিচালক রাজেন তরফদার করেছিলেন ‘পালঙ্ক’।

পূজাসংখ্যার লেখা লিখছিলেন সে বছর। সকালে একটি গল্প শেষ করে অফিস গেলেন নরেন্দ্রনাথ।বিকেলের দিকে একটু তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বাড়ি ফিরে এলেন। কোথায় যেন একটু অস্বস্তি লাগছে। কিন্তু চিরকালের মুখচোরা মানুষ ছিলেন, কাউকে কিছু বলেননি। বাড়িতে সেদিন গানের আসর বসেছে। অনেক বন্ধুবান্ধব। কিন্তু শরীরের অস্বস্তিটা যাচ্ছে না। এই করতে করতেই রাত বাড়ে, বাড়ে অস্বস্তিও।

চেনাজানা কেউ মারা গেলে আফসোস করে নরেন্দ্রনাথ বলতেন, ‘‘জীবন এই রকমই। চলতে চলতে হঠাৎ কখন থেমে যায়। সব কিছু অসমাপ্ত পড়ে থাকে।’’

১৯৭৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর সেই গভীর রাত। সত্যি সত্যিই হঠাৎ থেমে গেলেন নরেন্দ্রনাথ।

পড়ে রইল তাঁর অধরা আত্মজীবনী! তিনি বলতেন, মৃত্যু নিষ্ঠুর, কারণ সে জীবনের সমাপ্তি এনে দেয়। জীবন নিষ্ঠুরতর, কারণ সে মৃত্যুকে ভোলায়।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্র ও ছবিঃ আনন্দবাজার পত্রিকা

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]