জয়তু জাকির ভাই

 

 

ওস্তাদ জাকির হোসেনের সঙ্গে লেখক

দেলওয়ার এলাহী

(টরন্টো থেকে): সালটা ১৯৯৫। মন্ট্রিয়াল শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে বিশ্বখ্যাত ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়। মন্টরয়াল পাহাড়ের পাদদেশে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ও পার্শ্ববর্তী এলাকাটা আমার খুব প্রিয়। সময় পেলেই এইসব এলাকায় ঘুরে বেড়াই। আমার বাসাও ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই। ভাগ্যিস একটি কাজও জুটে গেলো বাসার কাছাকাছি একটা ভারতীয় রেস্তোরাঁয়। ‘ল্য তাজ’ নামের এই রেস্তোরাঁর মালিক একজন ভারতীয় ধনী ভদ্রলোক৷ এই পরিবারের কর্তা কাপুর সাহেব সৌখিন ও শিক্ষিত মানুষ। রেস্তোরাঁর বাইরেও তাঁর প্রত্নরত্নের ব্যবসা। ল্য তাজ রেস্তোরাঁটিও একেবারে ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি। এই রেস্তোরাঁর অধিকাংশ ক্রেতা ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, ছাত্রছাত্রী।
ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক তরুণ অধ্যাপকের বিয়ে হবে৷ সেই বিয়েটা হবে মন্ট্রিয়াল শহর থেকে ২ ঘন্টা দূরে বিশাল পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এক মন্দিরের আঙিনায়। কাপুর সাহেব বললেন- সেই বিয়েতে রেস্তোরাঁ থেকে খাবার নিয়ে আমরা সেখানে টেবিল সাজিয়ে পরিবেশন করবো৷ স্বয়ং কাপুর সাহেবও আমাদের সাথে যাবেন। গ্রীষ্মের এক রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনে আমরা সেই পাহাড়ের চূড়ায় খাবার নিয়ে হাজির হলাম। সুন্দর করে টেবিল সাজিয়ে খাবার রাখা হলো। খাবার সাজানো শেষ হলে আমরা কয়েকজন পানীয়ের ট্রে হাতে অতিথিদের কাছে গেলাম। মন্দিরের আঙিনায় ইতিউতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অতিথিদের মাঝে সহসাই একজনকে দেখে আমার চোখ আটকে গেলো। সারা পৃথিবীর সেরা তবলিয়া ওস্তাদ জাকির হোসেনকে দেখে যুগপৎ আমার খুশি ও চাঞ্চল্য বেড়ে গেলো। ভারত থেকে তিনি এই বিয়েতে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়েছেন। সেখানে ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের সাথে ওস্তাদ খুব নিবিড়ভাবে কথা বলছিলেন৷ তাঁরা বসেছিলেন একটি বিশাল পাথরের উপর। তাঁদের দুজনের কাছে গিয়ে আমি প্রথমে কুশল বিনিময় করলাম। আমার ট্রেতে থাকা পানীয়ের পাত্র তাদের হাতে তুলে দিলাম। আমাকে ধন্যবাদ দেওয়ার পর জাকির হোসেনকে বললাম- আপনাকে কি আমি কিছু জিগ্যেস করতে পারি? এর মধ্যে ওস্তাদ আমার নাম জেনে নিয়েছেন। আমার জিজ্ঞাসা শুনেই জাকির বললেন- নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই ভাই দেলওয়ার; কী জানতে চাও? 
সেই সময় ওস্তাদ আল্লা রাখার শরীরটা তেমন ভালো যাচ্ছিলো না৷ পত্র পত্রিকার মাধ্যমে আমরা সেই খবর জানি৷ অভয় পেয়ে আমি বললাম – আপনার বাবা এখন কেমন আছেন? প্রশ্ন শুনে তাঁর চোখ চিকচিক করে উঠলো। অনেকটা আবেগ প্রবণ হয়ে গেলেন বলে মনে হলো। কিছুক্ষণ থেমে, আস্তে আস্তে স্পষ্টভাবে আমাকে বললেন- এখন ভালো আছেন! বাবার কথা জিগ্যেস করায় অনেক অনেক ধন্যবাদ ভাই। অতঃপর জাকির হোসেন আমার সাথে গল্প জুড়ে দিলেন। জিগ্যেস করলেন বাংলাদেশে কোন জায়গায় আমার বাড়ি। কতদিন হলো কানাডায় এসেছি। এদেশে আমার কেউ আছে কি না; এবং, কানাডা দেশটি আমার কেমন লাগে। খুব মায়ামাখা ভাষায়, মৃদুস্বরে তিনি আমার সাথে কথা বললেন। সহাস্যে বললেন -‘আমি কিছু কিছু বাংলা বলতে পারি।’
এক সময় ওস্তাদ তাঁর সাথে গল্পরত সেই অধ্যাপককে বললেন – জনাব, আমার ভাই দিলাওয়ারের সাথে আমার একটি ছবি তুলে দিন৷ ‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই বলে অধ্যাপক ক্যামেরা হাতে উঠে দাঁড়ালেন। পাথরে বসা জাকির হোসেন আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে বসালেন। আমার কাঁধে হাত রেখে অধ্যাপককে বললেন, ‘আমার ভাইয়ের সাথে এভাবে ছবিটা তুলুন, প্লিজ।’
অধ্যাপক ক্যামেরায় ক্লিক করলেন কয়েকবার। ছবি তুলা শেষ হলে সেই অধ্যাপককে অনুরোধ করলেন আমার ঠিকানাটা নিয়ে নিতে। অধ্যাপক তাঁর পকেট থেকে কলম ও টেলিফোন নাম্বার ও কারো নাম ঠিকানা লিখে রাখার মতো ছোট্ট একটা পকেট ডায়েরি বের করে আমার ঠিকানা লিখে নিলেন। জাকির হোসেন সেই অধ্যাপককে অনুরোধ করলেন আমার ঠিকানায় ছবিটি প্রিন্ট করে পাঠিয়ে দিতে। এবং কী আশ্চর্য যে, এর ঠিক সপ্তাহ দশদিন পরই খামের ভিতর চলে আসলো এই ছবি!
আমি মাঝে মাঝে এই ছবির দিকে তাকিয়ে থাকি। মানুষটি সেই আমিই; অথচ, কতভাবে সেই আমি নই! কিন্তু তবু, তেইশ বছর পুরনো এই ছবিটি এখনো কত জীবন্ত! মায়ার কাজল মাখা দুটি মানুষেরই চোখে, চুলে সারা অবয়ব জুড়ে। একই মানুষ হলেও ছবিতে ধরে রাখা তেইশ বছর আগের মানুষটির উচ্ছ্বাস, আবেগ, অনুভূতি, বোধ ছিল ভিন্নমাত্রায়। ছবি ছাড়া সেই মানুষকে ফিরে পাওয়ার আর কোন উপায়ই যে নেই!

মিষ্টভাষী, বিনয়ী, মহৎপ্রাণ ওস্তাদ জাকির হোসেনের সাথে আমার দেখা হয়েছিল। কথা হয়েছিল। এবং তিনি আমার কাঁধে হাত রেখেছিলেন। তাঁর মধুময় সেই সান্নিধ্য এখনও আমি অনুভব করি৷

জয়তু জাকির ভাই!

ছবি: লেখক ও গুগল