ডানাবিহীন এক কুয়াশা-পাখি, হয়তো জেনেছিলেন নিজের জ্যামিতি!

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কামরুন জিনিয়া

(লুইজিয়ানা-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে): সময় যেনো সালভাদর দালি’র সেই মেল্টিং ক্লক–গলিত ঘড়ি, সীমাবন্ধনহীন সময়ের এক রূপকল্প l সময় তো আমাদের মধ্যে নয়, আমরা সময়ের মধ্যে বিকশিত l সত্যি সত্যি একবছর কেটে গেলো কবি মুনিরা চৌধুরী বিহীন। বছর ঘুরে সেই নভেম্বর ১৭ ফিরে এলো চলেও গেলো! সময় চলে যায় আসলে, সে-কথা কবি মুনিরা চোধুরীও জানতেন!

কবি মুনিরা চৌধুরীর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিলো ‘আকাশলীনা-ডায়াসপোরা সংখ্যা’টি নিয়ে কাজ করবার সময়ে l ইংল্যান্ডে বসবাসকারী আমাদের দেশের একঝাঁক চমৎকার কবি ও লেখক আছেন, তাঁদেরই একজন আমাকে জানিয়েছিলেন মুনিরা চৌধুরী সম্পর্কে। তখন তিনি বাংলা একাডেমী, ইউ.কে. এর পরিচালক পদে দায়িত্বরত এবং পাশাপাশি কাজ করছেন এনএইচএস-এর সঙ্গে l

কবির সঙ্গে পরিচিত হলাম, টেলিফোনে কথা হলো, ফেসবুকে সংযুক্ত হলাম দু’জনে–সেই থেকে শুরু! যোগাযোগ করে আমি কবিকে অনুরোধ করেছিলাম তাঁর পাঁচটি গুচ্ছকবিতা ‘আকাশলীনা-ডায়াসপোরা সংখ্যা’র জন্যে পাঠাতে, সঙ্গে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও একখানি ছবি, যাতে পাঠকদের জন্যে আকাশলীনা এন্থোলজিতে দিতে পারি l মনে আছে, কবি মুনিরা চৌধুরী একদিন পরই কি সুন্দর গুছিয়ে পাঁচটি কবিতাসহ আনুষঙ্গিক সকল তথ্য আমাকে ইমেইল করেছিলেন l কবিতাগুলো পড়ার আগেই সত্যি বলতে আমার চোখ আটকে ছিলো তাঁর পাঠানো ছবিটিতে! কী সুন্দর মুখ, কী চমৎকার দেখতে কবি মুনিরা চৌধুরী–মনে মনে বলেছি, কোথায় যেনো দেখেছি এ লাবণ্যময়ী মুখ! বোনের মতো, দিদির মতো আপন, কোথায় দেখেছি?–সেটি যে কষ্টের আর-এক গল্প! অন্য কোনোদিন লিখবো, আজ নয়!

নীচের প্রথম ছবিটিই সেই ছবি, যা মুনিরা চৌধুরী তাঁর লেখার সাথে আমাকে পাঠিয়েছিলেন, ঠিক যেনো অন্ধকারের মাঝখানে বসে আছেন আলো হয়ে, প্রদীপ হয়ে l আজ তাঁর মৃত্যুর এক বছর পর ছবিটির দিকে তাকিয়ে মনে হলো কি আশ্চর্য নিশ্চুপ, অনুযোগ-অভিযোগহীন মুনিরা চৌধুরী যেনো ‘নিশ্চল, নিশ্চুপ আপনার মাঝে পুড়িব একাকী গন্ধ বিধূর ধূপ’!

পরিচিত হবার পর মুগ্ধ হয়ে খেয়াল করলাম মুনিরা চৌধুরী বেশ গুছিয়ে কাজ করছেন এবং নিয়মিত লিখে চলেছেন গদ্য, কবিতা, বই ও সাহিত্যের কাগজ সম্পাদনা করছেন, বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে ইউ.কে বাংলা একাডেমির ব্যানারে করে চলেছেন একটির পর একটি সফল ও চমৎকার সব অনুষ্ঠান–পহেলা বৈশাখ উদযাপন থেকে শুরু করে বইমেলা পর্যন্ত! দেশের বাইরে অভিবাসী ব্যস্ত জীবনে শত প্রতিকূলতার মধ্যে যখন বাংলা সাহিত্য ও বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা বেশ কঠিন ও সাহসের, তখন এ ব্যাপারে আগ্রহী হওয়া, ভালোবেসে কাজ করে যাওয়া মুনিরা চৌধুরীর হৃদয়বৃত্তির অসাধারণ সজীবতার লক্ষণ বহন করে বৈকি! শিক্ষায়, জ্ঞানে, গর্বে, পদচারণায় ও প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন অসামান্য ও বিরাট হৃদয়ের ল্ম

কবি মুনিরা চৌধুরীর জন্ম যুক্তরাজ্যের গ্যাস্টারশায়ারে l জন্ম যুক্তরাজ্যে হলেও বাংলা ভাষা, বাংলাদেশ ও বাঙালি সংস্কৃতির সাথে পরিচয়, শিক্ষাদান এবং পড়াশুনার জন্যে তাঁর পিতামাতা তাঁকে বাংলাদেশে পাঠান l পরবর্তীতে ইংল্যান্ডে ফিরে মুনিরা চৌধুরী বাংলা ভাষায় কবিতা ও গদ্য রচনা করতে শুরু করেন l পাশাপাশি লিখেন ইংরেজী ভাষাতেও l মেধাবী মুনিরা চৌধুরী যুক্তরাজ্যের কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজী সাহিত্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন l গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকেও তিনি কৃতিত্বের সাথে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন l

ইংল্যান্ডে বাংলা ও বাঙালি সংস্কৃতি চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা মুনিরা চৌধুরী ছিলেন সেখানকার বাঙালিদের কাছে সুপরিচিত lতাঁর মৃত্যুতে অভিবাসী বাঙালিদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে আসে lমুনিরা চৌধুরীর অনন্য ব্যক্তিত্ব, তাঁর নম্রতা, তাঁর ব্যবহার, কবিতার প্রতি তাঁর প্রগাঢ় ও গভীর ভালোবাসাই শুধু নয়, তিনি ছিলেন ভীষণ ভাবে রাজনৈতিক-সচেতন একজন মানুষও l মাঝে মাঝে দেশের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি যা তাঁকে উৎকণ্ঠিত করতো–সে সকল বিষয় নিয়েও লিখতেন l

মারা যাবার একদিন আগেও ফেসবুকে পোস্ট করে গেছেন তাঁর কবিতা l সর্বোপরি, তিনি ছিলেন ডায়াসপোরা কবিদের এক অত্যুজ্জ্বল প্রতিনিধি l

মুনিরা চৌধুরীর প্রকাশিত কবিতার বই–

‘মৃতের মাতৃমঙ্গল’, ‘নয় দরজার বাতাস’, ‘মেহেকানন্দা কাব্য’

ইংরেজী কাব্যগ্রন্থ–‘Come Close To My Eye Pencil’.

কবি মুনিরা চৌধুরীর সার্বিক সহযোগিতায় ইউকে বাংলা একাডেমি থেকে নাঈম ফিরোজের সম্পাদনায় “পয়েটিক অফ গ্রীন  ডেল্টা” নামে একটি বই প্রকাশিত হয়।

সম্পাদনা করেছেন সাহিত্যের কাগজ ‘রক্তকরবী’

যৌথ কাব্যগ্রন্থ–‘চন্দ্রাহত কবিতা’

সম্পাদিত সংকলন–‘দিলওয়ারমঙ্গল’, ‘পিতা ও কবিতা’ এবং ‘নির্বাচিত ডায়াস্পোরা কবিতা’ জীবনাবসানের পূর্ব পর্যন্ত তিনি বাংলা একাডেমী, ইউকে-এর পরিচালক পদেই দায়িত্বরত ছিলেন l

ফেসবুক স্ট্যাটাসে এক/দু’দিন পর পরই পোস্ট করতেন নতুন কবিতা, আমি কখনও মিস করতাম না তাঁর ফেসবুক পোস্ট, স্পেশ্যালি কবিতা! খুব ভালো লাগতো পড়তে! একটু অন্যরকম! কবিতার শব্দ, বাক্য গঠন, পুরাণ থেকে মীথের ব্যবহার, ধ্বনিমাধুর্য, ইত্যাদি মিলিয়ে সুখপাঠ্য এবং পাশাপাশি গভীর চিন্তা-ভাবনা, কল্পনা, রহস্য ও গভীর দর্শনে ডুবিয়ে দেয়ার মতো l নিমগ্ন হয়ে পড়তাম তাঁর চমৎকার কবিতাগুলো।

আমি যখন কবি মুনিরা চৌধুরীর মৃত্যু-সংবাদ পাই তখন আমেরিকার লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যে ১৮ই নভেম্বর দুপুর l মাথায় বজ্রপাত হলো, হৃদয় এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গেলো! অবিশ্বাস্য! মনে হলো, নিশ্চয়ই ভুল শুনছি অথবা হয়তো ঘুমিয়ে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছি! কয়েকজনকে ফোন করে, ফেসবুকে কবি মুনিরা চৌধুরীর ওয়ালসহ পরিচিত সব বন্ধুদের স্ট্যাটাস, কমেন্ট পড়ে তেমন বিস্তারিত কোনো কিছুই জানা গেলো না! পুরো দুপুর, বিকাল, সন্ধ্যা মন খারাপ করে নিশ্চুপ বসে থাকলাম! সন্ধ্যার কিছু পর ফেসবুকে কয়েকজন শেয়ার করলেন ঢাকার একটি সংবাদপত্রের লিঙ্কসহ শিরোনামঃ ‘কবি মুনিরা চৌধুরী এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন’ l মেজাজ খারাপ হলো! তাৎক্ষণিক একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস আমিও তখন লিখি আমার মতো করে আমার কষ্টের অনুভূতির কথা জানিয়ে! আমার মনে আছে, আমি সারারাত জেগেছিলাম সে রাতে l অনেকদিন পর বাচ্চাদের মতো কেঁদেছিলাম, দু’চোখ জলে ভেসে গেছে! বিস্তারিত কেউ তেমন কিছু জানেন না, জানলেও মুখ খুলছেন না l আমি রাত জেগে কবি মুনিরা চৌধুরীর ফেসবুক ওয়ালে বসে থাকি আর স্ক্রল করে করে তাঁর পোস্ট-করা কবিতাগুলো বার বার পড়তে থাকি আর তাঁর ছবিতে তাঁর অমন সুন্দর মুখের দিকে, কালো গভীর দুটি চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি l প্রশ্ন করি, ‘কেনো এমন করলেন মুনিরা আপা?’ আমাকে পাঠানো তাঁর গুচ্ছ কবিতার একটিতে লিখেছিলেন:

‘পৃথিবীর কোনো এক রান্নাঘরে আলু-পটল কাটতে ভুলে যাই

আমি আমাকে কেটে ফেলতে ভুল করি না

ওহ পাখি, পরমাত্মা … ‘

আমি জানি, এখন অনেক দেরী হয়ে গেছে, আমার বা অন্য কারোর আর কিছু করার নেই, মুনিরা চৌধুরী আর নেই, চলে গেছেন কুয়াশা কুড়াতে কুড়াতে আমাদের কাউকে কিছু না বলে, সব শেষ! থেমে গেছে সব l

তবুও আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, দেখতে ইচ্ছে করে তাঁর চলে যাওয়ার পথ, কুয়াশা-ঘেরা সেই কার্ডিফের হুইটমোর বে বীচ-এর উপকূল, সমুদ্রের বুকে তখন কতোটা ঢেউ, সেখানকার আকাশ নীল নাকি মেঘাচ্ছন্ন, সেখানকার বাতাসে নিশ্চয়ই এখনও আছে কবির স্পর্শ, গায়ের গন্ধ, বালিতে তাঁর পদচিহ্ন, অথবা সেখানে কি কোনো জোনাকি পোকা ছিলো তার সবটুকু আলো নিয়ে তাঁর সাথী হয়ে?

লুইজিয়ানাতে রাত গভীর হয় আর আমার মনের অবস্থাও ক্রমশঃ আরও খারাপ হচ্ছিলো সময়ের সাথে সাথে l ফেসবুক ইনবক্সে ঢুকে তাঁর সাথে আমার বিভিন্ন সময়ের ছোটো ছোটো কথোপকথনগুলো পড়তে থাকি l ‘আকাশলীনা-ডায়াসপোরা সংখ্যা’র একটি কপি তাঁকে মেইল করবো বলে মাঝে আমিই একদিন কবিকে তাঁর পোস্টাল এড্রেস জানাতে অনুরোধ করেছিলাম l ভাগ্যিস, তিনি ঠিকানাটি জানিয়েছিলেন l নয়তো শুধু গ্রেটার ওয়েলসের নিউজ/ খবরগুলোতে আবর্তিত হতে হতো, কার্ডিফের লোকাল নিউজপেপার সাইটের খোঁজ পাওয়াই দুস্কর ছিলো l আমি এড্রেসটি কপি করে, জিপকোডসহ পথের নাম, শহর দিয়ে অনলাইনে এলোমেলো ইন্টারনেটে সার্চ করতে থাকি বিষণ্ণ মনে! রাত আরও গভীর হয়, পুরো মন জুড়ে কবি মুনিরা চৌধুরী বসে আছেন, তাঁকে জিজ্ঞেস করি, মুনিরা আপা, কুয়াশার ডানা কি ঈশ্বর জুড়ে দিয়েছিলেন আপনার শরীরে?–প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই! খুব কষ্ট হয় আমার!

আমি কার্ডিফ শহরের স্থানীয় সংবাদপত্রগুলোর অনলাইন ভার্সনগুলো পড়তে শুরু করি l নভেম্বর মাস, কার্ডিফে তখন শীতকাল, গাড়ি দুর্ঘটনার নিউজগুলোতে দেখলাম কার্ডিফের কয়েকটি রাস্তা পুলিশ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে ঘন কুয়াশার কারণে l আমি চমকে উঠি, আমার বুক কেঁপে ওঠে! যারা কবি মুনিরা চৌধুরীর কিছু সংখ্যক কবিতাও পড়েছেন, তারা নিশ্চয়ই জানেন ‘কুয়াশা’ শব্দটি তাঁর কতো প্রিয়, আপন! তিনি নিজেকে মনে করতেন এক ‘কুয়াশা-পাখি’ যে পাখির কোনো ডানা ছিলো না, কারণ ডানাদুটি কেটে ফেলা হয়েছিলো তাঁর ছোটবেলাতেই l

ঘড়ির সাথে সময় মিলিয়ে আমি জানি আমার থেকে অনেক অনেক দূরে কার্ডিফ শহরে এইমুহূর্তে আরও একটি নতুন কুয়াশা-ঘেরা সকাল জাগছে! কম্পিউটারে পুরো নিউজপেপার আমার সামনে ঠিকই কিন্তু তন্ন তন্ন করে খুঁজেও মুনিরা চৌধুরীর নামে কোনো নিউজ খুঁজে পাই না আমি! অ্যাক্সিডেন্ট বা সড়ক দুর্ঘটনার ২/৩ টি খবর আছে, কিন্তু কেউ নিহত হন নি, আহত হয়েছেন কয়েকজন l সময় বয়ে যায় তবুও আমি হাল ছাড়ি না, আরও বেশী মনোযোগ দিয়ে খুঁজতে থাকি l

অতিরিক্ত ঘন কুয়াশার কারণে দু’তিনটি রাস্তা সাময়িক বন্ধ এবং কার্ডিফ শহরের রাস্তায় ঘটে যাওয়া কয়েকটি সড়ক দুর্ঘটনার খবর, আহত হয়েছেন কয়েকজন কিন্তু কেউ নিহত হন নি l পত্রিকাগুলো আহতদের নাম সহই ছেপেছিলো খবরগুলো, আমি নিশ্চিত হই কবি মুনিরা চৌধুরী কোনো গাড়ি এক্সিডেন্ট বা দুর্ঘটনার শিকার হন নি l ঢাকা থেকে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করছিলো, ফেসবুকে সে খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিলো এবং মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছিলো l একে তো মন ভীষণ রকমের খারাপ, তার ওপর মিথ্যে খবর, নানা জল্পনা কল্পনা আমাকে বিমর্ষ করে তুলেছিলো l

আমি স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলাম! সংবাদপত্রের ভাষ্য অনুযায়ী সেদিন রাতে (১৭ই নভেম্বর, ২০১৮) পুরো কার্ডিফ ঘন কুয়াশার আবরণে ঢাকা পড়েছিলো, আবহাওয়া ছিলো অন্যদিনের চেয়ে খুব খারাপ l সাধারণতঃ নভেম্বরের এ-সময়ে কার্ডিফের গড় তাপমাত্রা 12.8 °C এর মতো থাকে, কিন্তু সেদিন রাতে তাপমাত্রা আরও কমে হয়েছিলো 7 °C (45 °F) l ঘন কুয়াশায় ঘেরা শীতের সেই কনকনে ঠান্ডা হাওয়ার রাতে কবি মুনিরা চৌধুরী গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন একা–ডানাবিহীন ব্যথিত, বিধ্বস্ত এই কুয়াশা-পাখিকে কেউ, কোনোদিন কি আহবান করেছিলো মেহেকানন্দার তীরে যেতে? আশ্বাস দিয়েছিলো আটকে-পড়া পাখির শরীরে কুয়াশার ডানা জুড়ে দেবার?

কিছু সময় পর নিউজ-আপডেট চেক করতে গিয়ে আমি পেয়ে যাই কার্ডিফের লোকাল নিউজপেপারগুলোর এক কোণে সাউথ ওয়েলস পুলিশ ডিপার্টমেন্টের বরাত দিয়ে খুব ছোট্ট একটি খবর, সাথে একটি নিউজ লিঙ্ক l লিঙ্ক খুলতেই সেই কার্ডিফ বীচের ছবি আর দুটি পুলিশ কার l (ছবি-১) ১৮ই নভেম্বর সকালের ছবি, যখন কোনো ব্যক্তির ফোনকল পেয়ে সাউথ ওয়েলস পুলিশ ব্যারী আইল্যান্ড (Barry Island)-এর হুইটমোর বে (Whitmore Bay) বীচে যেয়ে উপস্থিত হোন এবং বীচের উপকূল থেকে নিষ্প্রাণ কবি মুনিরা চৌধুরীকে উদ্ধার করেন l

 তখন মনে হয় শুধু কার্ডিফ শহরের ব্যারী আইল্যান্ড নয়, সমস্ত পৃথিবী জুড়ে নেমেছে এক আশ্চর্য কুয়াশার ঢল, যেখানে ডানাবিহীন এক কুয়াশা-পাখি একজন কবি সকল হিমশীতলকে বিদীর্ণ করে, সমস্ত ভয়কে অতিক্রম করে, দৃঢ় পদক্ষেপে হেঁটে যাচ্ছেন সমুদ্রের দিকে, সমুদ্রের ঢেউয়ে, সমুদ্রের গভীরে–এবং তা মোটেও নিজেকে নিঃশেষ করবার জন্যে নয় বরং নিজেকে সমুদ্রের কাছে, বৃহৎ ও বিরাটের কাছে সমর্পণ করে জন্মান্তরে অমৃতপাখি হয়ে জেগে উঠবেন বলে!

” জন্মান্তরের প্রতি-ভোরে কুয়াশা কুড়াই

কুয়াশার বিচি জমিয়ে রাখি মৃত ঠাকুরমা’র ঝুলিতে

একদিন আমি চোখের মণিতে মাইলের পর মাইল ফসল ফলাবো …

নিঃশ্বাসগুলো আকাশে উড়িয়ে দেই

দূরতম উড়িয়ে দিয়েছি ছায়া ও বাতাসের কঙ্কাল

একদিন তারা পাখি হবে, মেহেকানন্দা নদীতীরে!

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]