টুকটাক কথা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

তানযীম চারু

আমার বাবা ছিলেন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। ছোটবেলায় জাহাজে জাহাজে অনেক ঘুরেছি। অতলান্তিক দেখিনি কখনও, কিন্তু ভারত আর প্রশান্ত মহাসাগরের সিংহভাগ দেখা মোটামুটি শেষ। সেই থেকে সারাজীবনের স্বপ্নসাধ – মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হবো, দেশে দেশে ঘুরে বেড়াব।

কলেজের ফার্স্ট ইয়ার। বাবা গিনি ইকুইটোরিয়ালে। স্যালভেজের কাজ। চরম নিউমোনিয়া হলো, ঢাকা চলে এলেন। ৬ দিনের মাথায় চুপ করে মারা গেলেন। আমার শিশুকালের মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হবার স্বপ্নটাকেও সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন। সময় এলো ডাক্তার হবার।

আমার ৩৮ বছর বয়সী মা – তাঁর ১ কিশোরী মেয়ে, ২ বালিকা মেয়ে আর ৫ মাসের ল্যাদল্যাদা ১ শিশু মেয়েকে নিয়ে অন্য এক ধরনের সাগরে পড়লেন। আর আমি পড়লাম হরমোনের সাগরে। সারাজীবন মাথা নিচু করে মা’র কথা এককান দিয়ে ঢুকিয়ে অন্যকান দিয়ে বের করতাম। এবার শুরু করলাম মুখে মুখে কথা বলা। ১৮ হবার আগেই আমার বিয়ে, তারপর এইচ এস সি পাশ, তারপর চুপটি করে বরের হাত ধরে জার্মানি আসা। ডাক্তার হতে হবে।

চাইল্ডহুড ফিক্সেশন কিনা জানি না, এক জায়গায় বেশিদিন থাকলে মন খুব ছটফট করতো। বর থাকতেন এক শহরে, আর আমি মেডিকেলের চান্স পেলাম অন্য শহরে। মানুষটা ছিলাম অনেক ছোট। জিদ আর ইগো ছিলো সমানুপাতিকভাবে সেরকম বড়। ডিভোর্সটা হয়েই গেলো। শুরু হলো একা একা ভিনদেশের ভিন্ন একটা সাগরপাড়ি। বয়স তখন ১৮।

সবই ঠিক ছিলো। কিন্তু আজ বুঝি, খুব অসুখী ছিলাম। বিষণ্ণ ছিলাম। ২০০৬ সাল, সামনে ফিজিকুম পরীক্ষা। (অ)মূর্তিমান বিভীষিকা একটা। ডিসেম্বরের এক শনিবার ভোরে হঠাৎ ঘুম ভাঙল হাসপাতালের ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটে। ডান পা নাড়াতে পারি না। L1 টা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে মেরুরজ্জুটাকে জাপটে ধরে রেখেছে। ডাক্তাররা আশা দিলেন, একদিন হয়ত আবার হাঁটতে চলতে পারবো, সেই সঙ্গে পইপই করে বলে দিলেন, এক্সট্রিম স্পোর্টস ট্যাবু, বাচ্চা নিলে আরও ১০ বছর পর। বয়স তখন ২১।

২০০৭ সাল। ৩ মাস হাঁটতে পারি না। ৬ মাস প্রস্রাব বন্ধ। কী যে কষ্ট, কী যে কষ্ট! আর সেই কষ্ট ভুলে থাকার কত যে অসম্ভব অসম্ভব প্রচেষ্টা। অবশেষে অতলান্তিক মহাসাগরের দেখা মিললো। একমাত্র জন্ম জন্মান্তরের বন্ধু পিংকিটাই কাছে ছিলো।

ডাক্তারি পড়াটা আর হলো না। মন শুধু ছটফট করে। নতুন করে শুরু করলাম সব। প্রেমে পড়লাম। বিয়ে করলাম। নাইলা এলো ২০১০ এ। জার্মান বর আর শ্বশুরের সঙ্গে শুরু করলাম মাউন্ট ক্লাইম্বিংয়ের ট্রেনিং। শুরু হলো স্কিইংয়ে হাতে খড়ি। এক্সট্রিম স্পোর্টস কত প্রকার ও কী কী – আমার জানতে হবে। L1 টা মাঝে মাঝেই তার অনুপস্হিতি জানান দিয়ে যায়। কিন্তু মনটা চুপ করে মুচকি হাসে।

ব্যাচেলর শেষ করলাম। মন আবার ছটফট করে। মাস্টার্সে অ্যাপ্লাই না করে DAAD এর স্কলারশীপের অ্যাপ্লাই করলাম। ৬ মাসের অ্যাকাডেমিক এক্সচেঞ্জে আই আই টি মাদ্রাজে যাবো। যাবই যাবো। সেমিস্টারের শেষে একা একা ইন্ডিয়ায় ব্যাকপ্যাকিং করবো। মেয়েবেলার মেরিন ইঞ্জিনিয়ারটা সেই কবে মরে গেছে, কিন্তু যাযাবরটা কীভাবে কীভাবে যেন বেঁচে গিয়েছিলো। চেন্নাই থেকে শুরু করে মাদুরাই, কন্যাকুমারী, ভারকাল্লা, কোল্লাম, কোটায়্যাম, অ্যালেপ্পেই, কোচী, গোয়া, অজন্তা-ইলোরা, আহমেদাবাদ, কচ্ছের রান, জয়পুর, আগ্রা, দিল্লি, অমৃতসর, শিমলা, কুল্লু… সব চষে বেড়ালাম ১ মাস। ইন্ডিয়ান রেইলওয়ের স্লিপার ক্লাস, লোকাল ট্রেন, বাস – একগাদা ভারতীয়র ভিড়ে আমি একা। একটা ব্যাকপ্যাক আর একটা স্লিপিং ব্যাগ। এরপর ভিড়ে গেলাম একদল ট্রেকারদের সঙ্গে। কুল্লু থেকে ১০ দিন ট্রেকিং করে সাওরকুন্ডি পাস ধরে মানালি। L1 টা মাঝে মাঝেই তার অনুপস্হিতি জানান দিয়ে যায়। কিন্তু মনটা চুপ করে মুচকি হাসে।

৬ মাস পর ফিরে এলাম। আমার জার্মান বর তখন আমার জার্মান সবচেয়ে কাছের বান্ধবীর সঙ্গে সহবাস করছেন। লাথি মেরে চলে এলাম। আমাদের ডিভোর্সের আগেই ওদের একটা মেয়েও হয়ে গেলো। লাভের মধ্যে আমার মেয়েটা একটা বোনও পেয়ে গেলো। আমার আর প্রেসার নাই! নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম, কী চাও তুমি জীবনে? মনটা শুধু ছটফট করে। আমি যদি জানতাম যে ইন্ডিয়া যাবার মূল্য আমাকে এভাবে দিতে হবে, আমি তারপরেও তাই করতাম। যার চলে যাবার কথা, সে আজ হোক কাল হোক – চলে যাবে। কিন্তু আমার ৬ মাসের সেই অদ্ভুত অমূল্য যাযাবর জীবন – সেটা আমার কাছে আজীবন রয়ে যাবে। আবার বেড়িয়ে পরি রাস্তায়। গন্তব্য বাল্টিক সাগর। ক্যাম্পিং আর কাইট সার্ফিং। L1 টা মাঝে মাঝেই তার অনুপস্হিতি জানান দিয়ে যায়। কিন্তু মনটা চুপ করে মুচকি হাসে।

মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হতে পারিনি, সো হোয়াট? ডেটা ইঞ্জিনিয়ার হয়েছি। মেডিকেলও পড়তে পারি নি, সো হোয়াট? বায়োইনফর্মেটিক্স পড়েছি। অসীম সুখে সুখী নই, সো হোয়াট? শান্তিতে আছি। চাকরী আছে, কিন্তু কোন সেভিংস নাই। বেয়াদ্দপ বেহায়ার হদ্দ যাযাবরটা শুধু শুধু পকেট খালি করে ফেলে… আমস্টারডাম যাওয়া পর্যন্ত বাজেট, তারপরেও সে চলে যায় ব্রাসেলসে। তারপর ১ দিন না খেয়ে থাকে। সো হোয়াট? টিনটিনের দেশ তার দেখতেই হবে। প্রাগ পর্যন্ত প্ল্যান, কিন্তু ঘুরতে ঘুরতে চলে যায় ব্রাতিস্লাভা। প্যারা গ্লাইডিং, বানজি জাম্পিং কী করে নাই সে? L1 টা কিন্তু মাঝে মাঝেই তার অনুপস্হিতি জানান দিয়ে যায়। অথচ মনটা চুপ করে মুচকি হাসে।

আমাদের ওয়াজফিয়া নাজরীন নাকি বলেছেন, “পাহাড়ে উঠার চেয়ে ঢাকার রাস্তায় একটা মেয়ের হাঁটা আরও বেশি কষ্টের”।

ঢাকার রাস্তাটা যদি আজ ঐসব সেক্সুয়ালি ফ্রাস্টেটেড পুংলিঙ্গদের বাবার সম্পত্তি হয়ে থাকে, তো তারা নিয়ে যাক সেই রাস্তাটাকে। এরা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে জাপটে ধরে রেখেছে আমাদের মেরুরজ্জুটাকে। কিন্তু আমরা উঠবো পাহাড়ে, পাড়ি দেবো সাগর মহাসাগর। এক ডাইভ দিয়ে দেখে আসবো অতলান্তিকের তলাটাকে। এভারেস্টের চূড়া না হোক, বেইস ক্যাম্প পর্যন্ত হলেও যাবো… তারপর লুকলা থেকে চড়ে বসব কাঠমন্ডুর প্লেনে। ৮০ দিনে ঘুরে আসব পুরো বিশ্বটাকে।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]