টিনটিনের কাছে

ক্লাসের খাতায় আঁকিবুকি কাটতে কাটতে অথবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে জার্মান সৈনিকদের ছবি আঁকতে গিয়ে সেই কৈশোরেই ছবি আঁকার গভীর নেশা তৈরী হয়ে গিয়েছিলো। আর সেই নেশা থেকেই তার সঙ্গে দেখা হয়েছিলো কমিকসের অবিস্মরণীয় চরিত্র টিনটিনের। দেখাই বা হবে কেনো তিনিই তো টিনটিনের অমর স্রষ্টা, ব্রাসেলসের এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হয়ে ওঠা জর্জেস প্রসপার রেমি। তার সৃষ্ট টিনটিন চরিত্রটি ছবি আর গল্পে পাঠকদের কী পরিমাণ

নেশাচ্ছন্ন করে তুলতে পারে তার প্রমাণ পাওয়া যায় আরো কিছুদিন পরে। তখন সেই কিশোর পিতৃদত্ত নামের খোলস ফেলে সবার কাছে ‘হার্জ’ নামেই পরিচিত হয়ে উঠেছেন।

ছোটবেলা থেকেই একটু অন্যরকম ছিলেন রেমি। কোনো একটা কাজ বেশীদিন করতে ভালো লাগতো না তার। কিন্তু ছবি আঁকার নেশাটা কিন্তু বরাবর এঁটে ছিলো তার সঙ্গে। মাত্র ১২ বছর বয়সে ‘বয় স্কাউটে’ যোগ দেন। স্কাউট দলের হয়ে চলে যেতেন সামার ক্যাম্পে ইতালী, সুইৎজারল্যান্ড অথবা স্পেনে। সেখানেও ছবি আঁকা চলতো তার। আর সেখানেই তার আঁকা ছবিগুলো নজর কেড়েছিলো স্কাউটমাস্টার রেনে ওয়েনারবার্গের। বয় স্কাউটদের পত্রিকা অলঙ্করণের কাজ পেয়ে যান। তার আঁকা কার্টুন ছাপা হতে থাকে ম্যাগাজিনে। তখনই ছদ্মনামে ছবি আঁকার চিন্তাটা মাথায় আসে। নিজের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে ফরাসী উচ্চারণ অনুযায়ী বেছে নেন হার্জ নামটি।

১৯২৬ সালে প্রথম কমিক স্ট্রিপ আঁকলেন  হার্জ। নাম দিলেন ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ তঁতঁ’। দৃশ্যের তলায় ক্যাপশন ব্যবহারের গতানুগতিক নিয়ম বাদ দিয়ে প্রথম শুরু করলেন স্পিচ বাবলস ব্যবহার। এরপর ‘লিভিংটাইম সিয়েকলর’ নামে একটি পত্রিকায় কাজ করার সুযোগ পেয়ে যান হার্জ। কাজ দেখিয়ে নজর কাড়েন পত্রিকার কট্টর ফ্যাসিবাদী সম্পাদকের। তিনিই হার্জকে বাচ্চাদের ক্রোড়পত্রে কার্টুন আঁকার দায়িত্ব দেন।প্রিয় চরিত্র তঁতকে একটু অন্যভাবে সাজিয়ে নেন হার্জ। নিজের ছোট ভাই পলের চরিত্রের বৈশিষ্টে জন্ম হয় টিনটিনের। বেলজিয়ামের এক তরুণ অনুসন্ধানী সাংবাদিক। খবরের পেছনে ছুটে বেড়ানোই তার নেশা, সঙ্গে থাকে প্রিয় কুকুর ‘স্নোয়ি’।

হার্জ চেয়েছিলেন টিনটিনের যাত্রা শুরু হোক আমেরিকায় ঘটে যাওয়া কোনো অ্যাডভেঞ্চার দিয়ে। কিন্তু সম্পাদক আটকালেন। তার ইচ্ছায় টিনটিনের যাত্রা শুরু রুশ দেশ থেকে। প্রথম কার্টুন গল্প ‘টিনটিন ইন দ্য ল্যান্ড অফ সোভিয়েত’ প্রকাশিত হতে না হতেই জনপ্রিয়তার শীর্ষে। তারপর লেখা আর আঁকা হয়ে গেলো ‘টিনটিন ইন কঙ্গো, আমেরিকা।’ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে লাগলো টিনটিনের জনপ্রিয়তা। কিন্তু ১৯৩৮ সালের পর অনেকটা সময় ভালো কাটাননি হার্জ। বন্ধ হয়ে যায় তার সেই পত্রিকা। ১৯৪৪ সালে ব্রাসেলস জার্মান দখল মুক্ত হলে শুরু হয় বিশ্বাসঘাতক চিহ্নিত করার কাজ। আর তাতেই নাৎসী বাহিনীকে সাহায্য করার অভিযোগ ওঠে হার্জের বিরুদ্ধে। কাজের জন্য বিপুল জনপ্রিয়তা তার জীবন বাঁচায়। মৃত্যুদণ্ড থেকে রক্ষা পান তিনি। কিন্তু চাকরি আর পাননি। তারপর কয়েকজন মিলে শুরু করলেন ‘টিনটিন ম্যাগাজিন’। জনপ্রিয়তা মাত্র ৩ দিনেই নিঃশেষ করলো পত্রিকার ৬০ হাজার কপি। কাজের ছাপে তিনি ‘স্টুডিও হার্জ’ খুলতে বাধ্য হন।

এতো জনপ্রিয়তা থাকার পরেও হার্জকে কিন্তু টিনটিন ম্যাগাজিন থেকে পদত্যাগ করতে হয়। পেছনের কারণ ছিলো প্রেম। ফ্যানি ভ্ল্যামিংকেল নামে এক মহিলার সঙ্গে প্রেমে পড়েন বিবাহিত হার্জ।তখন ‘টিনটিন অন দ্য মুন’ সিরিজের কাজ অসমাপ্ত রেখেই একদিন লাপাত্তা হয়ে যান তিনি। পরে হঠাৎ আবার ফিরে এলেও পার্টনাররা তাকে আর গ্রহণ করেনি। তারপরেও বেশ কিছুদিন এদিক সেদিক করে হার্জ আবার প্রকাশ করেন ‘দ্য ক্যালকুলাস অ্যাফেয়ার’ ও ‘রেড সি শার্ক’-এর মতো বিখ্যাত টিনটিন সিরিজ।

বেশ জটিল ধরণের বোনম্যারো ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে হার্জ যখন মৃত্যুশয্যায় তখ খবর পেয়েছিলেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক স্টিফের স্পিলবার্গ তার টিনটিন নিয়ে সিনেমা নির্মাণে আগ্রহী।

১৯৮৩ সালের ৩ মার্চ পৃথিবী থেকে বিদায় নেন হার্জ। বেলজিয়ামে তাঁর নামে ‘হার্জ জাদুঘরও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এক টিনটিন চরিত্র দিয়েই গোটা পৃথিবীর নানা ভাষার ছোটবড় পাঠকদের মোহাবিষ্ট করতে পেরেছিলেন তিনি।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ এই সময়
ছবিঃ গুগল