টেকনাফ ওয়াইল্ডলাইফ স্যাঙ্কচুয়ারি …

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সালমা রহমান শুভ্রা

এই খাড়া পাহাড়শ্রেণী এইচবিও’র মুভি কিংবা ডিসকভারি চ্যানেলে দেখা কোনো এ্যাডভেঞ্চার সিরিজের দৃশ্য না। এটা বাংলাদেশ। মেরিন ড্রাইভ আর উখিয়া-টেকনাফ রোড থেকে শীত ও বর্ষকালে দেখা টেকনাফ ওয়াইল্ডলাইফ স্যাঙ্কচুয়ারি বা টেকনাফ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য।

মেরিন ড্রাইভ রোডে গেলে আমরা সাধারণত কেবল সাগর দেখতেই ব্যস্ত থাকি। অথচ ঠিক উল্টোদিকেই এই পাহাড়শ্রেণীর অবস্থান। সর্বোচ্চ উচ্চতা ৭০০ মিটার বা প্রায় ৩০০০ ফুট, দৈর্ঘ্য উত্তর-দক্ষিণে ২৮ কিমি, প্রস্থ পূর্ব-পশ্চিমে ৩ থেকে ৫ কিমি।

আয়তনের দিক থেকে এটি দেশের তৃতীয় বৃহত্তম বনাঞ্চল। টেকনাফের নতুন জেটিঘাট থেকে দূরের পাহাড়চূড়াগুলো দেখলে মনে হবে ত্রিকোণাকৃতির কয়েকটি ফানেল পরপর উল্টো করে বসিয়ে রাখা হয়েছে!

এখানে আছে নেটং পাহাড়, দেশের একমাত্র বালু-মাটির গুহা কুদুম গুহা, কুঠি পাহাড় আর ১,০০০ ফুট উচ্চতার টৈংগা/ তৈঙ্গা চূড়া। আছে বেশ কয়েকটা সংকীর্ণ উপত্যকা আর গিরিখাত। পাহাড়ের উপর থেকে একসঙ্গে  বঙ্গোপসাগর এবং নাফ নদী ও মায়ানমার সীমান্ত দেখা বিরল এক সুযোগও বটে! আরও একটা আকর্ষণ হলো বর্ষাকালে পাহাড় বেয়ে নেমে আসা ছোট-বড় বেশ কিছু ঝিরি-ঝর্ণা। তবে অন্য ঋতুতে এসব ঝর্ণা দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কম।

বাংলাদেশে হাতেগোনা যে ক’টা জায়গায় বন্যহাতির দেখা মেলে তার মধ্যে অন্যতম টেকনাফ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। বিশ্বখ্যাত বন্য এশীয় হাতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আদেশ, ১৯৭৩ এর বিধান মতে টেকনাফ রেঞ্জের- ১৪,৯৩৯ একর , হোয়াইক্যং রেঞ্জে- ৬,৪৪৭ একর ও শীলখালী রেঞ্জে- ৭৩০২ একরসহ মোট ২৮,৬৮৮ একর বা প্রায় ১১,৬১০ হেক্টর বনভূমি নিয়ে সংরক্ষিত বনাঞ্চল  ও টেকনাফ গেম রিজার্ভ (এলিফ্যান্ট) গঠন করা হয়।

বন্যহাতি সংরক্ষণে ইউএসএআইডি’র অর্থ সহায়তা আসে ১৯৮৩ সালে। তবে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে ২০১০ সালের ২৪ মার্চে। কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী এখানে ৫৩৬ প্রজাতির উদ্ভিদ এবং ৬১৩ প্রজাতির প্রাণী রয়েছে।

মাঝে সংরক্ষিত বনাঞ্চলটি দু’টো অংশে বিভক্ত করা হয়েছিলো- টেকনাফ গেম রিজার্ভ আর টেকনাফ ওয়াইল্ডলাইফ স্যাঙ্কচুয়ারি। পরে আবারও একীভূত করে একটাই নাম রাখা হয়েছে- টেকনাফ ওয়াইল্ডলাইফ স্যাঙ্কচুয়ারি বা টেকনাফ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য।

দু’টো জায়গাই ট্রেক করছি ২০০৯-এর জানুয়ারিতে। ছিলাম নাফ নদীর ধারে লবণের ক্ষেতের মাঝে ইউএসএআইডি’র অর্থে তৈরি নিসর্গ কটেজে। সামনে এই পাহাড়শ্রেণী আর পেছনে নীল-রঙা নাফ নদী…

প্রথমদিন ট্রেকিং করেছিলাম উখিয়া থেকে টেকনাফ যাবার পথে হ্নীলা বাজার হয়ে টেকনাফ গেম রিজার্ভ। সঙ্গে বনবিভাগের দেয়া গাইডসহ আমরা চার জন।

পথে চোখে পড়েছিলো আদিবাসী পাড়া। ন্যাড়া পাহাড়বেয়ে টিকে থাকা শেষ বড় গাছগুলোও কেটে ফেলা হয়েছে দেখলাম। আদিবাসীদের মতো বাঙালি বাচ্চারাও লাকড়ি হাতে তরতরিয়ে পাহাড়বেয়ে নামছে দেখে ভয়ই পেলাম! গাইড জানালেন, গাছচোরদের সঙ্গে তাদের নাকি এখানে রাতের বেলা গুলিবিনিময় হয় প্রায়ই!

শীতে শুকিয়ে ঝুরঝুরে হয়ে যাওয়া ঢালু পথে হাঁটতে গিয়ে একবার পা পিছলে বেশ কয়েক ফুট নিচে পড়েও গেছিলাম। গাছের শেকড় ধরে টাল সামলানোর পর বাকিরা টেনে তুলে আনলো। একটু পর আবারও দুর্ঘটনা! প্রায় খাড়া নেমে যাওয়া পাহাড়ের মাঝে ফাটল ধরেছে। জায়গাটা পেরুতে গিয়ে হাত ফসকে নিচে পড়ে যাচ্ছিলাম। অন্যরা সময়মতো ধরে ফেলায় অনেকটা নিচে পড়ে হাড় ভাঙা থেকে বেঁচে গেলাম!

গাইড দু’টো বিশেষ জায়গায় নিয়ে গেলেন। প্রাকৃতিক সম্পদের খোঁজে এক জায়গায় নাকি পাকিস্তান আমলে ব্রিটিশরা ডিনামাইট ফুটিয়ে পরীক্ষা করেছে। ফলাফল তার জানা নেই। আরেকটা জায়গায় দেখলাম ছাদের মতো ছায়া তৈরি করেছে ঝুলন্ত পাহাড়! ওখানে বেশকিছুটা সময় বিশ্রাম নিয়ে ফিরতি পথ ধরলাম।

টেকনাফ গেম রিজার্ভ এখন নাই হয়ে গেছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কারণে। বনভূমি জবরদখল আর অবৈধভাবে গাছ কাটা রুখতে ২০০৪ সালে এখানে  সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি তৈরি করা হয়েছিলো। এরা সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে বনজ সম্পদ রক্ষা ও সংরক্ষিত বনের জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। বন পাহারা দলও গঠন করেছিলেন।

স্বীকৃতিস্বরূপ খুরশীদা বেগমের নেতৃত্বাধীন টেকনাফ সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি ২০১০ সালে ওয়াঙ্গেরী মাথেই পুরস্কার পায়। প্রথম আফ্রিকান নারী হিসেবে ২০০৪ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া কেনিয়ার পরিবেশবাদী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ওয়াঙ্গেরী মাথেইয়ের নামানুসারে এই পুরস্কারের প্রচলন শুরু হয়। তবে সামাজিক বনায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত টেকনাফের সেসব বাঙালি-আদিবাসীরা এখন কোথায়, কী অবস্থায় আছেন, জানতে পারি নি…

যাকগে, পরদিন গেলাম টেকনাফের ঢোকার আগে ওয়াইল্ডলাইফ স্যাঙ্কচুয়ারিতে। সেদিন সঙ্গে যোগ হয়েছিলেন চট্টগ্রাম থেকে আসা আরও দু’জন। এদের একজনের আবার হাতভাঙা, ব্যান্ডেজ বাধা! সকালে চলে গেলাম টেকনাফের দিকে। ঘন বনের ভেতরে অনেকটা দূর পর্যন্ত পায়েহাঁটা পথ। হাতির দলের পিছেই ছিলাম ঘটনাচক্রে। টের পেলাম তাজা বর্জ্য দেখার পর! গাইড বারবার সাবধান করছিলেন যাতে বেশি আওয়াজ না করি। হাতির সামনে পড়লে বাঁচার আশা কম!

হাতি খেদানোর জন্য তৈরি ওয়াচ টাওয়ার থেকে নামার সময় মইয়ের ওপরের দিকে থাকা কার হাতে লেগে বড় একটা পাথরের টুকরো মাথায় এসে পড়লো। কিছুক্ষণের জন্য ব্যথায় অস্থির হয়ে গেলেও সামলে নিলাম। নিরাপত্তার কথা ভেবে আর বেশি দূর এগুলাম না। পাহাড় ধরে নেমে এলাম নিচের পাথুরে ঝিরিতে। ছোট সাইজের পাথর। তবে পা পিছলে যাবার ভয়ে সাবধানে হাঁটতে হচ্ছিলো।

সেই অভয়ারণ্যে আবার গেছি ২০১৮-এর ফেব্রুয়ারির শেষে। ট্রেকিঙের জন্য নয়, পিকনিক করতে। বনে ঢোকার মুখে এখন একটা রোহিঙ্গা ক্যাম্প। কয়েক হাজার শরণার্থীর বাস সেখানে। সেদিন নানান বয়সী অসংখ্য বাচ্চা কৌতুহলী হয়ে আমাদের পিছু নিয়েছিলো। এখন কি অবস্থা, জানি না… তবে বনে ঢোকার মুখে সেনাবাহিনীরও একটা ক্যাম্প থাকায় হয়তো ভেতরে ঢোকার সুযোগ পায় নি আশ্রয়প্রার্থীরা।

ঘনবসতির কারণে কটেজটা আর খু্ঁজেও পাই নি! সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নাফ নদীর পানির রঙও বদলে কেমন ঘোলাটে হয়েছে!

যারা ইকোট্যুরিজম কিংবা পাহাড়ে-জঙ্গলে ট্রেকিং-হাইকিং-ক্যাম্পিং করতে পছন্দ করেন, তাদের জন্য তুলনামূলকভাবে নতুন, অথচ আদর্শ জায়গা হতে পারে এই বনাঞ্চল। তবে নিরাপত্তার খাতিরে অবশ্যই দল বেঁধে যাবেন এবং জননিরাপত্তা সম্পর্কিত তথ্যের জন্য টেকনাফের ওসির সঙ্গে কথা বলে নেবেন।

ছবি: লেখক

 


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box