জুয়ার শহরে…

ইরাজ আহমেদ

প্রায় বছর তিরিশ আগের কথা। থাকতাম সিদ্ধেশ্বরী এলাকায়। কাছেই শান্তিনগর বাজার। একদিন বাজারের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি হঠাৎ একজন মানুষের হাঁকডাক কানে এলো। মানুষটা চীৎকার করে বলছে, ‘আসেন, আসেন কেউ টাকা পায়, কেউ কাঁঠাল পায়, কেউ রুমাল পায়, কেউ খালি পায়। ‘কেউ খালি পায়’ কথাটা হঠাৎ কানে ধাক্কা দিলো। রাস্তার পাশে একজন মানুষকে ঘিরে ভীড় জমেছে। ভীড় সরিয়ে উঁকি দিতে দেখি মাটিতে একটা ঘর কাটা বড়সড় কাগজ রেখে বসে আছে সেই মানুষটি। জুয়া খেলা চলছে।কাগজের ওপর টিনের তৈরী একটি কাটা ঘুরছে। কাগজে কাটা ঘরগুলোতে একটা করে জিনিস রাখা। সেই পণ্য তালিকায় একটি কাঁঠালও ছিলো।লোকজন একেকবার এক টাকা করে লোকটির হাতে দিচ্ছে আর লোকটি কাটা ঘোরাচ্ছে। কাটা যে ঘরে গিয়ে থামবে সেখানে রাখা পণ্যটি ওই ব্যক্তি জিতে নেবে। কিন্তু বেশীরভাগ মানুষেরই সেদিন ভাগ্যের কাটা খালি ঘরটাতে গিয়ে থামছিলো অজানা কারণে। সেই খালি পাওয়ার কথাটা আমার আজো মনে আছে। জুয়ার দানে বেশীরভাগ মানুষ কি ‘খালি পায়’? সঠিক উত্তরটা আজো জেনে উঠতে পারিনি। তবে এই শহরে জুয়ার দানে আমার কপালে বেশীরভাগ সময় জুটেছে শূণ্যের ঘর।
ওরকম ভাগ্যের জুয়ার খেলোয়াড়দের আজকাল পথের পাশে আর দেখি না।
জুয়া খেলা ব্যাপারটা ভালো করে বোঝার আগে জুয়াড়ীর সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিলো আমার। বাঙলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে এক দুপুরবেলা জুয়ার আসর থেকে তাড়া খেয়ে এক লোক ঢুকে পড়েছিলো বাসার ভেতরে। আমি তখন স্কুলের ছাত্র। বাইরে ছোরা হাতে তাড়া করছিলো তাকে কিছু মানুষ। সেই লোকটির ভীত চেহারা, পাঞ্জাবীতে রক্তের ছোপ আজো মনে আছে।
আমি তাসের জুয়া খেলা শিখি সত্তরের দশকের শেষ ভাগে। তখনও স্কুলের অবরোধ ভাঙ্গতে পারিনি। কিন্তু নিষিদ্ধ কাজের আকর্ষণে জুয়ার পৃথিবীটা দেখা হয়েছিলো। শিখেছিলাম তিন তাসের জুয়া। ইংরেজিতে ফ্ল্যাশ খেলা। বন্ধুদের কাছ থেকে দ্রুত শিখেছিলাম ট্রয়, ফ্ল্যাশ আর রান শব্দগুলো। আমার জুয়া খেলার শুরু দশ পয়সা, পাঁচ পয়সা দিয়ে। তখন তিন তাসের জুয়ার এমনি চল ছিলো। মনে আছে যেদিন টাকায় খেলা হতো সেদিন জুয়ার বোর্ড আলাদা উত্তাপ ছড়াতো।কোনো বন্ধুর বাড়ির ছাদের সিঁড়িঘর, আমাদের পাড়ার গার্লস স্কুলের ছাদে, অথবা তখন পরিত্যক্ত কালী মন্দিরের আঙ্গিনায় বসতো আমাদের জুয়া পর্ব।এভাবে জুয়া খেলার জন্য মারও খেয়েছি পাড়ার এক বড় ভাই মনিশ ভাইয়ের হাতে।
তখন ঈদের পরে ঢাকা শহরের নানা জায়গায় মেলা হতো। সেখানে লটারী আর জুয়া খেলার আসর বসতো।তখন বন্ধুরা দল বেঁধে মেলায় গিয়ে ঈদের সামান্য গ্রাপ্তির টাকা খরচ করতাম জুয়া খেলায়। তবে কখনোই আমি অন্তত জুয়া খেলে জিততে পারিনি।
সেই আশির দশকের গোড়ায় দেখেছি বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ করে বাজারের সামনে বিশাল বিশাল ক্যারাম খেলার বোর্ড পাতা হতো। তখন এই শহরে ক্যারম খেলার বেশ প্রচলন ছিলো। ওই গণ ক্যারম খেলাগুলো হতো টাকার বিনিময়ে বাজী ধরে। সেগুলোও ছিলো জুয়া। সেখানে অবশ্য বেশ বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে খেলা হতো। শৈশবে বহুদিন সেই বোর্ডের পাশে দাঁড়িয়ে ক্যারম খেলা দেখেছি।
এবার বলি সেই কিশোরবেলায় জুয়া খেলতে গিয়ে আমার এক বন্ধুর বিপদে পড়ার গল্প। কোনো এক বন্ধুর থাকবার ঘরে এক বৃষ্টির বিকেলে জুয়া খেলা চলছে।বাইরে থেকে বৃষ্টিতে ভিজে আরেক বন্ধুর আগমন ঘটলো।হাতে ধরা একটা পাউরিুটি, বাসার জন্য কিনেছে। সেই বন্ধু আমার মতো কিছুক্ষণ দর্শকের ভূমিকা পালন করে ঢুকে পড়লো খেলায়। প্রথম রাউন্ডে পকেটের সামান্য কিছু পয়সা উড়ে গেলো। মন খারাপ করে সেই বন্ধু আবার খেলতে চাইলো পয়সা উদ্ধার করার জন্য। কিন্তু তখন তো তার পকেট শূণ্য। তাই বাজী হিসেবে সে বোর্ডে রাখলো পাউরুটি। কপাল মন্দ হলে এমনি হয়। বন্ধুটি রুটিটাও হেরে বসলো। রুটি বেহাত হওয়ার পর আমার সেই বন্ধুর হুঁশ ফিরলো। তার সামনে তখন সমুহ বিপদ। রুটি ছাড়া তো সে বাসায় ঢুকতে পারবে না। যে বন্ধুটি সেদিন রুটিটা জিতেছিলো তাকে অনেক অনুরোধ করার পরেও সে রুটি ফেরত দেয়নি। স্মৃতি হাতড়ে অবশ্য সেদিনের সংকটের সমাধান কী হয়েছিলো তা মনে করতে পারছি না এখন।
পুরান ঢাকায় গড়ে একদা উঠেছিলো বেশ কয়েকটি পতিতাপল্লী।সাংবাদিকতার কাজ করতে গিয়ে ওই এলাকার আশপাশে কয়েকটি জুয়ার আসরের কথা শুনেছিলাম। পরে এক সোর্স আমাকে ইংলিশ রোডের পতিতা পল্লীর পেছনে নিয়ে যায় একটি জুয়ার আসরে। সেখানে দেখেছিলাম পেশাদার জুয়াড়ীদের হাই স্টেকে জুয়া খেলতে। এই শহরে বিভিন্ন ফুটবল ক্লাবে নিয়মিত বসতো জুয়ার আসর। এখনো সেসব ক্লাবে জুয়ার বোর্ড বসে কি না আমার আর জানা নেই। ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, ভিক্টোরিয়া ক্লাব, ওয়ারী ক্লাব ছিলো জুয়ার জন্য খ্যাতিমান। আশির দশকের শুরুতে এই ক্লাবগুলোকে কেন্দ্র করে কয়েকটি আলোচিত খুনের ঘটনাও ঘটে।
ঢাকার বড় বড় তারকা হোটেলে জুয়ার আসরও একদা কম খ্যাতিমান ছিলো না। জুয়া খেলা হতো প্রাইভেট ক্লাবগুলোতেও। ক্লাবে জুয়া খেলার ধারাবাহিকতা অবশ্য এখনো বজায় আছে।

ছবিঃ লেখক