ডা. লিটু: রোগীকে ভাবতেন নিজ পরিবারেরই একজন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রহমান মুস্তাফিজ , সাংবাদিক

১৮ জানুয়ারি ২০১৮, শুক্রবার। দুপুরের অলস সময়ে খবর পেলাম খুব কাছের বন্ধু, ভাই ডাক্তার রাকিবুল ইসলাম লিটু আর নেই। মনটাই খারাপ হয়ে গেল। যে মানুষটি কতো শত জনের জীবন বাঁচিয়েছেন সেই মানুষটি অসুস্থতার কাছে অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করলেন। অন্যের হার্ট মেরামত করতে এতোই ব্যস্ত ছিলেন, সময় পাননি নিজের হার্টের খবর নেয়ার। গরীবের ডাক্তার হিসেবে পরিচিত ডা. লিটু শুক্রবার সকাল ১০টায় আর্থিকভাবে অস্বচ্ছ্বল রোগীদের জন্য ফ্রি চিকিৎসা ও বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণের আয়োজন করেছিলেন।আর যাওয়া হয়নি তার। সেদিনই তাকে চিরবিদায় নিতে হলো। সেদিন দুপুরেই রাজধানীর ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

স্ত্রীর সঙ্গে

২০০৮ সালে আমার স্পাইনের নিচের দুইটি ডিস্ক ক্ষতিগ্রস্ত হলো। দুই ডিস্কের মাঝে আটকে গেছে নার্ভ সিস্টেম। অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী নতুন জীবন দিলেন। চিকিৎসার এক পর্যায়ে বললেন, এবার থেরাপি নিতে হবে, ২০ মিনিট ট্রাকশন ও ১০ মিনিট হিট (শকওয়েভ)। প্রথম দিন গেলাম সেন্ট্রাল হাসপাতালে। ৯শ’ টাকা লাগলো। থেরাপি নিয়ে এসে বাসার নিচে দাঁড়িয়ে আছি। মন খারাপ।ভাবছিলাম আজই থেরাপির প্রথম ও শেষ দিন। থেরাপি নিতে প্রতিমাসে লাগবে ২৭ হাজার টাকা। এতো টাকা কোথায় পাবো! তার আগের মাসেই বেতন হয়েছে ৩২ হাজার টাকা। থেরাপির ২৭ হাজারের পর ওষুধ, তিন বেলা খাবার, বাসা ভাড়া… সব মিলিয়ে বলে দেয়া যায়, আজকের পর আর থেরাপি নেয়া হবে না। মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে। এমন সময় দেখা ডা. লিটুর সঙ্গে। হাতিরপুলে আমাদের রাতের আড্ডার সঙ্গী তিনি। চিকিৎসার খবর নিলেন।তারপর সব শুনে থেরাপির জন্য পরদিন যেতে বললেন পিজি হাসপাতালে।

সকালে পিজিতে গিয়ে দেখলাম আমার জন্য ডা. লিটু অপেক্ষা করছেন। সেন্ট্রাল হাসপাতালের ৯শ’ টাকার থেরাপি পিজিতে ১২০ টাকা।তবে মানের বিবেচনায় পিজি ভালো। তার সহায়তায় আমি চিকিৎসা অব্যাহত রাখতে পারলাম, এবং পঙ্গুত্ব বরণ না করে এখন দৌড়ে বেড়াই।
তার এমন ব্যবহার শুধু আমার সঙ্গে নয়। চেনা, অচেনা… সবার জন্যই তার সাহায্যের হাত সবসময়ই বাড়ানো থাকতো। অসংখ্য রোগী পাঠিয়েছি তার কাছে। ২/৪ মাস কেটে গেলো অথচ আমার রেফারেন্সে কোন অস্বচ্ছ্বল রোগী তার কাছে যাচ্ছে না।তাহলে তিনি ফোন করে একচোট ঝেড়ে নিতের। বলতেন, বুর্জোয়া হয়ে গেছেন। এখন আর গরীব মানুষের খোঁজ রাখেন না। তার ধারণাটাই এমনই ছিলো। বলতেন অসহায় মানুষকে অনুভব করতে হয় হৃদয় দিয়ে। তাদের সাহায্য করতে হয় মন থেকে।

তার সেল ফোনে কল করলেই বুঝতেন আমার সামনে আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল কোন রোগী আছেন। এমন অনেককেই পাঠিয়েছি ডা. লিটুর কাছে। আমার পাঠানো রোগী মানেই লিটু ভাই তাকে দেখতেন ব্রাইটন হাসপাতালে। বিনা টাকায় এক্সরে, ব্লাড টেস্টের ব্যবস্থা করতেন। কোম্পানির কাছ থেকে পাওয়া ওষুধ দিয়ে দিতেন। এমনকি রোগীর আসা যাওয়ার ভাড়াটাও দিয়ে দিতেন।
ডাক্তার লিটুর কর্মস্থল ছিল শিকদার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ল্যাবএইড হাসপাতাল, বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল , উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও লুবানা হাসপাতালে।

স্ত্রী, সন্তানদের সঙ্গে

রোগী দেখতেন ব্রাইটন হাসপাতাল ও মেট্রো হাসপাতাল। কোনোদিনই কোথাও দীর্ঘদিন চাকরি করা হয়নি। যখন যে হাসপাতালে ছিলেন, সে হাসপাতালেই রোগীদের পক্ষ নিতেন তিনি। যে কোনো অন্যায়, চিকিৎসায় অবহেলার প্রতিবাদ করতেন। হাসপাতালের অব্যবস্থাপণা, পেশাদারিত্বের পরিবর্তে বাণিজ্যিক আচরণের প্রতিবাদের পাশাপাশি এসব তথ্য গনমাধ্যমকেও দিতেন। এসব ক্ষেত্রে গোপনীয়তার আশ্রয় নিতেন না। প্রকাশ্যেই তথ্য-প্রমাণ দিতেন। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে বেশ কয়েকটি রিপোর্টে তিনি আমাকে দিয়ে সহযোগিতা করেছেন।
রোগী-চিকিৎসক সম্পর্ককে তিনি নতুন মাত্রা দিয়েছিলেন। রোগীদের কেবল রোগী হিসেবেই দেখতেন না; নিমেষেই রোগীর নিকটজন হয়ে উঠতেন তিনি।
টকশো-তে কথা বলতেন স্ব-পেশার মানুষদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে। কথা বলতেন মুনাফাখোর বেসরকারি হাসপাতালের কূটকৌশল নিয়েও। মুখোশ উন্মোচন করেছেন তথাকথিত অনেক মানবতাবাদী চিকিৎসকের।
তার চলার পথে দেখা অসুস্থ ভিক্ষুক, বাউল বা মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষেরাও তার চিকিৎসা সেবা পেয়েছেন। শাহবাগ কেন্দ্রীক তৃতীয় লিঙ্গের অনেক অসহায় মানুষের বিপদের বন্ধুও ছিলেন ডা. লিটু।
যে কোন অন্যায়ের বিরুদ্ধেই সোচ্চার ছিলেন ডা. লিটু। খবর রাখতের সমসাময়িক রাজনীতি, অর্থনীতি ও কূটনীতির। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের যে কোন ছাত্র বা যুব সংগঠনকে আর্থিকভাবে সহায়তা করতেন অকাতরে। কখনও কাউকে টাকা গুনে দিতেন না। কোন সম্মেলন, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বা অন্য কোন অনুষ্ঠানের জন্য কেউ চাঁদা চাইলো, পকেটে হাত ঢুকিয়ে সব টাকা বের করতেন। ৫শ’ বা ১ হাজার টাকা নিজের জন্য রেখে সবটাই দিয়ে দিতেন। এতে ২/৪ শ’ থেকে শুরু করে ১০/১২ হাজার টাকা পর্যন্ত জুটতো কারও কারও ভাগ্যে। বেকারদের জন্যও একই ব্যবস্থা। তবে বলতেন, চাকরি পেয়ে টাকা ফেরৎ দিতে হবে। কেউ হয়তো ফেরৎ দিতে এলে খুব কষ্ট পেতেন। বলতেন, ভাইরে পর করে দিলি? টাকাটা নিতেন না। বলতেন, টাকার খুব দরকার এমন কাউকে দিয়ে দিস। বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া লোকটা তোকে দোয়া করবে।
তরুণ সাহিত্যিক। লিটল ম্যাগ করতে চায়। টাকার অভাবে ম্যাগাজিন বের হচ্ছে না। তথ্যটা কারও কাছ থেকে পেলেই হলো, ডা. লিটু তথ্যদাতার হাতে কিছু টাকা দিয়ে বলবেন, এতে না হলে যেন যোগাযোগ করে।
এমন শত শত উদাহরন তৈরি করেছিলেন তিনি। হাজার হাজার অসভ্য, কমার্শিয়াল ডাক্তারের ভিড়ে ব্যতিক্রম ছিলেন ডা. রাকিবুল ইসলাম লিটু। তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তার এ প্রস্থানে কষ্ট পেয়েছেন হাজার হাজার অসহায় মানুষ। সারা জীবন মানুষের পাশে থাকা মানুষটির গল্প এ ভাবেই হয়তো শেষ হলো। কিন্তু ইতিহাসটা রয়ে গেলে অগণিত মানুষের মনে। তার মৃত্যুতে রোগীরা কেঁদেছেন। কেঁদেছেন স্বজন, বন্ধু, শুভার্থীরা। কত পেশার-শ্রেণির অসংখ্য মানুষ তার কাছে কতভাবে ঋণী।
অসংখ্য মানুষের মনের মন্দিরে ঠাঁই পাওয়া মানুষটি চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন উত্তরা ১২ নম্বর সেকশনের কবরস্থানে।

ছবি: প্রয়াত ডা: লিটুর ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]