ঝরাপাতার দিন…

রুদ্রাক্ষ রহমান

ক’দিন আগেও বাতাস বইছিলো উত্তর থেকে দক্ষিণে।  হঠাৎই এমন কী ঘটলো? বাতাস দিক পাল্টে নিলো। দক্ষিণ থেকে  উত্তরে। তারপর এক বিকেলে হু হু হাওয়া। শুরু হলো অদ্ভুত হাওয়ার রাত। সেই বাতাসে পাতারা ঝরে পড়লো। গাছের ডাল থেকে মাটিতে নামার আগে হাওয়ায় ভর করে নাচলো, উড়াল দিলো ঝরাপাতা; কোন সে ঝরা পাতা? যে ঝরাপাতার দলে আছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর এমন সব অদ্ভুত হাওয়ার রাত দেখেছিলেন জীবনানন্দ দাশ।
তারমানে  বাংলার প্রকৃতিতে বসন্ত এসে গেছে। ‘পাগল হাওয়া’ বইছে। পাতারা ঝরছে। পাতারা উড়ছে। এসব হাওয়ার রাতে, পাতাদের উড়াওড়িকালে আমাদের মন কেমন করছে! এইতো  নবীন বসন্তের এক রাতে, আচমকা  ক’ফোঁটা বৃষ্টি ধুয়ে দিয়ে গেলো এ শহর। তাই ভোরবেলাটা কেমন শীত শীত।যদিও শীত চলে গেছে কোন দূর পরবাসে। মায়াটা এখনো রেখে গেছে; টের পাওয়া গেলো ভোরের বাতাসে।
একদিকে পাতারা ঝরে পড়ছে। সেইসঙ্গে ডালে ডালে দেখা দিচ্ছে নতুন পাতাদের অস্তিত্ব। সবুজ-প্রাণময়। সঙ্গে আছে আমের মুকুল। সেই মুকুলের কামুক গন্ধে বাতাস নিজেই পথ হারা। মৌমাছি উড়ে আসছে।
গাছে গাছে পাতা। পাতায় পাতায় আলোর নাচন। পাতায় পাতায় বৃষ্টিফোঁটা। বর্ষা, গ্রীষ্ম, শরৎ, হেমন্ত, শীত আর বসন্ত—সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা আর রাত একেক সময় পাতার একেক রূপ।
পাতার এই বাহার, রূপ যিনি খুব কাছ থেকে দেখেননি, তার কাছে পৃথিবীর অনেক সৌন্দর্যই অধরা থেকে যাবে।  শীত চলে যাওয়ার আগে আগে পাতারা গাছ থেকে ঝরে পড়ে টুপটাপ। উত্তরের বাতাসে সেই ঝরা পাতাগুলো পথের ধূলার সঙ্গে লুটোপুটি খেলা করে। উড়ে যায়, হেলেদুলে গড়িয়ে চলে, জীবনের শেষ অস্তিত্ব জানান দেয়। অথচ এই মরা পাতাদেরই আগের পর্বগুলো অনেক অনেক বর্ণময়।
কাঠবাদামের বড় বড় পাতারা ঝরে পড়ার আগে ভীষণ সুন্দর রক্তিম বর্ণ ধারণ করে। আর পুরো ন্যাড়া ডালে ডালে যখন সবুজ পাতারা গজিয়ে ওঠে তখন মনে হয় সবুজ বর্শার ফলা আকাশ ধরার জন্য বেরিয়ে আসছে মিছিল করে।
একেক সময় একেক রূপ কলা পাতার। সবুজে মোড়ানো কোমল লাঠি হয়ে কলা পাতাটি যখন বেরিয়ে আসে গাছের গহিন ভেতর থেকে তখন এক রূপ। লাঠির মতো করে পেঁচিয়ে থাকা পাতাটি যখন দিনে দিনে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে আসল রূপে, তখন এক মায়াময় মনকাড়া সবুজ রং তার। একটু বয়স হলে গাঢ় সবুজ। বাতাসে দোল খেতে খেতে সেই বিশাল পাতাটি এক সময় চিরে চিরে শত চিরল। তারপর একদিন হলুদ হতে হতে শুকিয়ে মরে যায় পাতাটি।
বড় তেঁতুল গাছে কোটি কোটি পাতা। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাতারা দিনমান নেচে বেড়ায় বাতাসের দোলায়। এই শহরের শিশু একাডেমি চত্বরে একটি প্রাচীন তেঁতুল গাছ আছে। শিশু একাডেমির নতুন দালানের দোতলা থেকে ওই গাছটার দিকে তাকালে, তেঁতুল পাতার ঘনত্বে দৃষ্টি গেলে মনে হয় সামনে এক গহীন অরণ্য বসে আছে চুপটি করে। সেই গাছে, পাতার ফাঁকে ফাঁকে টিয়ারা বসে। আর শীতে উড়ে আসে কত রঙের পাখি।
এই শহরে নাই, নাই করেও অনেক গাছ আছে এখনও।এখনো দাঁড়িয়ে আছে একটা রমনা পার্ক। সেই পার্কে অনেক অনেক গাছ। এই বসন্তে সেখানে পাতার নাচন দেখা যায়। গাছের তলায় ঝরাপাতারা গালিচা পেতে রাখে এখনো। এই পাতাদের রূপ দেখার দলও আছে। সুরের মানুষ, পণ্ডিত ওয়াহিদুল হক নগরের শিশুদের জন্য অন্যরকম একটি বিদ্যালয় গড়েছিলেন। নালন্দা নামে সেই পাঠশালায় শিশুরা প্রকৃতির পাঠ নেয় পাতার সঙ্গে, ফুলের সঙ্গে, পাখির সঙ্গে কথা বলে। মিতালি করে। এই বিদ্যালয়ের কচি প্রাণ মানুষগুলোকে শহরের উদ্যানে নিয়ে পাতা দেখানো হয়। গাছ চেনানো হয়।
আমিও নগরবাসী।
পাতাদের নিয়ে কথা উঠতেই মনে পড়ে যায় তরতাজা স্মৃতি। এক ফালগুনের দুপুরে ঝরাপাতা দেখতে আমরা ক’জন গিয়েছিলাম গাজীপুরের শালবনে। একহারা মেদহীন লম্বা লম্বা শাল গাছেরা দাঁড়িয়ে আছে। শীত তাদের একটু শ্রীহীন করে গেছে। গাছের তলায় পাতা জমে নরম কার্পেট তৈরি হয়েছে। বসন্তে রয়ে রয়ে এলোমেলো বাতাস বয়। সেই বাতাসে দিগ্বিদিক পাতারা ছুটে চলে দল বেঁধে।
ঢাকার উত্তরায় একতলা বাড়ি গড়ে বসবাস করতেন লেখক-সাংবাদিক আহমেদ হুমায়ূন। এখানেই তার জীবনাবসান হয়েছে। তার বড় ছেলে ইরাজ আহমেদও লেখক-সাংবাদিক। ছোট ছেলে আনন্দ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। একরাতে মৃত্যু এসে নিয়ে গেছে এই তরুণ-মেধাবী এবং ছাত্রপ্রিয় শিক্ষককে। তিনি চলে গেছেন অন্য পারাপারে। সেই বাড়িটি এখন বহুতল ভবন হয়েছে ডেভেলপারদের প্রযত্নে। তার আগে, একতলা বাড়ির ভেতর দরজার কাছে ছাদের নিচের খোলা জায়গায় একটা মানিপ্লান্ট গাছ ছিলো। সেই গাছের পাতায় প্রতি রাতে দুটো টুনটুনি বসে থাকতো ঠোঁটে ঠোঁট গুঁজে। পাতার ওপর এক অপার নির্ভার সংসার ছিল তাদের। আজ সেই পাখিজোড় কোথায়, কোনো মানিপ্লান্ট পাতায় বেঁধেছে রাত্রি-সংসার, জানি না। তবে খুব শীতের রাতে, বসন্তের হু-হু করে ছুটে চলা মাতাল হাওয়ায় পাখি দুটোর কথা খুব মনে পড়ে।
আমাদের স্কুল বেলায় ডুমুর পাতায় গড়া টুনটুনিদের বাসা দেখেছি। দেখেছি পাতায় পাতায় অবাক সব আলোর নাচন। শীতে গাছে গাছে পাতাদের এক রূপ। আবার বসন্তের শুরুতে অন্যরূপ। নবপত্রপল্লব ভরিয়ে দেয় সব ন্যাড়াগাছ। তখন পাতাদের রূপ আর রঙে নেচে ওঠে গাছের মন। নতুন গর্বে তারা প্রাণ পায় যেন। আবার বর্ষায়, বৃষ্টিধোয়া পাতাদের আরেক সৌন্দর্য।পাতাদের, গাছে গাছে পাতাদের আরেক রূপ, ঝরে পড়া রূপ আমি দেখেছি সাত-সুমুদ্দুর শত নদীর ওপার আমেরিকায়। দেখেছি শীত নামবার আগে গাছেদের প্রাণহীন কংকালসম শরীর। সেই শরীরে একসময় নবীন পাতাদের বাহার। সবুজে সবুজ। তারপর সেই পাতায় রংধরে। একেক গাছের পাতায় একেক রঙ।  হাডসন নদীর দু’পাড়ে পাতাদের এই রূপ আমি দেখেছি। দেখেছি তাদের ঝরে পড়াও।
পাতার শব্দ আছে, ভাষা আছে, পাতার ওপর শিশির পড়ার লাবণ্যময় শব্দ শুনেছিলেন কবি জীবনানন্দ দাশ, শুনেছেন  জগদীশ চন্দ্রবসু, এখনো এই শহরে, কলকাতায়, লন্ডনে, নিউ ইয়র্ক শহরে হয়তো  কেউ কেউ শোনেন আর কথা বলেন ঝরাপাতাদের সঙ্গে।

লেখক: গল্পকার
ছবিঃ ইরাজ আহমেদ , গুগল, লেখক।