টরন্টো আমার দ্বিতীয় ঘর

আন্জুমান রোজী

আন্জুমান রোজী

টরন্টো একটি মিশ্রজাতির শহর। পৃথিবীর প্রায় সব প্রান্ত থেকে আসা মানুষের বসবাস এই টরন্টো শহরে। বহু ভাষাভাষী আর সংস্কৃতির মিশ্রণে টরন্টো শহর নানা বৈচিত্র্য নিয়ে দিনরাতভর জেগে আছে। ভিন্ন সংস্কৃতির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এই শহর ঠিকই, তবে সব জাতির সঙ্গে সাম্য সৌহার্দ্যের এক চমৎকার সেতুবন্ধনও তৈরি হয়ে আছে। মানুষে মানুষে কোন ভেদাভেদ নেই। বলতে গেলে মানবতার চরম শিখরে অবস্থান করছে এই শহর। মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার নিশ্চয়তা দিয়েই সব মানুষের নাগরিক সুবিধা দেওয়ার সিস্টেমকে বেঁধে দেওয়া হয়েছে শক্ত আইন দিয়ে। প্রতিটি মানুষের জীবনব্যবস্থা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পর্যবেক্ষণ করারও নেটওয়ার্ক কাজ করছে এক অতন্দ্রপ্রহরীর মতো।15910420_10154901217374660_1741158163_n

একটি জাতির সার্বিক উন্নয়নে সব শ্রেণীর পেশাজীবী মানুষেরা যে কত বড় অবদান রাখে তা এই কানাডার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক চালিকা শক্তিই সাক্ষ্য-প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছে অবিরল। সব জাতি-ধর্ম বর্ণ মিলেমিশে একাকার হয়ে কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নের চাকা যেভাবে সচল রেখেছে, ঠিক সেভাবে দেশের প্রতিটি মানুষ সচল রেখেছে নিজ জীবন ব্যবস্থাকেও। এর মূল কারণ হলো সব পেশাজীবী মানুষকে সমান দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করা। এখানকার শিক্ষা ব্যবস্থাই এমন যে, নবজন্ম শিশু থেকে বয়োবৃদ্ধ পর্যন্ত সবাইকে একই কাতারে রেখে গুরুত্ব সহকারে সম্মান প্রদর্শন এবং মূল্যায়ন করা।unnamed-1

শহরের যেখানেই যাই , মনে হয় সব মানুষের মধ্যে একটি পারিবারিক বন্ধনের মতো আছি। কী বাসে, কী ট্রেনে, এমন কী পথচলায় চোখে চোখ পরতেই একটু করে হেসে দেওয়া, আরো একট কাছে এলেই গুড মর্নিং, গুড এভিনিং; আবার চোখের আড়াল হতেই হেভ এ গুড ডে বলে কিংবা রাতে গুড নাইট বলে বিদায় নেওয়া। এর জন্য পরিচিত অপরিচিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। মানুষে মানুষে ভালোবাসার হৃদ্যতার এক বিমূর্ত মেলবন্ধন এখানে। একজন মানুষের পরিচিতির জন্য শুধু ফাস্ট নেম আর লাস্ট নেম প্রয়োজন। আর কিছু জানার জন্য কোনো কৌতূহল কারোর মধ্যে নেই। মানুষের ব্যক্তিত্ব অর্থাৎ তার আচার আচরণ বলে দেয় তার মন-মানসিকতা এবং চিন্তা-চেতনার বিষয়। ধর্মীয় গোঁড়ামির কোনো বালাই নেই। যার যার ধর্ম তার তার কাছে, এই বিশ্বাসে কেউ কাউকে বিরক্ত করে না। নিরালা-নিভৃতে ধর্মচর্চা কেউ করছে, কেউ করছে না। আমাকে বাংলাদেশের একজন ফেইসবুকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল এই বলে যে, মানুষের সবচেয়ে বড় আইডেন্টিটি নাকি ধর্মীয় পরিচয়, নাহলে তার পরিচয় অস্তিত্বহীন হয়ে থাকবে। মনে মনে হেসে বলেছিলাম, আমিও মুসলমানের বাচ্চা, কিন্তু কখনও মনে হয়নি আমার মানুষসত্বার চেয়ে মুসলমানিত্ব অনেক বড়! ধর্ম মানুষকে শুদ্ধ করে হয়তো , কিন্তু মানুষসত্বার উপরে ধর্ম হতে পারে না। এই বিষয়টাই টরন্টো শহরে বেশ উপভোগ করি। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’, এই মর্মেই টরন্টো শহর যেন হেসে খেলে বেড়ায়। তাই সমগ্র কানাডা যেন আমার একটি ঘর।unnamed-6

সব ঋতুতে টরন্টো শহর নানাবর্ণে সাজতে থাকে। সেই সঙ্গে মানুষের মনও ঋতুবদলের মতো নতুন নতুন সাজে জেগে উঠে। কী গ্রীষ্ম, কী শীত, কী বসন্ত; সব ঋতুতে প্রকৃতির আগমন ঘটে নানা উৎসাহ, উদ্দীপনা নিয়ে। শীতের মরণ কামড়েও মানুষের উত্তেজনার কমতি নেই। তার কারণ, সারাদিনের কঠিন পরিশ্রম শেষে ক্লান্তি দূর করার জন্য একটু স্বস্তির ক্ষণ খুঁজে নেওয়া। ছকে বাঁধা এই জীবনে সব কিছু কেমন যেন নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলছে। অনেকে হয়তো বলবেন জীবন যদি নিয়মের ছকে বাঁধা হয়ে যায় তাহলে প্রকৃত জীবনের উপলব্ধি কেমন করে হবে! আমার প্রশ্ন হলো, তিনবেলা খাওয়া, থাকা আর চিকিৎসার নিশ্চয়তা যে জীবন দিতে পারেনা, সে জীবনেরই বা কী মূল্য আছে! পায়ের নীচে মাটি আর মাথার উপর আকাশ এই দুটোকে উপলব্ধি করার ক্ষমতা শুধু একজন স্বার্থক পরিশ্রমী মানুষের পক্ষেই সম্ভব। দিনশেষে ক্লান্তিতে শরীর এলিয়ে দিয়ে আকাশের দিকে দৃষ্টিপাত করলে তখন আকাশটাকে পরম আশ্রয় মনে হয়। বিশ বছরের টরন্টোর জীবনকে আমি এভাবেই পেয়ে এসেছি।unnamed-11

কানাডার সব জাতীয় উৎসবে মহা ধুমধামে আয়োজন চলতে থাকে। যার আনন্দের অংশীদার এই জনগণ। প্রতি বছরের মতো এবারেও নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার আয়োজন ছিল অবর্ণনীয় এবং কল্পনাতীত। আনন্দের ধারা চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। পুরো শহর উৎসবে পরিণত হয়েছিল। ক্রিসমাস সময়টাকে সব মানুষের জন্য সরকারিভাবে ঘোষণাকৃত হলিডে সিজন বলা হয়। এই হলিডে সিজন চলে ক্রিসমাস সময় থেকে নিউ ইয়ার পর্যন্ত। বলতে গেলে বছরের শেষে টানা দু’সপ্তাহ আনন্দ উৎসবে মেতে থাকে পুরো এই শহর। যেখানে আনন্দের ধারা বয়ে যায় সেখানে চুপটি মেরে পড়ে থাকাও অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তাই আমরা বাঙালিরাও জেগে উঠি তাদের সঙ্গে।unnamed-2

বসবাসের জন্য টরন্টো বিশ্বের সেরা শহর হিসেবেও স্বীকৃত। ব্রিটেনের খ্যাতনামা ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিন বিভিন্ন বিষয়ের উপর বিচার বিশ্লেষণ করে এই স্বীকৃতি দিয়েছে। নিরাপত্তা, গণতান্ত্রিক সূচক, পরিবেশ, খাদ্য নিরাপত্তার সূচকসহ আরো কয়েকটি বিষয়ের উপর জরীপ চালিয়ে ম্যাগাজিনটি সার্বিক বিচারে টরন্টোকে বিশ্বের সেরা শহরের স্বীকৃতি দেয়। কানাডার আরেক শহর মন্ট্রিয়ল স্বীকৃতি পায় বিশ্বের দ্বিতীয় সেরা শহর হিসেবে।unnamed-8

যদিও নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে আসা যেন নাড়ীছিড়ে চলে আসা। সেই হোমসিকনেস কাটিয়ে উঠার লক্ষ্যে কানাডা সরকার বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠির নিজনিজ শিল্প সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্যও অনুপ্রাণিত করে আসছে, যেন তারা তাদের মাতৃভূমিকে সব সময় উপলব্ধি করতে পারে। তাছাড়া বিশ্বায়নের যুগে ভিন্নভিন্ন শিল্প সংস্কৃতির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে কাজ করে যাওয়ারও একটা বিরল সুযোগ ঘটে এই কানাডায়। সেদিক থেকে আমি খুব গর্বিত। টরন্টো আমার গর্বের শহর এবং দ্বিতীয় ঘর।

ছবি: লেখক