টেন ইয়ার্স চেঞ্জ…

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

দশ বছর।
দশ বছর!
দশ বছর…

দশ বছর উচ্চারণ করার সময়ে এমনই তিন রকম অভিব্যক্তি হয় আমার। প্রথম বার শুধু বলি, বোঝার চেষ্টা করি। দ্বিতীয় বার বিস্মিত হই। তৃতীয় বার স্মৃতির অতলে ভেসে যাই।

আজ থেকে দশ বছর আগের সময়টা জীবনের সেরা সময় ছিলো এবং জীবনটাও সে সময়ের অন্যতম সেরা একটা জীবন ছিলো… আমি, আমার আশপাশ, আমার অনেকটা বড় আশপাশ… সব মিলিয়ে বেঁচে থাকার পাঠ শিখিয়েছিলো। শিখিয়েছিলো, বেঁচে থাকা মানে উদযাপন।
আজ, দশ বছর পরের এই সময়টা শেখাচ্ছে, উদযাপন নয়। যাপনই যথেষ্ট। বেঁচে থাকাটা আলাদা করে গুরুত্বপূর্ণ নয়, কারণ মরে না যাওয়াটাই আশ্চর্যের!

দশ বছর আগে

চরম সাহসি, প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা, তুমুল বেপরোয়া, অবাক মায়ায় জড়ানো, খিলখিলে একটা মেয়ের হাত আমি দশ বছর আগে ছেড়ে এসেছি। ঠিক দশ বছর আগে বলা ভুল, আসলে দশ বছর ধরে ছেড়েছি একটু একটু করে। সে ফিরে গেছে অভিমানে। খুন হয়ে গেছে এক সময়। আর আসবে না কখনও, আমি জানি।

দশ বছর পরে আজ যে আমিটার মুখোমুখি হয়েছি, সে হয়তো আপাত ভাবে সফল এবং সুন্দর একটা জীবনে বাস করছে, কিন্তু সেটা শুধুই বাস করা। বাঁচা নয়।
সহজাত সাহসগুলো এখন শর্তনির্ভর। প্রাণ আছে, তবে তা যে কোনও প্রাণীর যতটা থাকে, ততটাই। তাতে প্রাচুর্য নেই। বেপরোয়া হওয়ার আগে এখন সামনে আসে পরিস্থিতি। চেকলিস্ট তৈরি করে হাতে ধরায় সে। এবং অবশ্যম্ভাবী ভাবে তার সব ক’টায় টিক দেওয়া সম্ভব হয় না।
এখন আমি আনন্দে নয়, অভ্যেসে হাসি। হাসতে ভাল লাগে বলে হাসি। হাসার সময়টা কাঁদি না বলে হাসি। আর মায়া মানেই যে কষ্ট, সেটাও এই দশ বছরে কান ধরে শিখিয়ে দিয়েছে জীবন।

দশ বছর আগের যে ছবিটা এখানে পোস্ট করলাম, ছবিটা কুৎসিৎ। ছবিটা বিশ্রী। কিন্তু হলফ করে বলছি, এই ছবিটা যে সময়টায় তোলা, সে সময় আমি সব চেয়ে সুন্দর। আমার চেয়ে সেরা কেউ নেই। আমায় তখন কখনও কোনও আড়াল খুঁজতে হতো না। দ্বিধা-দ্বন্দ্বেরা চোখে চোখ রেখে কথা বলতে ভয় পেতো। এই ছবিতে, ক্যামেরা আর আমার মুখের মাঝে কোনও পর্দা নেই। জীবনেও ছিলো না। এপার-ওপার দেখা যাওয়া স্বচ্ছতা অর্জন করেছিলাম।

সালটা ২০০৯। ২৮ দিনের বেসিক মাউন্টেনিয়ারিং কোর্স করার পরে, রোদ-বরফ-ঠান্ডায় ঝলসে গেছিলো মুখের চামড়া। কিন্তু এই চামড়ার তলায় যে

দশ বছর পরে

আত্মবিশ্বাস জন্মেছিলো, যে অভিজ্ঞতারা হাত মিলিয়েছিলো, যে জীবনবোধ তৈরি হয়েছিলো, বেঁচে থাকার যে শিক্ষা গড়ে উঠেছিলো, তা আমার আজীবনের অমূল্য সম্পদ, আমৃত্যুর অফুরন্ত সঞ্চয়। এই ২৮দিন পার করে যে মেয়েটার নতুন করে জন্ম হয়েছিলো, সেই মেয়েটার দুনিয়া জিতে নেওয়ার ক্ষমতা ছিলো। সেই মেয়েটার আকাশ দাপিয়ে ওড়ার মতো শক্ত দু’টো ডানা ছিলো। সেই মেয়েটা পাহাড়ের কাছে শুধু নতজানু নয়, পাহাড়ের কাছে তীব্র ভাবে দায়বদ্ধ ছিলো।
প্রিয়তম ছবিটা সব সময়ের প্রিয় বন্ধু ফাহাদের তোলা।

পরের ছবিটা দশ বছর পরের। ২০১৯। পাহাড়ের কাছে আরও বেশি নত হয়েছি, তবে দায়বদ্ধতা এখন সমতলেই বেশি। এখন রাশিরাশি দ্বিধা-দ্বন্দ্বের আড়ালেই নিজেকে খুঁজে পাই বেশি করে। যদিও এই ছবিতে আমি হাসছি… পাহাড় দেখে, সূর্য মেখে। কিন্তু এ ছবির চোখে কাজল ঘষতে হয়েছে আফশোস আর ক্লান্তিদের ধরা পড়ে যাওয়া আটকাতে। চামড়া আর ক্যামেরার মাঝে ফিল্টারের প্রলেপ পড়েছে এই ছবিতে।
প্রিয় ছবিটা বর্তমান হাজ়ব্যান্ড এবং প্রাক্তন বন্ধু কিংশুকের তোলা।

দশ বছরের যদি সত্যি কোনও চ্যালেঞ্জ হয়, তবে চ্যালেঞ্জের এপারে আমি একটা ব্যর্থ, ভণ্ড, নিষ্ফল মানুষকে দেখতে পাই কেবল। ওপার থেকে হাত নাড়ে অনন্ত সম্ভাবনা নিয়ে খুন হয়ে যাওয়া পূর্বজন্ম।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে