ঢাকা আমার ঢাকা

লাজ্বাতুল কাওনাইন

গ্রাম অথবা শহর তবু আবার সেটার ভিতর কোনটা আপন বা পর এমন কিছু লিখতে গেলেই আমার ভিতর একটা অস্থিরতা কাজ করে। আসলেই তো কোনটা আমার শহর অথবা গ্রাম বা কোনটা আমার সবচেয়ে প্রিয়। অমীমাংসিত অনুভূতির মতো। কোন শহরে জন্মেছি, কোনো শহরে থেকেছি, কোনো শহরে চোখ জুড়েছি আর কোনো গ্রামে হয়তো নিজের ছেলেবেলাকে সমস্ত রঙ উজাড় করে এঁকেছি! বলতে বা লিখতে গিয়ে অস্থিরতা টাই স্বাভাবিক বোধ করি।       সরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা বাবার সঙ্গে সঙ্গে বেশ কিছু গ্রাম শহর ঘুরে স্থায়ীভাবে যখন ঢাকাতে এলাম তখন বয়স প্রায় ১০/১১। আবেগ দিয়ে বুঝবার মতো অবস্থা তেমন ছিলো না। আর সেটা ১৯৯০ সাল হবে। উত্তাল ঢাকা। এইটুকুই বুঝেছিলাম। তারপর আস্তে আস্তে বুঝতে শিখলাম। এটা আমার পরিচিত পরিবেশ নয়। সেই গ্রামের মতো আত্মার টানের মানুষ এখানে কম, সেই প্রাচীন মফস্বলের মতো পেয়ারা গাছের দোলনা বা দীঘির জলে সাঁতার কাটানোর মতো জায়গা এখানে পাওয়া যায় না! মানুষেরা শুধু ছুটে আর ছুটে। স্কুল পেরিয়ে কলেজে পড়তে গিয়ে বুঝলাম লোকাল বাস, সিটিং বাস মধ্যবিত্তদের জন্য দারুণ একটা ব্যাপার,স্বল্প ভাড়ায় বহুদূর গন্ত্যবে যাওয়া যায়, সঙ্গে দাঁড়ানো,ঠেলাঠেলি বা জ্যামের কষ্ট খানিকটা সহনশীলতা শিখিয়ে দেয়। এরপর স্নাতকে পড়ার সময় ঢাকাকে বোধহয় হালকা পাতলা ভালবাসা শুরু করে দিলাম। বান্ধবী পেলাম কিছু যারা আজো প্রাণের সঙ্গে মিশে আছে! ওদের সঙ্গে পড়া ফাঁকি দিয়ে চটপটি খাওয়া,লাল মরিচ গুঁড়ো বা তেঁতুলের টক চুরি করা মামার চোখ ফাঁকি দিয়ে,এখানে ওখানে খেতে যাওয়া,ফুটপাত জুড়ে থাকা চুড়ি, আংটি কেনা,খুব গরমে ভাব নিয়ে এসি শো রুম গুলোতে গিয়ে গিফট আইটেম দেখে না কিনে হা হা হিহি করতে করতে বের হয়ে আসা অথবা পাবলিক লাইব্রেরিতে মুভি দেখা। যাতায়াত এর টাকা বাঁচিয়ে বান্ধুবীদের সঙ্গে ঢাকা শহরের এই যে আনন্দগুলো উপভোগ করতাম আর অল্প খানিক করে এর প্রেমে পড়তাম।

এরপর স্নাতকের মাঝামাঝি চলে যেতে হলো পুরাতন ঢাকা। স্বামীর স্থায়ী নিবাস। এই জায়গাটা আমার যেকোনো স্থান থেকে অনেক বেশি প্রিয়, অনেক! কারণ এখানের স্থায়ী মানুষগুলো এত সরল এতো অন্য রকম ভাল যা ঢাকার অন্য কোথাও আমি পাই নি। যদিও সরকারী চিকিৎসক স্বামীর সঙ্গে অন্য শহর বা মফস্বলে আমার থাকা হয়েছে কিন্তু শেষতক সেই প্রাচীন ঢাকার ঘ্রাণ আর এর পুরাকীর্তি আর স্যাঁতসেঁতে সবুজে শ্যাওলা পড়া বা বটগাছ ওয়ালা বসতি আর ঘিঞ্জি রাস্তাগুলো আমাকে দারুণ টানে। আমার শিক্ষকতা জীবনের শুরু যে স্কুলটাতে সেটা বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষা ছিলো। ক্লাসরুম থেকে নৌকা আর মাঝিগুলোকে দেখতাম। পঁচা পানির ঘ্রাণে সবাই নাক ঢাকলেও আমার ঠিক মনে থাকতো না। কখনো বর্ষাকালে ঘাটে দেখেছি লাশ ভেসে আসা। জানি না কার বা কেনো তবু অবাক হতাম হায় রে নদী! তোর কত রূপ!
অনেক শহরে ঘুরেছি! ঢাকার মতো ক্লান্ত শহর ফেলে বার বার পালাবার ইচ্ছেও হয়েছে বৈ কি! হুর! এটা একটা শহর! ধুলা ময়লা জ্যাম গরম ভীড় এতো প্রতিযোগীতা মানুষগুলো পর পর!  তারপরও অন্য কোথাও গিয়ে অস্থির হয়ে আবার ফিরেছে যেনো আমার নিজ ঘরে ফেরা। ঢাকা ছেড়ে অন্য কোথাও খুব বেশিদিন থাকতে আমার কষ্ট হয় কেনো হয় আমি জানি না!
খুব আগ্রহ নিয়ে আমি এর কিছু ইতিহাস পড়েছি! আর নিজের ভিতর একটা গর্ব অহংকার বোধ করেছি যে আমি এমন একটা প্রাচীন বিখ্যাত নামকরা শহরের বাসিন্দা। আমি এইজন্য সৃষ্টিকর্তাকেও ধন্যবাদ দিতে ভুলি না কারণ এটা একটা অনেক বড় প্রাপ্তি! একটু মিলিয়ে দেখলেই বুঝবেন এটা সত্যি কিনা! যে পরিমাণ টানা হেঁচড়া করেছে আমার এই শহরটাকে শাসন করতে পুরো বিশ্ব তাতে একে বিখ্যাত বলা ছাড়া আর কি উপায়! কিছু না কিছু তো ছিলোই এর প্রাণের মাঝে আর আজও সেটা বিদ্যমান কিন্তু দেখতে পাই না আমরা কারণ নিজেরা এর রূপ নষ্টে ব্যাপকভাবে দায়ী! এখন প্রশ্ন শহরটাকে আদৌ কি ভালোবাসি না শুধু নিজ স্বার্থেই থেকে চলেছি….

প্রায় ৭ম শতাব্দী থেকেই ইতিহাস ঘাটলে পাওয়া যাবে ঢাকা শহরের অস্তিত্বের অবস্থান! সেই সময় পাল বংশীয় শাসন এখানে চলতো। তবে ঢাকাসহ বিক্রমপুর জেলা ব্যাপী এর বিস্তৃতি ছিলো। এরপর এখানে তুর্কি আর আফগানীদের হাঁটাচলা শুরু হয়। এর পর ঢাকা আর সোঁনারগা এর শাসক বার ভূঁইয়াদের পরাজিত করে ১৬১০ সালে মুঘলরা ঢাকাকে শাসন করার দায়িত্ব নিয়ে নেয়। তখন থেকে প্রায় ৫০ বছর অবশ্য ঢাকার নাম “জাহাঙ্গীরনগর ” ছিলো!  সেটা ১৬৬০ সালে আবার ঢাকা করা হয়। ১৭৬৫ সালে ব্রিটিশ, ফরাসী আর ডাচ রা বাণিজ্য করতে ছুটাছুটি শুরু করে ঢাকাতেই। ঢাকাতে মুঘলদের নায়েবে নাজিমদের শাসলামলে মীরজাফরের লজ্জানত কার্যকলাপ ঢাকার সম্মানকে কিছুটা হলেও ক্ষুণ্ণ করে। এরপর ব্রিটিশ আমল থেকে পাকিস্তান আমল রাজধানী হিসেবে ঢাকার গুরুত্ব অপরিসীম ছিলো। ১৯৭১ এর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধর  প্রথম আহবান ছিলো ঢাকাতেই রেসকোর্স ময়দানের কোটি মানুষের মাঝে। এই যুদ্ধেও ঢাকার বলিষ্ঠ অবদান ছিলো। কারণ ঢাকাতে ১৯২১ সালে স্থাপিত বিশ্ববিখ্যাত  বিশ্ববিদ্যালয়,” ঢাকা  বিশ্ববিদ্যালয়” আর এখানকার সাহসী ছাত্র আর শিক্ষকদের থেকেই ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ এর আন্দোলনগুলো আমাদের বিজয়ের পিছিনে একটা বড় ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৮২ সাল পর্যন্ত ঢাকাকে Dacca এই ভাবে লিখা হতো, পরবর্তীতে এটা স্থায়ীভাবে Dhaka লিখা হয়!

যাক ইতিহাস পড়তে আসলে তেমন মজা লাগে না তবু বললাম। হালকা ইতিহাস জানাটা উচিৎ কারণ শিকড় না বুঝলে গাছটাকে ভালবাসা যায় না, তখন অবহেলাতে গাছ মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে। অনেক অভিযোগ আছে এই প্রিয় শহরকে নিয়ে আমার। অতিরিক্ত জনসংখ্যা। ফুটপাতের দখলদারি। মানুষের ছিন্নভিন্ন জীবন যাবন রাস্তায় ফুটপাতে,অসহ্য নোংরা দুর্গন্ধ, অনিয়ম ট্রাফিক যান আর জ্যাম। দালালদের পদচারণায় অস্থির হাসপাতাল বা আইনবিভাগ।  মূল্যের যা ইচ্ছে তাই প্রয়োগে অস্থির সকল ঢাকা বাসী। নিত্য নতুন অসুখে অসুখী প্রায় মুখগুলো কেমন মুখোশ এঁটে চলা। তবু তবু ভোরের কাক ডাকাটা আমার ভাল লাগে। যানবাহনের আওয়াজ আসবার আগে নরম বাতাসের ঢাকার ভোর আমার খুব প্রিয়। কড়া দুপুরে ফুটপাতে চলার পথে আখের এক গ্লাস শরবৎ বা টঙ্গ এ বসে চা খেতে বড্ড ভাল লাগে। বেলা শেষে ক্লান্তি নিয়ে ঘরে ফিরতে সেই আনন্দ হয়! ঢাকা শহর ঘুমাই ই না বলতে গেলে তবু ছোট বারান্দাতে নিয়নের আলোর অদ্ভুত বিচ্ছুরণ যখন এসে পড়ে, ইচ্ছে হয় কিছু লিখে ফেলি আমার প্রাণের শহর টাকে নিয়ে। গভীর রাতে খুব মন চায় রাস্তায় ঘুরি। দেখি ক্লান্ত শ্রমিক কিভাবে টুকরিতে ভাঁজ হয়ে ঘুমুচ্ছে অথবা পতিতা মেয়েটি সেজেগুজে দাঁড়িয়ে আছে…তবু ঢাকা ছাড়ে না কারণ কোথাও না কোথাও, কোন না কোনো ভাবে ঢাকা তাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। প্রচন্ড ঘৃণা আর ভালবাসার অদ্ভুত এক আলোড়িত ঢাকাতে আমরা শ্বাস নিতে ভালবাসি। হোক সেখানে কার্বন ডাই অক্সাইড বা সীসার পরিমাণ বেশি আর অক্সিজেন কম তবু ভালোবাসি, খুব ভালবাসি!

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box