ঢাকা কিভাবে শিশুবান্ধব নগর হবে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ডঃ মাতলুবা খান
প্রভাষক, কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়

এক.

. ভেবে বলুন তো, আপনার শৈশবের সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি কী?

 স্কুলের মধ্যাহ্ন বিরতিতে তড়িৎ টিফিন সেরে স্কুলমাঠে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে গোল্লাছুট, বউ-চি, ফুটবল খেলা, বড় গাছটার নীচে বাড়ী থেকে লুকিয়ে নিয়ে আসা গল্পের বইটা পড়া নাকি স্কুলশেষে পাড়ার গলিতে বা ছোট্ট পতিত জমিতে ক্রিকেট, ছুটোছুটি, লুকোচুরি; অথবা শীতকালে গলিতে ব্যাডমিন্টনের কোর্ট?

 এবার ভাবুন তো এখনকার শিশু-কিশোরদের কথা, আপনার সন্তান বা ভাগ্না-ভাগ্নী, বন্ধুর সন্তান  বা নাতি-নাত্নীর কথা। কেমন যাচ্ছে ওদের শৈশব?

 ওদের কি স্কুলে খেলার জায়গা আছে? বিরতিতে কতক্ষণ খেলার সুযোগ পাচ্ছে ওরা? বৃষ্টি হলে বিরতিতে ওরা কী করে? স্কুল থেকে ফিরেই বা কী করে আজকালের শিশুরা? স্কুলের বাইরে ওদের বন্ধু কারা? কী করে তাদের সঙ্গে?

আমার ধারণা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উপরের প্রশ্নগুলোর উত্তর হবে –

এক. নাহ, বেশির ভাগ স্কুলে পর্যাপ্ত খেলার জায়গা নেই, ইংরেজী মাধ্যম অনেক স্কুল চলে ভাড়া করা বাসায়, খেলার জায়গা বলতে গাড়ীবারান্দা বা ছাদ। যে সব স্কুলে মাঠ আছে সেইরকম অনেক স্কুলে বিরতিতে বাইরে খেলার অনুমতি নেই।

দুই. রোদ-বৃষ্টির পার্থক্য নেই কোন, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে শিশুরা ঋতুপরিবর্তন বা জলবায়ু পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পায় না

তিন.  স্কুল থেকে ফিরেও বাইরে খেলতে যাওয়ার সুযোগ পায় না অনেক শিশু, অনেকের সময় কাটে টিভি দেখে বা মোবাইল-ট্যাবে ইউটিউবে।

চার. স্কুল-বাসার বাইরে শিশুদের গন্ডি সীমিত, হাঁটা দূরত্বে নেই কোন খেলার জায়গা আর তাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিজ এলাকায় অন্য শিশুদের সঙ্গেও খেলাধূলার সুযোগ নেই।

উপরের চারটা দৃশ্যকল্পের মধ্যে অন্তত দুইটা ঢাকা শহরের উচ্চ থেকে নিম্নমধ্যবিত্ত শিশুদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, আমার পরিচিত গন্ডীতে অনেক শিশুর জন্য উপরের চারটাই সত্য। নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা এদিক থেকে ভাগ্যবান, গবেষণা বলে দিল্লীর নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা পার্শ্ববর্তী মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের চেয়ে তিনগুণ বেশি সৃজনশীল খেলাধূলা করে, এই ‘ফ্রি প্লে’ শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আমাদের সময়ে খেলার অনেক উপকরণ ছিল না, ক্রিকেট বলটা যার সে বড়জোর একটা ওভার বেশি ব্যাট করার সুযোগ পেতো। কিন্তু খেলার সময়-সুযোগ হয় তো একটু বেশি ছিলো, অনেকের ক্ষেত্রে একা একা পাড়ায়-মহল্লায় ঘুরে বেড়ানোর, ‘এক্সপ্লোর’ করার অনুমোদন ছিলো। এখনকার অনেক উচ্চ/নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুদের কাছে এখন খেলাধূলার সামগ্রী আছে প্রচুর, কিন্তু সেই সামগ্রী ব্যবহারের স্থান নেই, আছে খেলাধূলা করার সঙ্গীর অভাব। আমার সাত বছরের ভাতিজা সেদিন তার বাবার কাছে আবদার করছে, ‘বাবা, আমাকে একটা খেলার মাঠ এনে দিবা? বল দিয়ে খেলবো।’

বাংলাদেশের শহরগুলোতে শিশুদের বিচরণ বা খেলাধূলার জন্য পরিমিত খোলা জায়গা, পার্ক বা খেলার জায়গা নেই। অনিয়ন্ত্রিত /অপরিকল্পিত নগর উন্নয়নের কারণে খোলা জায়গার পরিমাণ কমছে আশঙ্কাজনকভাবে। মাটির সঙ্গে শিশুর সংযোগ কমেছে, দূরত্ব বেড়েছে। রাজউকের ইমারত নির্মাণ বিধিমালা বহুতল ভবনে গাড়ী পার্কিং এর জন্য প্রয়োজনীয় স্থানের নির্দেশনা দেয়, কিন্তু সেই ভবনের শিশুদের শরীর-মনের বিকাশের জন্য অত্যাবশ্যকীয় খেলাধূলার জায়গা রাখার কথা বলে না।  বাবা-মা বা কোন প্রাপ্তবয়স্ক দেখাশোনাকারীর নজরদারির বাইরে শিশুদের স্বাধীনভাবে বিচরণের ক্ষেত্র ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। গত ত্রিশ বছরে রাস্তায় গাড়ীর সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ, এবং প্রতিবছর সংখ্যা বাড়ছেই। ফলে বাবা-মায়েরা অনেক ক্ষেত্রেই নিরাপত্তাজনিত কারণে শিশুদের একা বাইরে যেতে দেন না, ঘরে বসে টিভি দেখা বা কম্প্যুটার/ট্যাব্লেট চালানোকে নিরাপদ ভাবছেন। ঠিক কত বছর বয়সে আপনি একা মোড়ের দোকান থেকে তেল বা চিনিটা কিনে এনেছেন? একই বয়সে শিশুরা হয় তো মোবাইল বা ট্যাব চালানোতে অনেক পারঙ্গম হয়ে উঠছে, ম্যাসেঞ্জারে নানা কারিকুরি করে চমকে দিচ্ছে বাবা-মাকে। কিন্তু এই যে ‘সেডেন্টারী’ জীবনধারা, শিশুদের স্বাস্থ্য আর শিক্ষায় এর প্রভাব কতখানি মারাত্মক বাংলাদেশ বা ঢাকা শহরের প্রেক্ষিতে তা আমরা এখনো ঠাহর করে উঠছি না!

শিশুদের বাইরে সময় না কাটানো, পরিমিত মাত্রায় ‘ফিজিক্যাল এক্টিভিটি’ বা শারীরিক কসরত না করা আর সেই সঙ্গে ফাস্টফুড কালচারের কারণে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বেড়েছে অনেক। ২০১৩ সালে এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে শহরাঞ্চলে প্রতি একশ শিশুর মধ্যে ৪ জন ভুগছে স্থূলতায় এবং ১০ জন অতিরিক্ত ওজনের । আর ঢাকা শহরে এই সংখ্যা যথাক্রমে ৭ ও ১৪ শতাংশ। স্থূলতা ও অতিরিক্ত ওজনের শতকরা সত্তর ভাগের বয়স ৫ থেকে ১২ বছর। বাকি ৩০ ভাগের বয়স ১৩ থেকে ১৮ বছর। স্থুলতার সঙ্গে রয়েছে হৃদরোগ, কর্কটরোগ, কিডনীসমস্যা ইত্যাদি যাদেরকে বলা হয় ‘লাইফস্টাইল ডিজিজ’, অর্থাৎ শুধুমাত্র জীবনযাপনের ধারা পরিবর্তনের মাধ্যমেই এইসব রোগ প্রতিরোধ সম্ভব। পর্যাপ্ত রোদের আলো গায়ে না লাগায় অনেক শিশুর মধ্যে দেখা দিচ্ছে ভিটামিন ডি এর অভাব। একই কারণে শিশুদের মধ্যে বাড়ছে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি, এমনকি আত্মহত্যা করার প্রবনতা পর্যন্ত। বাংলাদেশের মতো একটা গ্রীষ্মমন্ডলীয় দেশে শিশুদের ভিটামিন ডি এর অভাব আমাকে বিস্মিত এবং আতংকিত করে।

অথচ পর্যাপ্ত খেলাধূলা ও বিনোদনের সুযোগ একটা শিশুর আইনগত অধিকার। এই অধিকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে বিবৃত রয়েছে। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের মোট ৫৮টি ধারায় জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকল শিশুর নাগরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অধিকারের কথা এবং শিশুদের এইসব অধিকার সুনিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের কী করণীয় তা বিস্তারিতভাবে বলা আছে। ১৯৮৯ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এই সনদ পাশ করা হয়, ১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বরে এটি আন্তর্জাতিক আইনের অংশে পরিণত হয়। আমাদের জন্য আপাত আনন্দের বিষয় যে, প্রথম যে ২০ টি দেশ এই চুক্তি স্বাক্ষর ও অনুমোদন করে বাংলাদেশ তার মধ্যে একটি। ২০১১ সালে বাংলাদেশ সরকার জাতীয় শিশুনীতি প্রণয়ন করে যার উদ্দেশ্য বৈষম্যহীনভাবে সকল শিশুর অধিকার নিশ্চিত করা।

কিন্তু এই নীতির প্রণয়ন কোথায়?

দুই.

এই লেখাটার এইটুকু পর্যন্ত লেখা হয়েছিলো এই বছর ফেব্রুয়ারী মাসে।

শহর এবং শহরতলীতে শিশুরা তখনো স্কুলে যায়, টিফিন পিরিয়ডে কলম দিয়ে বন্দুক বানিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলে অথবা খেলে না, মোবাইলের বা এক্সবক্সের নতুন কোন গেইম নিয়ে গল্প করে; তখনো তারা প্রকৃতির কাছাকাছি না যেতে পারলেও সমবয়সীদের সঙ্গ থেকে বঞ্চিত ছিলো না। মার্চ মাসের আট তারিখে প্রথম কোভিড রোগী সনাক্ত হওয়ার পর ১৭ই মার্চ থেকে সরকার ঘোষিত ছুটিতে বন্ধ আছে বাংলাদেশে সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কয়েক দফায় ছুটি বাড়ানো হয়েছে ৩রা অক্টোবর পর্যন্ত। ছয়মাসের অধিক সময় ধরে একঘরে জীবন কাটাচ্ছে শহরের শিশুরা। কিন্তু উপরের আলোচনা-ই বলে দেয় এই বন্দীত্ব তাদের কাছে নতুন নয়।  কোভিড আসার আগেও ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো বড় শহরে বেশির ভাগ শিশুর ঘরের বাইরের সময় ছিলো সীমিত, একজন কয়েদীর থেকেও কম সময় আমাদের শিশুরা খোলা হাওয়ায় কাটানোর সুযোগ পায়।

মহামারীতে স্কুল বন্ধ হওয়ায় শহরের উচ্চ/নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে বাচ্চাদের আপাতভাবে পরিবর্তন হয়েছে মূলত দুটো জায়গায়, এক. বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে না দুই. অনলাইন /টিভিতে সম্প্রচারিত ক্লাশের বদৌলতে স্ক্রিন-টাইম বেড়েছে। মোবাইল-ট্যাব্লেটে আসক্ত শিশু-কিশোরকে এই ক্রাইসিস আরো একটু বেশি সময় টেলিভিশন বা কম্প্যুটারের সামনে বসে থাকার বৈধতা দিয়েছে। কিন্তু এর ফলে অনেকের মধ্যেই বেড়ে যেতে পারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার, ভিডিও গেইম বা নীলছবির প্রতি আসক্তি। ইতোমধ্যে গড়ে ওঠা ‘সেডেন্টারী’ জীবনধারা প্রকট আকার ধারণ করাটাই স্বাভাবিক। এর ফলে আরো বেশিহারে বাড়তে পারে স্থুলতা আর অতিরিক্ত ওজন যা ডায়াবেটিস, হৃদরোগ আর ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াবে। বন্ধু বা আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগের অভাব, অনিরাপত্তার বোধ, অনিশ্চয়তা, অনেক পরিবারের এক বা একাধিক অভিভাবকের উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি শিশুদের মনের মধ্যে তৈরি করতে পারে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত।

এই সব কিছুই কি আমাদের শহরের শিশুদের চিরাচরিত সমস্যাগুলোর দিকেই ইঙ্গিত করছে না? আমাদের শহরগুলো শিশুবান্ধব হলে কি আমরা এই মহামারীতে সৃষ্ট সমস্যাগুলোর মোকাবেলায়, শিশুদের শারীরিক-মানসিক সুস্থতার নজরদারিতে প্রস্তুত থাকতাম, আরো একটু সজাগ হতাম?

লকডাউনের সম্পূর্ণ সময় যুক্তরাজ্যে শিশুদের খেলার জন্য নির্ধারিত জায়গাগুলো নিরাপত্তাজনিত কারণে বন্ধ থাকলেও পরিবারের সকল সদস্যদের দিনে একবার খোলা জায়গায় হাঁটা/দৌড়ানো/সাইকেল চালানো বা শারীরিক ব্যায়ামের অনুমতি ছিলো। লকডাউনের প্রথম ছয় সপ্তাহ স্পেনের শিশুদের ঘরের বাইরে যাওয়ার অনুমতি না থাকলেও জনগণের চাপে তা শিথিল করে দিনে একবার বাইরে বের হওয়ার অনুমোদন দেয় সরকার। এই দুই ক্ষেত্রেই একটা বড় কারণ ছিলো শিশুদের ওয়েল-বিইং অর্থাৎ ভালো থাকা। ঢাকা শহরের শিশুদের বাইরে যাওয়ার অনুমতি মিললেও সুযোগ কি ছিলো হাঁটা দূরত্বে কোন খোলা জায়গায় গিয়ে প্রাণভরে নিশ্বাস নেওয়ার?

নাহ, ছিলো না।

অথচ খোলা জায়গায়, প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটানোর রয়েছে নানাবিধ উপকারিতা। প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ একটা শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য জরুরী, তার মেধাগঠনে নিয়ামক। বেলজিয়ামে করা খুব সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, শহরের বিভিন্ন মহল্লার সবুজ বা প্রাকৃতিক জায়গার পরিমাণ শিশুর বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।একটা মহল্লায় সবুজের পরিমাণ মাত্র তিন শতাংশ বাড়ানো হলে, সেই মহল্লার শিশুদের আইকিউ বাড়তে পারে ২ পয়েন্টের উপরে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কিছু গবেষণার ফলাফল ইঙ্গিত করে, মহল্লায় বা স্কুলের চারপাশের সবুজের পরিমাণ শিশুদের পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের অন্যতম কারণ। শিশুদের বাইরে সময় কাটানো, ফিজিক্যাল এক্টিভিটি বা শারীরিক কসরতে ব্যয় করা সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত খোলা জায়গার প্রাপ্যতা, প্রবেশগম্যতা, বাসস্থান থেকে খোলা জায়গার দূরত্ব এবং তার মনোরম নকশায় অনেক ধরনের খেলাধূলার সুযোগ, অনেকভাবে সময় কাটানোর বন্দোবস্ত রয়েছে।

কোন একটি এলাকার সকল অধিবাসীদের বাইরে খেলাধূলা নিশ্চিত করতে প্রতি ১০০০ জনে ৬ একর জায়গার প্রয়োজন, শিশুদের খেলাধূলার জন্য জায়গা দরকার তার বাসা থেকে ১০০ মিটার হাঁটা দূরত্বে। পরিসংখ্যানের সাহায্য ছাড়াই বলা যায় আমাদের বড় শহরগুলোতে সেই ব্যবস্থা নেই। কিন্তু এর নিরাময় কী তা নিয়ে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট। শিশুঅধিকার সনদ স্বাক্ষরের ৩০ বছর পূর্তিতে আমাদের অর্জন এবং করণীয় সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তার, গবেষণার এবং বিশদভাবে আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাব কি আমাদের এখন নতুন করে এই পুরনো ব্যাপারগুলো নিয়ে ভাবাচ্ছে? সরকারঘোষিত লকডাউনে কিছুসময় বন্দীত্বে কাটানো নগরবাসী কি এখন ভাবতে শুরু করেছে কেমন যাচ্ছে শিশুদের জীবন? নাকি আপিস-আদালত খুলতেই আমরা ভুলতে বসেছি গত ছয় মাসের অধিক সময় ধরে শিশুদের সীমিত গন্ডি আরো ছোট হয়ে গেছে?

শিশুদের জীবনযাপনের মানোন্নয়ন, তাদের খেলাধূলার সুযোগ এবং সার্বিক বিকাশের জন্য প্রয়োজন আমাদের শহরগুলোকে শিশুবান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তোলা। এর জন্য সরকারী উদ্যোগে এবং সরকারী-বেসরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকাকে এবং একই সঙ্গে অন্য শহরগুলোকে শিশুবান্ধব নগর উদ্যোগের আওতায় আনা যেতে পারে।

শিশুবান্ধব শহর শিশুদের অধিকারের (জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী) সামাজিক এবং স্থানিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে তাদের জীবনের মানোন্নয়নের জন্য  ইউনিসেফ এর একটা উদ্যোগ। যে শহর, নগর বা সম্প্রদায়ের সার্বিক পরিকল্পনায় এবং নীতি-নির্ধারণের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ শিশুদের মতামত, প্রয়োজন এবং অধিকারচিন্তা, বাস্তবিকভাবে সেই শহরই শিশুবান্ধব শহর। শহরকে সকলের জন্য বাসযোগ্য করে তোলার লক্ষ্যে ইউনিসেফ এবং ইউএন-হেবিট্যাট ১৯৯৬ সালে এই উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে যেসব প্রতিষ্ঠান (স্থানীয় ও আঞ্চলিক সরকার, বেসরকারী সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাণ, গণমাধ্যম এবং সর্বোপরি শিশু) তাদের শহরকে শিশুবান্ধব করতে চায়, তাদেরকে একটা নেটওয়ার্কের সুবিধা দেয়। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কোন শহর বা প্রতিষ্ঠান শিশুবান্ধব শহর গঠনের জন্য অনেক উপকারী তথ্য-উপাত্ত-নির্দেশনা পেতে পারে।

তিন.

ঢাকাকে শিশুবান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় শিশুদের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া হবে এরকম ঘোষণা এসেছে রাজউক কর্তৃপক্ষ থেকে যা খুবই ইতিবাচক। বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার পাশাপাশি অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা প্রয়োজন, আর সেইসব অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনায় দরকার শিশুদের যথাযথ অংশগ্রহণ। জায়গার স্বল্পতার সমাধান পাওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু সেই স্বল্প জায়গায় কীভাবে শিশুদের খেলাধূলার ব্যবস্থা করা যায় তার জন্য দরকার এলাকাভিত্তিক কার্যক্রম, এলাকার শিশুদের নিয়ে। শিশুদের অংশগ্রহণ যেন কোনভাবেই আলঙ্কারিক না হয়, কর্মশালার চাকচিক্য ও নামীদামী ব্যক্তিদের আগমনের আয়োজনে যেন ঢেকে না যায়। তার আসল উদ্দেশ্য হওয়া চাই- শিশুরা কী চায় তা সত্যিকার জানতে চাওয়া ও তার প্রয়োগের উপায় বের করা। আর তার জন্য দরকার সকল স্তরের, বয়সের, দক্ষতার শিশুদের অংশগ্রহণ। শিশুদের অংশগ্রহণ নিয়ে কাজ করা অভিজ্ঞ গবেষকগণকে (শিশু মনোবিজ্ঞান, শিশুস্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্থাপত্য, ল্যান্ডস্কেপ স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনা) কাজে লাগাতে হবে, তাদেরকে কাজ করতে হবে শিশুদের সঙ্গে। একই সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে নগরের অধিবাসীদের, পিতা-মাতা, শিক্ষক ও অভিভাবকদের। শহর গঠনের পেশাজীবীরা (স্থপতি, ল্যান্ডস্কেপ স্থপতি ও পরিকল্পনাবিদ) যখন গবেষকদের সঙ্গে কাজ করবেন, কাজ করবেন এলাকার মানুষ ও শিশুদের সঙ্গে, তাদের মতামতকে নগর পরিকল্পনা ও নকশায় রূপান্তরের প্রচেষ্টা করবেন, তখনই কেবল শহরের বর্তমান অবস্থার নিরিখে বাস্তবভিত্তিক সমাধান তৈরি করা সম্ভব।

চার.

 এখন ভাবুন কেমন হতে পারে একটা ঘনবসতিপূর্ণ শহরে শিশুবান্ধব এলাকার রূপ?

ডেনমার্কের স্থপতি ইয়ান গেল একবার এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘যে শহরে শিশুদের নির্বিঘ্নে একা একা ঘোরাফেরা করতে দেখতে পাবে, বুঝে নিবে সেই শহরের নকশা শিশুবান্ধব।’ ঢাকা শহরকে অমন জায়গায় নিয়ে যেতে অনেক বড় স্কেলের পরিবর্তন প্রয়োজন, তার বাস্তবায়নে সময়ও প্রয়োজন অনেক। এই ম্যাক্রো স্কেলের পরিবর্তনের পাশাপাশি আমরা ছোট স্কেলের পরিবর্তন বা ‘মাইক্রো ইন্টার্ভেনসান’ নিয়ে ভাবতে পারি, যা অল্প সময়ে অল্প রিসোর্স নিয়ে বাস্তবায়ন করা যায়।

আসুন একটা ছোট্ট এক্সারসাইজ করি, একটু ভাবি, আমরা নিজ নিজ এলাকাকে শিশুবান্ধব করার প্রচেষ্টায় ছোট কী পরিবর্তন আনতে পারি।

ঘর থেকেই শুরু করা যেতে পারে সেই যাত্রা, শিশুদের নিয়ে কি দক্ষিণমুখী বারান্দায় সবজি চাষ করা যায়? কেউ হয় তো দেখবেন বারান্দায় পাশের ভবনের ছায়া এসে পড়ছে, গাছ বাড়ছে না? আচ্ছা তাহলে ছাদবাগান করা যায় সীমিত আকারে?  এলাকায় কি কোন পতিত জমি আছে  যা অনেক দিন ব্যবহার হচ্ছে না? ওই জমিতে কি একটা ‘মোবাইল’ গার্ডেন করে ফেলা যায় অভিভাবক আর শিশুরা মিলে? ওখানে অন্য কাজের সম্ভাবনা দেখা দিলে সেই মোবাইল বাগানটাকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নিতে যেন বেগ পেতে না হয়।

এখন সেই মোবাইল বাগানে শিশুরা যেন সহজেই নিজে নিজে যেতে পারে তার জন্য কী করা যেতে পারে? – শিশুবান্ধব প্রশস্ত ফুটপাত, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ফুটপাত, এলাকার ভিতরে গাড়ির গতিসীমা কমানো ইত্যাদি ব্যবস্থার কথা ভাবা যায়। বড় পার্কের জায়গার অভাবে এলাকায় কি পকেট পার্ক করার সুযোগ আছে? আর এলাকার স্কুলের মাঠ, স্কুলের সময়ের বাইরে কি তা খুলে দেওয়া যায় এলাকাবাসীর জন্য? আর তাও যদি না থাকে বাসার সামনের রাস্তাটুকু আছে। শিশুরা বরাবরই রাস্তায় খেলাধূলা করেছে, কানাগলি ক্রিকেট খেলার পীচে রূপান্তর হয়েছে কত, রাস্তায় গাড়ীর সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে শিশুদের স্থান হয়েছে ঘরের ভিতরে, টেলিভিশনের সামনে (এই শহর গাড়ি দাঁড়ানোর জন্য ঠিক জায়গা বের করে দিবে, শিশুদের খেলাধূলার জন্য ক্বচিৎ নয়)।

এইসব রাস্তা শিশুদের ফিরিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে। সপ্তাহে একদিন কি আমরা একটা রাস্তায় গাড়ীর চলাচল বন্ধ করে শিশুদের খেলার জন্য উন্মুক্ত করে দিতে পারি না?

ইংল্যান্ডে রাস্তাকে খেলাধূলার জন্য শিশুদের কাছে উন্মুক্ত করে দেওয়ার উদ্যোগে প্লে-স্ট্রিট নামে পরিচিত। ইংল্যান্ডের বৃস্টল শহর থেকে ২০০৯ সালে অভিভাবকদের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ- এই উদ্যোগে নগরকর্তাদের অনুমতিক্রমে কোন একটা আবাসিক এলাকার একটা রাস্তাকে সপ্তাহ বা মাসে কোন একদিন শিশুদের খেলাধূলার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এলিস ফার্গুসন ও এমি রোজের এই আইডিয়া এখন বৃস্টল ছাড়িয়ে যুক্তরাজ্যের নানান শহর এমনকি ইয়রোপেও ছড়িয়ে পড়েছে। প্লে-স্ট্রিট বা রাস্তায় খেলাধূলোর সুযোগের বাস্তবায়নের জন্য অনেক বড় ধরনের পরিবর্তনের দরকার নেই, অভিভাবকদের উদ্যোগে কোন খরচ ছাড়াই খুব সহজে বাস্তবায়ন করা যায়, এর জন্য প্রয়োজন নেই দামী খেলনা বা খেলার সামগ্রী, অভিভাবকদের উপস্থিতিতে পাড়া-মহল্লার সকল শিশু যেমন খুশী তেমন খেলতে পারে তাদের বাসার সামনের রাস্তায়। এমন কি করোনার সময়েও সহজেই বাস্তবায়ন সম্ভব, যেখানে শিশুরা সামাজিক/শারীরিক দূরত্ব (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সরকার নির্দেশিত ২ মিটার দূরত্ব) বজায় রেখে খেলতে পারবে রাস্তায়। এই সময়ে এই রকমের উদ্যোগের আরো বেশি প্রয়োজন যখন শিশুরা খুবই একাকী সময় পার করছে। এর মাধ্যমে এলাকার শিশুদের এমনকি অভিভাবকদের মধ্যেও হৃদ্যতা বাড়তে পারে, ‘কমিউনিটি স্পিরিট’ তৈরী হতে পারে। কমিউনিটি স্পিরিট নগরবাসীকে নিজ এলাকার উন্নয়ন সাধনে এগিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত করতে পারে।

প্লে-স্ট্রীট কেবল একটা উদাহরণ। শিশুদেরকে সঙ্গে নিয়ে পেশাজীবী এবং গবেষকরা কাজ করলে বের হয়ে আসবে আরো উদ্ভাবনী আর সৃষ্টিশীল নানা সমাধান। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সমস্ত শহরের পরিকল্পনা আর নকশার পাশাপাশি প্রতিটা এলাকাভিত্তিক নকশা নিয়ে কাজ করলে শিশুবান্ধব নগরের স্বপ্ন দুরূহ থাকবে না। তবে এর বাইরেও সর্বস্তরের জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে, নিজেদের অধিকার আর শিশুদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে রাষ্ট্রের সঙ্গে একযোগে কাজ করতে হবে। মহামারীকালে আমরা হৃদয়ঙ্গম করেছি আমাদের দুর্বলতার জায়গাগুলো, আমাদের শক্তির জায়গাগুলোও। অনেক কিছুর ক্ষেত্রেই আসছে ইতিবাচক পরিবর্তন। আমরা বুঝতে পারছি, আমরা যেসময়টাতে বেঁচে ছিলাম সেখানে আর ফিরে যাওয়া যাবে না,  নতুন ‘নরমাল’ তৈরির সময়ে আমরা নতুন করে ভাবছি আমাদের ভবিষ্যত নিয়ে। অতীতের ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি না করে গবেষণালব্ধ জ্ঞান আর ভালো উদাহরণের মূল্যায়নের নিরিখে শিশুদের সঙ্গে নিয়ে শিশুবান্ধব শহর তৈরীর আন্দোলন আমাদের শুরু করতে হবে।

এই সময়ও যদি সমাজে শিশুদের অবস্থান এবং ওদের অধিকার সম্পর্কে আমাদের সচেতন না করে, সচকিত না করে, তবে কবে আসবে সেই দিন? কবে!

লেখক: নগরনকশা বিষয়ক প্রভাষক, কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য

ছবি: গুগল

 

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]