টুকরো টুকরো স্মৃতিতে বাবা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সুলতানা শিরীন সাজি

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

আব্বার শার্ট,গেঞ্জি পড়তাম আমি সুযোগ পেলেই। আব্বা সকালে বাসা থেকে বের হলে আলনা বিছানা,আলনা গুছাতাম যখন,আব্বার পড়নের গেঞ্জি বা সোয়েটার (শীতকালে) পড়ে ঘুরতাম। আব্বার গায়ের গন্ধ মেখে ঘুরতে আমার ভালো লাগতো।

ভাইজানের সঙ্গে

যখন কলেজ পড়তে ঢাকায় চলে এলাম, আব্বার একটা গেঞ্জি লুকিয়ে নিয়ে যেতাম আমার স্যুটকেস এ। আব্বার সাদা সাদা গেঞ্জিগুলো অসংখ্য ফুটো হয়ে যেতো আর আব্বা কিছুতেই ফেলে না দিয়ে তা পড়ে বেড়াতেন। বুকে ,পিঠে এমন অসংখ্য হতে থাকতো যখন,আমি বড় করে ছিড়ে দিতাম একসময়ে।
আব্বার স্পঞ্জের স্যান্ডেল এর ফিতা ছিড়ে গেলে ফিতা বদলে পড়তেন। এখনো দোকানে গেলে তাকিয়ে কত সান্ডেল দেখি। স্পঞ্জের স্যান্ডেল এর ফিতা বদলে কি পড়ে কেউ? আব্বার স্যান্ডেল পড়ে ঘুরতেও আমার ভালো লাগতো।

আমাদের বাসায় ইলেক্ট্রিক ইস্ত্রি আসার আগে একটা ইস্ত্রি ছিলো যার ভিতর কয়লা দিয়ে গরম করতে হতো। আমি অনেক ছোটবেলাতেই তা দিয়ে কাপড় ইস্ত্রি করতাম। ভাইজান তখন ঢাকা মেডিকেলো পড়তো। আপু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আপা রংপুরের নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। ভাইজান চিঠি লিখতো আমাকে। চিঠি ভরা ছিলো,আব্বার কাপড়ের যেনো খেয়াল রাখি, জুতা পরিষ্কার থাকে। জুতা কালি করা থাকে। আরো কতকি! আমি সেই ছোটবেলা থেকেই চেষ্টা করতাম,সব পালন করতে। খুব বেশি কিছু তো ছিলোনা তখন আমাদের। আব্বার কয়েকজোড়া প্যান্টশার্ট ইস্ত্রি করে হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখতাম। এখনো কাপড় ইস্ত্রি করতে গেলে কিছু কিছু কাপড় থেকে কেমন চেনা গন্ধ ভেসে আসে।স্মৃতি উথলে আসে।
কোথায় নাই স্মৃতি?
আব্বা চাইতেন শুধু পড়ালেখা করি। আব্বা বাসা থেকেই বাইরে গেলেই মাকে ঘিরে বসে গল্প হতো। আব্বার মটর সাইকেলের আওয়াজ পেলেই আমি পড়ার টেবিলে,মা নিজের কাজে। আপুও পড়তে বসে যেতো। অন্য ঘরে চলমান ফ্যান বন্ধ করা হতো খাটের স্ট্যান্ড দিয়ে। আব্বা অযথাই লাইট জ্বালিয়ে রাখা,ফ্যান চালানো পছন্দ করতেন না। ঘরে ঢুকে আব্বা চারিদিকে তাকিয়ে দেখতেন সিনেমার মত সব ঠিকঠাক। হয়তো সবই বুঝতেন,তবু এটাই উপভোগ করতেন। আব্বার এই বাঘ বাঘ আচরণই ভালো লাগতো আমার। যদিও মাথায় তেল মাখতে গিয়ে,হাত পা মালিশ করতে গিয়ে আমি আব্বার বাঘের বাচ্চাই হয়ে যেতাম।কোলের কাছে ঘুমিয়ে পড়তাম। সেইসব দিন খুব কম সময়ের। আমি তখন স্কুল ছেড়ে কলেজ। পকেট থেকে টাকা বের করে সিগারেট এনে দিতে আর বলতেন না আব্বা। সিগারেট কিনতে গেলেই নিজের পছন্দের বিস্কুট কিনে আনতাম আমি।

যখন কলেজ হোস্টেলে ,ইউনিভার্সিটির হলে ছিলাম ,আব্বা টাকা দিতেন হিসাব করে।অথচ বই কিনতে চাইলে খুশি হয়ে টাকা দিতেন। মনে তো পড়েনা কোনদিন কিছু চেয়ে পাইনি। সব দিতেন,কিন্তু চাইতেন,যেনো হিসেবী হই। ভালো হই। ভালো মানুষ হই। নিজের ছোটবেলার কত গল্প করতেন আব্বা। কত কষ্ট করে লেখা পড়া করেছিলেন। হ্যারিকেনের একটা চিমনী কত বছর চলেছে এমন আরো কত গল্প। কত ভালোবাসা,কত আদর ভরা সেইসব দিন,আর ফিরে আসবেনা বলেই এত টানে!

ছেলেদের সঙ্গে সাজি

আব্বা খেতে খুব ভালোবাসতেন। মা সামনে বসে তুলে দিতেন আর আব্বা খেতেন। এ এক অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য! আব্বা মাছ বেছে খেতে পারতেন না।মা বেছে দিতেন। মাছের মাথা খেতাম আমি আর আব্বা দু’জনে। একবার খেতে বসে আব্বার অপেক্ষা করছি ,আব্বার আসতে অনেক দেরী হলো। আমি খেতে বসে পুরো মাথাটা খেয়ে ফেলেছিলাম। আব্বা দুষ্টুমী করে বলেছিলেন,তোমার বাসায় গেলে মাথা খেতে দিও। এখনো মাছের মাথা খেলে আব্বাকে মনে পড়ে।মনেহয় আবার যদি সব আগের মত হতো!

নিজে ডাক্তার হলেও ইঞ্জেকশন দেয়াই ভীষন ভয় পেতেন আব্বা। কয়েকজন ধরতে হতো আব্বাকে। অথচ নিজে যখন অন্যকে ইঞ্জেকশন দিতেন,ভুলিয়ে ভালিয়ে গল্প বলে ,বাচ্চারা তো টেরই পেতোনা। মায়ের কাছে শুনেছি,কিছু মানুষ ছিলো,আব্বা না দেখলে, ঔষধ না দিলে তাদের নাকি অসুখই ভালো হতোনা!

আব্বার বাইরের কঠিন আবরনের ভিতর,অদ্ভুত এক শিশুর সরলতা ছিলো। এত কাঁদতে পারতেন। আব্বার চোখ উপছে পড়া সেই কান্না আমি আজো দেখতে পাই। আমার বিয়ের পর চলে এসেছিলাম যখন আর দেশ ছেড়ে চলে আসার দিন এয়ারপোর্টে। বুঝতে পেরেছিলেন কি,আর দেখা হবেনা?
আব্বার চোখের পানি এখন আমার চোখে!

আমার রাশীক,রাইয়ানের দিকে তাকাই। ওদের কারো চোখ ,কারো ঠোঁট,কারো হাতের ,মুখের দিকে তাকালে আব্বার মত লাগে। কখনো কখনো ভাইজানের মত এমনকি বোনদের মতো ও লাগে। রাশীক হাঁচি দিলে আব্বাকে মনে পড়ে।
ওদের জড়িয়ে থাকি। ওদের জড়িয়ে বাঁচি। আব্বা আব্বা বলে ওদেরই ডাকি। আব্বার আদরের আমি ওদের আদরেই বাঁচি আর কিযে ভালোলাগে এই বেঁচে থাকা।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]