ডিপ্রেশন নিয়ে ভাবনা আর না

ডা. ওয়ানাইজা

ডা. ওয়ানাইজা

ডিপ্রেশন সম্বন্ধে আমরা বহুবিধ আলোচনা করেছি এবং নানা আঙ্গিকে এর বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তবুও বারবার পাঠকের জন্য ডিপ্রেশনের আলোচনা এ জন্য করতে হয়, কারণ খুব লঘুমাত্রার মানসিক সমস্যা হলেও ডিপ্রেশন আসলে একটি মারাত্মক সমস্যা। ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডারকেই মূলত ডিপ্রেশন বলা হয়। বাংলায় একে বিষণœতা বলা হয়। বিষণœতা শব্দটির সাথে আমরা কম-বেশি সবাই পরিচিত। এটি এমন এক ধরনের শব্দ, যার মৌলিক অর্থ দাঁড়ায় একজনের মনের ভাবসংক্রান্ত সমস্যা। বিষণœতা একটি রোগ। কী জাতীয় রোগ, তাও আমরা জানি। মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিষণœতা খুব বড় প্রভাব ফেলে। অবশ্যই প্রভাবটি নেতিবাচক। চিন্তা-ভাবনা কেন্দ্রীভূত হয়ে ওঠে, অনেকেই ব্যক্তিজীবনে বিষন্নতায় আক্রান্ত হলেও মনে করেন না যে, তাদের কোনো সমস্যা রয়েছে। এটা খুব ভালো লক্ষণ। বহু গবেষণায় দেখা গেছে, ডিপ্রেশন এক প্রকার ব্যক্তিগত দুর্বলতা। সাময়িকভাবে এটি ব্যক্তিকে উদ্বিগ্ন করে তোলে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে রোগীর সামষ্টিক মানসিক সমস্যা সৃষ্টি হয় না। কিন্তু লক্ষণ ও উপসর্গ দেখা দিলেই ডিপ্রেশনের চিকিৎসা করানো উচিত। কেননা এটি যদি ক্রনিক হয়ে যায়, তবে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হলেও হতে পারে। আর সম্ভাবনার কথা না বলে বরং বলা উচিত ক্রনিক ডিপ্রেশন বলে ব্যক্তির বিভিন্ন মাত্রার মানসিক রোগের সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক। কাজেই এ ক্ষেত্রে উচিত হবে ব্যক্তির ডাক্তারি সাহায্য গ্রহণ করা। ডিপ্রেসিভ অবস্থার দুটো প্রকার রয়েছে যেমন-(১) ম্যানিক ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার(২) বাইপোলার ডিসঅর্ডার।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা লক্ষ করেন রোগীর ডিপ্রেশনের ধরন কেমন এবং মোটামুটি এর ওপরই নির্ভর করে থাকে চিকিৎসাপদ্ধতি গ্রহন করা হয়।

insite1.2.2017drডিপ্রেশনের চিহ্ন ও লক্ষণ
এ কথা বলা অযৌক্তিক হবে না যে, বহু ক্ষেত্রে ডিপ্রেশনের প্রকৃত অবস্থা বুঝে উঠতে ডাক্তারদের কষ্ট হয়। কেননা ডিপ্রেশনে আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো চিহ্ন বা লক্ষণ কিংবা উপসর্গ প্রায় ক্ষেত্রেই থাকে না। হয়তো রোগীর স্বাভাবিক আচরণে কিছুটা হেরফের হলো, তা থেকে এটি ধরে নেয়া সহজ নয় যে, রোগীর কেবল ডিপ্রেশন হয়েছে। আবর অনেক ক্ষেত্রে রোগীর ম্যানিয়া বা ফোবিয়া আচরণের সাথেও ডিপ্রেশনের আচরণের মিল থাকতে পারে, কাজেই কোনো ক্ষেত্রে ডিপ্রেশন আক্রান্ত ব্যক্তিদের সাথে কাজ করে মোটামুটি কয়েকটি চিহ্ন ও উপসর্গকে নির্দিষ্ট করতে পেরেছেন, যাতে করে বোঝা যেতে পারে ব্যক্তির ডিপ্রেশনের সমস্যা আছে কি না। এই নির্দিষ্ট চিহ্ন ও উপসর্গগুলো হলো:
* স্বাভাবিক আনন্দমুখর কাজকর্মের প্রতি অনীহা। যেমন- যৌনতা ইত্যাদি।
* ক্ষুধা ও ওজন সংক্রান্ত পরিবর্তন। ওজন বৃদ্ধি অথবা হ্রাস কিংবা ক্ষুধা বৃদ্ধি অথবা হ্রাস পাওয়া ইত্যাদি।
* ঘুমের ক্রমাগত সমস্যা যেমনÑ অনিদ্রা, সকালের দিকে ঘুম ভেঙে যাওয়া অথবা অতিরিক্ত ঘুম
* অপরাধবোধে ভোগা, নিজেকে মূল্যহীন ভাবা অথবা অসহায়ত্তবোধ করা ইত্যাদি।
* আশাহত অনুভূতি।
* কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বারবার অসমর্থ ওয়া এবং একই সাথে চিন্তাশক্তির অধঃপতন, মনোযোগের সমস্যা ইত্যাদি।
* মৃত্যু অথবা আত্মহত্যার চিন্তা করা,এমনকি ক্রনিক পর্যায়ে আত্মহত্যার ঝুঁকি নেয়া।
* ক্রমাগত শারীরিক যেকোনো ব্যথা বৃদ্ধি এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা লক্ষ্য করেন, রোগীর ডিপ্রেশনের ধরন কেমন এবং মোটামুটি এর ওপরই নির্ভর করে থাকে চিকিৎসাপদ্ধতির বিষয়টি।
যারা উপরি উক্ত যেকোনো পাঁচটি উপসর্গে একাধারে দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে ভুগছেন, তাদের উচিত হবে শিগগিরই মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করা।

ডিপ্রেশনের কারণ
মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডারের ক্ষেত্রে কোনো একটি মাত্র কারণ দায়ী থাকে না। বরং বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এজন্য জেনেটিক বা বংশগতির প্রভাব বা বায়োলজিক্যাল বা জীববিদ্যার প্রভাব এবং মনোদৈহিক প্রভাব ও জীবনব্যাপী বিভিন্ন মাত্রার মানসিক চাপের ফলে ডিপ্রেশন সৃষ্টি হতে পারে। মস্তিষ্কের জৈব রাসায়নিক সমস্যার বহুমাত্রিক প্রভাবে ডিপ্রেশন হতে পারে। এটি একটি উল্লেখযোগ্য কারণ। আবার মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট রাসায়নিক অবকাঠামো নিউরোট্রান্সমিটারের নানাবিধ সমস্যার জন্য ডিপ্রেশন সংক্রান্ত মানসিক অসুস্থতার সৃষ্টি হতে দেখা যায়। তবে এগুলো ছাড়াও নানাবিধ পারিবারিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত দুরবস্থা ব্যক্তির জীবনে ডিপ্রেশনের অবস্থা সৃষ্টি করতে সহায়ক হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পারিবারিক কলহ ও পিতামাতার দাম্পত্য অশান্তি পরিবারের অন্য সদস্যদের মনোবৈকল্যের সৃষ্টি করতে পারে এবং এজাতীয় মানসিক সমস্যার ভেতরে ডিপ্রেশনের অবস্থান থাকে এক নম্বরে।

dr.1.2.2017.000ডিপ্রেশনের চিকিৎসাপদ্ধতি ওরোগ নির্ণয়
ডিপ্রেশনের চিকিৎসাপদ্ধতি জটিল এবং এ রকম ধারণা অনেকে পোষণ করে থাকেন। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে ডিপ্রেশনের চিকিৎসা মোটেই জটিল নয়, বরং কিছুটা সময়সাপেক্ষ। প্রথম ধাপের চিকিৎসা রোগ নির্ণয় করা, যাকে আমরা সহজভাবে ডায়াগনোসিস হিসেবে জেনে থাকি। ডাক্তারেরা রোগীর রোগ নিরূপণে রোগ নির্ণয়ে সর্বাপেক্ষা বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এর কারণ সঠিকভাবে রোগ নির্ণিত না হলে চিকিৎসার ফলাফল সন্তোষজনক নাও হতে পারে। রোগ নির্ণয়ের তিনটি ধাপ রয়েছে-
(১) চিহ্ন ও উপসর্গগুলোকে জরিপ করা।
(২) রোগীর শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার সাথে মস্তিষ্ক সংক্রান্ত অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি অথচ ফলপ্রসূ পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলতে পারে।
(৩) পূর্ণাঙ্গ মাত্রায় মানসিক ইতিহাস ও পারিবারিক মানসিক রোগের ইতিহাস জানা এ ক্ষেত্রে জরুরি।
শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলাকালীন সময়ে কিছু ল্যাবরেটরি টেস্টও করানো প্রয়োজন হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ডিপ্রেশনের কারণ হিসেবে রোগ নির্ণয়ের সময় শারীরিক নানা সমস্যা ধরা পড়ে। যেমনÑ এনিমিয়া, থাইরয়েড অসুখ এবং ভাইরাল ইনফেকশন ইত্যাদি এবং এগুলোর প্রভাবে ডিপ্রেশন হতে পারে। কাজেই শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ডিপ্রেশনের চিকিৎসার জন্য খুব বেশি প্রয়োজনীয়। রোগ নির্ণয়ের পরবর্তী ধাপগুলো রোগী কোন প্রকারের ডিপ্রেশনে আক্রান্ত তার সহজ শ্রেণিবিন্যাস এবং চিকিৎসার মাত্রা ঠিক করা। যদি বহির্বিভাগের রোগী হয়ে থাকে, তবে ডাক্তারেরা যেভাবে চিকিৎসা করেন, আন্তঃবিভাগের রোগীদের ক্ষেত্রে ডাক্তারেরা তার চেয়ে বেশি চিকিৎসাপদ্ধতির প্রয়োগ করে থাকেন। আবার ব্যক্তিগত চেম্বারে মানসিক রোগীদের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হলেও তা কিন্তু রোগীর পক্ষে যথেষ্ট উপকারী। এতে তবে রোগী অনেক বেশি সময় ডাক্তারের সঙ্গ পেতে পারেন। এ পর্যায়ে ডাক্তার রোগীর বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ উল্লেখযোগ্য চিহ্নগুলোকে পর্যবেক্ষণ করেন তা হলো-
* রোগীর ওজন বৃদ্ধি সংক্রান্ত বা হ্রাস সংক্রান্ত কোনো বিষয় চিহ্নিত হচ্ছে কি না
* রোগীর রাগ কোন পর্যায়ে থাকে16811411_303
* নিজের বা অন্যের জন্য রোগীর ব্যবহারিক আচরণ ভীতিকর কি না
* রোগীর ব্যক্তিগত যত্ন এবং ডাক্তারের পরামর্শ এবং উপদেশ গ্রহণের মতো যথেষ্ট মানসিক শক্তি আছে কি না
যারা এসব বৈশিষ্ট্যের মধ্যে মোটামুটি সংযত রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু যাদের এর বাইরেও ভীতিকর ও ব্যক্তিগত অসহনীয় আচরণের প্রকাশ ঘটে, তাদের ক্ষেত্রে হাসপাতালে স্থানান্তর হওয়াই বিবেচ্য। এতে করে রোগীকে অধিক মনোযোগের সাথে ডাক্তারেরা পর্যবেক্ষণ করতে পারেন এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসা দিতে পারেন। খুবই স্পর্শকাতর রোগীদের ক্ষেত্রে ডাক্তারের বেশি সময় দিতে হতে পারে।

চিকিৎসার ধারা
তিনটি ধারায় ডিপ্রেশনের চিকিৎসা হতে পারে। প্রথম ধারাটি হলো চিকিৎসা, যা ওষুধ সংক্রান্ত এবং থেরাপি-নির্ভর হতে পারে। দ্বিতীয় ধারাটি হলো চিকিৎসার ধারাবাহিকতা। অর্থাৎ ক্রমগতিশীল অবস্থা এবং তৃতীয় ধারাটি হলো ভবিষ্যতে যাতে এই সমস্যা আবার দেখা না দেয়, সে হিসেবে চিকিৎসাপদ্ধতি প্রণয়ন। সাধারণ ওষুধের মধ্যে অ্যান্টিডিপ্রেশন বা বিষন্নতা বিরোধী ওষুধ দেয়া হয়। ট্রিপটিন, লুডিওমিল, সেন্ট্রি, মেরিপ্রামিন ইত্যাদি নামে আমাদের দেশে এ রোগের ওষুধ পাওয়া যায়।

লেখিকা : সহযোগী অধ্যাপিকা, ফার্মাকোলজি অ্যান্ড থেরাপিউটিক্স, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ।
চেম্বার : দি বেস্ট কেয়ার হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ২০৯/২, এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা।

ছবি: অনিরুদ্ধ দাস ও গুগল