ডায়াগনসিস

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

মৌসুমী দাশগুপ্তা

অনেক্ষণ হলো এক জায়গায় ঠাঁই বসে আছি, নড়ে চড়ে বসলে হয়, কিন্তু ইচ্ছে করছে না। ইদানীং আমার বড়ই ক্লান্ত লাগে। কোন কাজই করতে ইচ্ছে হয় না, বাচ্চাটার যত্নও নিতে পারি না ঠিকমত।

অফিসে সবাই রোজ জিজ্ঞেস করে, ‘শরীর খারাপ না কি আপনার? দিন দিন এমন রোগা হয়ে যাচ্ছেন কেন?’ শেষ পর্যন্ত আজ তাই অফিস ফেরতা ডাক্তারের কাছে এসেছি। ভদ্রলোক বেশ নামকরা বিশেষজ্ঞ, অনেক টাকা ফী। তা হোক, তারপরও শরীরটা ঠিক করা দরকার, বাচ্চাটার জন্যই দরকার।

ডাক পড়েছে এবার, এখানে নিয়ম কানুন ভালো। আগে একজন জুনিয়র ডাক্তারকে দেখাতে হয়, তিনি সমস্ত বিস্তারিত বিবরণ শুনে তার সারমর্ম প্রফেস্যর সাহেবকে জানাবেন। আমার আগে একটি বোরখা পরা মহিলা, তাঁর স্বামীর সঙ্গে এসেছেন। স্বামী হুজুর মানুষ, সবুজ কোর্তা আর সবুজ মাফলার গলায়। কথা যা বলার তিনিই বলছেন, মহিলা একদম চুপচাপ। একটু সময় পরেই বুঝলাম সমস্যা গুলো তাঁদের একান্তই ব্যক্তিগত, যে কারো কাছেই বলতে সংকোচ হবার কথা, চার পাঁচজন বাইরের মানুষের সামনে বলা তো খুবই কঠিন। কিন্তু নিয়ম এরকমই, একসঙ্গে তিনজন রুগী এবং রুগীর লোক ঢুকবে, একজোড়া রুগী এবং রুগীর লোক সামনের চেয়ারে বসে তাদের কাহিনী বলবে, পরের জোড়া রুগী আর রুগীর লোক পাশের চেয়ারে বসে অপেক্ষা করবে আর তিন নম্বর জোড়া দরজার ঠিক ভিতরে বা বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করবে। আমি মাঝামাঝিতে আছি, তবে আমার সঙ্গে কেউ নেই বলে আমার পরের রুগীটি আমার পাশের চেয়ারে বসেছে। বেশ কৌতুহলী মানুষ, রীতিমত গলা লম্বা করে সামনে বসা হুজুরের কথা শোনার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

জুনিয়র ডাক্তারটি নিতান্তই কম বয়সী, দেখতে শুনতে বেশ হ্যান্ডসাম। একটু পরপর তার ফোন বেজে উঠছে। কথা শুনে মনে হচ্ছে তার আজকে হাসপাতালে সন্ধ্যায় ডিউটি ছিলো, কিন্তু সে সেখানে না গিয়ে স্যারের চেম্বারে কাজ করতে এসেছে। হাসপাতাল থেকে বারবার ফোন আসছে, অনেক গুলো রুগী ভর্তি হচ্ছে, তাদের ডাক্তার কম। ছেলেটি মন দিয়ে রুগীর কথা শুনতে পারছে না, বোঝা যাচ্ছে সে আজ বেশ একটু ঝামেলার পরে গেছে। বারবার উশখুশ করছে। এমন সময় আরেক জন ডাক্তার ঘরে ঢুকতেই সে লাফিয়ে উঠলো। ‘অজিত’দা, আমার এখনই যেতে হবে, মেডিকেল থেকে বারবার ফোন আসছে, ওখানে আমার আজকে ইভনিং ডিউটি করার কথা। আপনি যদি বাকি রুগী গুলো দেখে দিতেন!’ অজিত’দা অত সহজে ধরা দেবার পাত্র নন। মাথা নেড়ে বললেন, ‘ধুর মিয়া, আমার আজকে স্কুলের রিইউনিয়ন, যেতেই হবে। অল্প কটা রুগী, তুমি এক টান দিয়ে দেখে চলে যাও।’ বলেই ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেলেন।

আমার ডাক্তারটির জন্য একটু মায়াই লাগছে। সে খুব কষ্টে হুজুরের কথায় মন বসানোর চেষ্টা করছে, টুকটাক একটা দু’টো প্রশ্নও করছে। একটু পরই তাদেরকে বিদায় করে দিয়ে আমাকে সামনে ডাকলো। আমার পিছনের কৌতুহলী রুগীটি ঠিক আমার ঘাড়ের পিছনে, আমার প্রতিটি কথা শোনা যেন তার জন্য খুবই জরুরী।

নাম ধাম দিয়ে কথা শুরু হলো। পাঁচ বছর আগে আমার জরায়ু মুখের ক্যান্সার হয়েছিলো। খুব প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়ায় অপারেশন করে জরায়ু বাদ দিয়েই কাজ হয়, অন্য কোন থেরাপী নিতে হয়নি। কিন্তু আমার ভিতরে ভয় রয়েই গেছে, যদি কোন বীজ কোথাও থেকে গিয়ে থাকে, যদি আবার সেই ভয়াবহ কর্কটটি ফিরে আসে! নিজের জন্য তেমন ভয় ছিলো না, কিন্তু আমি না থাকলে আমার বাচ্চাটার খুব কষ্ট হবে। আমার স্বামীর কেমন করে যেন ধারণা হয়েছিলো জরায়ু মুখের ক্যানসার কোন সতী সাধ্বী নারীর হতে পারে না, নিশ্চয়ই আমি গোপনে কোন পাপ করেছি। তাই রোগটি ধরা পরার পরপরই তিনি নিজেকে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে নিজের এবং নিজ পরিবারের সম্মান রক্ষা করেছেন।

আমি যতটা সম্ভব নীচু গলায় ডাক্তারি পরিভাষা ব্যবহার করে আমার রোগের কথাটা বলার চেষ্টা করলাম, কিন্তু তরুণ ডাক্তারটি ধরতে পারলেন বলে মনে হল না। তার আবার ফোন আসছে। কোন একটি ক্লিনিকে তার রাতের ডিউটি করার কথা, তারা জানতে চাইছে সে কখন সেখানে পৌঁছাবে। আমার এবার একটু একটু রাগ হতে লাগলো, এত জায়গায় এত্তগুলো কাজ সে একা করবে ভাবলো কি করে! আবার ভাবলাম, তার হয়তো কোন কারণে অনেক টাকা প্রয়োজন, হয়তো বাসায় অনেক খরচ, কতজনের কত সমস্যা থাকে, তাই না!

আমি মাথা ঠান্ডা করে আবার আমার বর্তমান অবস্থার কথা বলতে শুরু করলাম। পেছনের কৌতুহলী লোকটি আরও একটু ঝুঁকে এসেছে, আমার ঘাড়ে তার গরম নি:শ্বাস টের পাচ্ছি। তরুণ ডাক্তারটি প্যাডে খসখস করে লিখছে। আমার আগের ক্যান্সার এর কথাটি সে একবারও লিখলো না, না কি কোন সাংকেতিক ভাষায় লিখেছে, যা আমি বুঝতে পারছি না! কিন্তু সে এ নিয়ে আমাকে একটা প্রশ্নও করেনি, বিস্তারিত কিছুই জানতে চায়নি। আমার খুব ক্লান্ত লাগছে… কাউকেই কিছু বলতে ইচ্ছে করছে না আর।

খুব বাবার কথা মনে পড়ছে, ছোটবেলায় মাঝে মাঝে আমার মন খারাপ হতো আর আমি মুখ গোঁজ করে ঘরের কোণে বসে থাকতাম। প্রায়ই আমি বুঝতাম না কেন আমার মন খারাপ লাগছে, কেন কিচ্ছু ভালো লাগছে না। কিন্তু আমার বাবা কেমন করে যেন ঠিক জেনে যেত কেন আমার মন খারাপ। বাবা পাশে এসে বসে আমার মাথাটা বুকে টেনে নিয়ে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আস্তে আস্তে এটা সেটা বলতো আর টুপ করে আমার মন খারাপের কারনটা বেরিয়ে আসতো আর সঙ্গে সঙ্গে মনটাও ভালো হওয়া শুরু করতো। আমার খুব ইচ্ছে করছে বাবার মত কেউ একজন আমার ভেতরের কথা গুলো বের করে আনুক, আমার কষ্টগুলো বলার আগেই বুঝে নিক।

এই তরুণের কাছে এতটা আশা করা অনুচিত। হয়তো প্রফেস্যার সাহেব ধরতে পারবেন।

রাত বাড়ছে, তরুণ চিকিৎসকের ঘর থেকে বের হয়ে এসে আবারও আমি ওয়েটিং রুমের শক্ত চেয়ারে বসে আছি। কখন ডাক পড়বে বড় ডাক্তারের ঘরে! আমার ডায়াগনসিস হবে তো!

ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]