টুকরো টুকরো স্মৃতির মন্তাজে

অঞ্জন রায়

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

মাঝরাতের পার্কস্ট্রীটে একদল উজ্জল তরুন আমাদের ছেঁকে ধরে। হাতে কয়েকটি ইংরেজী বই- আমরা কিনে ফেলি। নিতান্তই অদরকারী ওজন- কারন আমাদের নিয়মিত পাঠ্য বা ভাবনার সঙ্গে না মেলা বই, অন্তত আমার কাছে ওজনই। আমরা হাঁটি- হাঁটতে হাঁটতে পেরিয়ে যাই মূল্যারোজ। সেখানে গত শতকে শেফালী ছিলেন। মিলন পাঠানের দেয়া- সন্ধ্যারাতের শেফালী। আমরা হাঁটছি। মাথার মধ্যে বিনয় মজুমদার আর রবীন্দ্রনাথ। ফিরে এসো চাকা- বনমোদিত ফুলবাসে। আমরা হাঁটছি- হাঁটছে মন খারাপের গাড়ী। হাঁটছে জয়নুলের ব্রহ্মপূত্র পাড়ের সেই লোকটা- মাহবুবুল হক শাকিল। এমনই ছিলো সেবারে আমাদের শহর কোলকাতা সফর। বই মেলাতে আমরা দুজন সাথে জয় চ্যটার্জি। কলেজ স্ট্রীটে বইয়ের স্তুপ তিনজনের হাতে। হঠাৎ থমকে যায় সবার গতি। পথের পাশে নকশাল আন্দোলনে নিহত শহীদের রঙজ্বলা স্তম্ভ। আমরা পড়ি। আবারও হাঁটতে থাকি।

এভাবেই হাঁটতে হাঁটতে আমরা খুঁজে নিয়েছি গিরিশ ঘোষের বাড়ী। চৌরঙ্গী লেনের সাইনবোর্ড দেখে খুঁজেছি ৩৬ নম্বর বাড়ী- সেখানে আছেন অপর্ণা সেনের একলা মেমসাহেব। কথা ছিলো দুজনে যাব চন্দননগর- সেখানে আমাদের বন্ধু এন্টনী কবিয়ালের বসতি। কথা ছিলো কোন একবার চলে যাব ফ্রাঙ্কফুর্ট বা অন্য কোথাও। না। হয়নি কিছুই, মন খারাপের গাড়ী থেমে গিয়েছে সহসা।

দুই বছর। অথচ এখনো মাঝরাত পেরোনোর পর মনে হয় হঠাৎ বেজে উঠবে ফোন- ভরাট দৃঢ কন্ঠস্বর শুনবো আবারও, শুনবো কোন সদ্য লেখা পদ্য। অথবা ভর দুপুরে শুনবো- দাদা, তুমি কই? চলে এসো। না। কখনোই আর হবে না জানি সেই স্বর শোনা। আদৃতা জয়িতার কোন জন্মদিনে- ‘আমার আম্মা কাছে আয়’ বলার লোকটা নাই। নাই সেটা সত্যি। সত্যি বলেই বলছি এমন একটা মানুষ আমরা হারিয়েছি- যে আমাদের জন্য, একটা অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রর জন্য খুবই জরুরী ছিলো। প্রয়ানের পর থেকে এই কথাই বার বার ভেবেছি। কোনও আবেগে না, বাস্তবতায় ভেবেই বলছি-যখন হাইব্রীড রাজনীতির তোড়জোর, যখন পার্টিবয়রা হয়ে ওঠে ফ্যাক্টর। যখন রাজনীতি করলে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। তখন একজন মাহবুবুল হক শাকিল ক্রমেই আরো জরুরী হয়ে ওঠেন।

তিনটে পদ্য আর একটা গদ্যের বই। মোটেই সংখ্যাতে বেশি না- কিন্তু এতেই দাগ কাটার জন্য শক্তিমান কলম লাগে। সেই কলমের মালিক চলে গিয়েছেন। তবু এখনো বিষন্ন বিনয় মজুমদার আছেন, আছে ব্রহ্মপূত্রের ঢেউ, আছেন তার স্বপ্ন আর সাহসের কতিপয় সাথীরা। তারা কখনোই ভুলতে পারবেন না সেই মানুষটাকে, মানুষটি তাদের সঙ্গেই থাকবেন- থাকবেন প্রতিদিনের হাসি রাগ অভিমান আর মাঠের লড়াইয়ে।

হ্যাঁ, সেই মানুষটিই মাহবুবুল হক শাকিল- যার সঙ্গে আমার স্মৃতিগুলো বাকী আমার বেঁচে থাকা জীবনে কখনো ভুলবো না। ভুলবো না বলেই এই মধ্যরাতে অক্ষরগুলো কান্নায় ঝাপসা হয়ে আসে- টুকরো টুকরো স্মৃতির মন্তাজের মধ্যে ঢুবে যেতে থাকি।