তসলিমা নাসরিন ও একটি নিঃসঙ্গ বিড়াল

সর্বশেষ নিজের ফেইসবুক পেইজে তিনি নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে লিখেছেন। তিনি লিখছেন, ‘আরো সাত ঘণ্টা বাদে এ শহর উৎসব করবে নতুন বছরের। আমার কাছে আজ এবং কালে কোনও পার্থক্য নেই। বছরের শেষ দিন বা বছরের প্রথম দিন আমার কাছে যে কোনও দিনের মতোই দিন। আমরা হিসেব রাখার সুবিধের জন্য ক্যালেণ্ডার তৈরি করেছি। তবে যারা নববর্ষে আনন্দ করে, তাদের দেখতে আমার ভালো লাগে। যে কোনও আনন্দ, যে কারও আনন্দই চমৎকার।’    

কিন্তু তার যে কোনো মন্তব্যের সঙ্গেই যুক্ত থাকে ‘বিষ্ফোরক’ শব্দটা। হ্যাঁ, বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত নারীবাদী লেখক তসলিমা নাসরিনের কথাই বলছি। প্রায় দুই যুগের বেশি সময় বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত তিনি। এখন আছেন ভারতের দিল্লী শহরে।

খবরের শিরোনাম তিনি। একদিন নিজের স্বরতন্ত্রীতে অসুখ নিয়ে হাসপাতালে গেলেন,খবর ছাপা হলো, ‘বোবা হয়ে গেছেন তসলিমা নাসরিন’। ‘sexism’ শব্দটা ফেইসবুকে লিখেও যৌনতার বিভ্রমে তিনি।

তসলিমা নাসরিন দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আপোষহীন নারীবাদী লেখক। লিখে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন আবার বিতর্কিতও হয়েছেন। নারীর অধিকারের কথা বলতে গিয়ে তিনি শুধু ধর্মীয় মৌলবাদীদের আক্রমণের শিকার হননি, গোটা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। বিতাড়িত হয়েছেন নিজ বাসভূমি থেকে। তার পাঁচটি বইও বাংলাদেশ সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন।

তসলিমা প্রচুর পুরস্কার এবং সম্মান অর্জন করেছেন। সাহিত্যের জন্য দু’বার পেয়েছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আনন্দ পুরস্কার। ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট থেকে মুক্তচিন্তার জন্য শাখারভ পুরস্কার, সহিষ্ণুতা ও শান্তি প্রচারের জন্য ইউনেস্কো পুরস্কার, ফরাসি সরকারের সিমোন দ্য বোভোয়া মানবাধিকার পুরস্কার। বেলজিয়াম এবং ফরাসি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারবার সাম্মানিক ডক্টরেট। 

একাই আছেন তসলিমা নাসরিন। সুইডেনের পাসপোর্টধারী তসলিমা নাসরিন ভারতের ভিসা নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে দিল্লিতেই বসবাস করেন। বেশ কয়েক বছর ছিলেন তিনি সুইডেনে। সেখান থেকে আবার উড়াল দিয়ে ভারতে। আলোচিত এবং সমালোচিত তসলিমা নাসরিনের ভেরিফাইড ফেইসবুক পেইজের কভার ফটোতে একটা ছবি দেয়া আছে। তারই খোলা ল্যাপটপের সামনে বসে আছে একটি একাকী বিড়াল। ছবিটা দেখে হঠাৎ এমন ভাবনা মনে উঁকি দিতেই পারে-নিঃসঙ্গ বিড়ালটাই কি নির্বাসিত এই লেখিকার নিয়তি হয়ে বসে আছে ল্যাপটপের সামনে? হয়তো ছবির এই বিড়ালটি তার প্রভুর মতোই একা। বিড়ালটির জন্ম হয়তো সে-দেশেই। সে অর্থে বিড়ালটির আছে দেশ। কিন্তু তসলিমা নাসরিনের?

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো আলোচিত, সমালোচিত তসলিমা নাসরিন।

কিছুদিন আগে নিজের ছবিতে ‘sexism still exists’ ক্যাপশন দিয়ে আলোচনায় উঠে এসেছিলেন তসলিমা নাসরিন। তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে পোস্ট করা এই ছবি এবং ক্যাপশন নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছিলো বাংলাদেশ এবং কলকাতার কিছু গণমাধ্যম।কিন্তু ঝামেলা অথবা আলোচনার শুরু সেখানেই। গণমাধ্যমে লেখা হয়েছে,  ‘sexism still exists’ কথাটার মানে ‘লিঙ্গবৈষম্য এখনও টিকে আছে’। কিন্তু ‘sexism’ শব্দটিকে প্রায় সবগুলো পত্রিকা ‘যৌনতা’ (sex) ভেবে ভুল করেছে এবং সেই অনুযায়ী সংবাদ প্রকাশ করেছে।

এমন ঘটনায় সোশ্যাল সাইটে বেশ হাস্যরসের জন্ম হয়। খোদ তসলিমা নাসরিন একটি ব্যাঙ্গাত্বক স্ট্যাটাস দিয়েছেন ফেসবুকে। তসলিমার স্ট্যাটাসটির কিছু অংশ হুবহু তুলে ধরা হলো এখানেঃ

‘হায় হায় কই যাই! বাঙ্গালিরা সেক্সিজমের অর্থ জানে না। গতকাল একটি ফটো পোস্ট করেছি ফেসবুকে। ওই ফটোটি ২০০৪ সালের, আমি যখন আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেলোশিপ করি তখনকার। ল্যাংডন স্ট্রিটে, যেখানে আমার ফ্ল্যাট ছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে হার্ভার্ডের কেনেডি স্কুলে যেখানে আমার অফিস ছিল, একদিন যাচ্ছি, দেখি হার্ভার্ড ল কলেজের সামনের ফুটপাতে লেখা ‘সেক্সিজম স্টিল একজিস্ট’। খুব পছন্দ হলো লেখাটি, সঙ্গে সঙ্গেই বসে পড়লাম লেখাটির পাশে। আমার সঙ্গে যে ছিল, সে লেখাটির সংগে আমার একটি ফটো তুলে নিল। এটিই সেই ফটো।দুর্ভাগ্য, বাঙালীরা সেক্সিজমের বাংলা জানে না। এদের মাথায় সেক্স ছাড়া অন্য ভাবনা নেই। তাই সেক্স দিয়ে যে শব্দই শুরু হয়, সবকিছুকেই যৌনসঙ্গম ভেবে নেয়। সেক্সিজম স্টিল একজিস্ট- এর অনুবাদ বাংলা পত্রিকাগুলো করেছে, ‘যৌনতা এখনও বেঁচে আছে’। গাণ্ডুদের কাণ্ড দেখে হাসবো না কাঁদবো বুঝে পাচ্ছি না। সেক্সিজম মানে যে নারীবিদ্বেষ বা লিঙ্গবৈষম্য তা বোঝার ক্ষমতা এদের নেই, এরাই এখন শিল্পী সাহিত্যিক সাংবাদিক। এরা বলতে চাইছে যেহেতু যৌনতা ছাড়া আমি বাঁচি না, তাই যৌনতা নিয়ে পোস্ট দিয়েছি।’

এমনি ভাবে নারী অধিকার আর যৌনগন্ধী নানান টগবগে কথায় তসলিমা নাসরিন মিডিয়ায় আলোচনার কেন্দ্রেই বসবাস করেন। গেলো বছর স্থানীয় জনতার বিক্ষোভের মুখে মহারাষ্ট্রের আওরঙ্গাবাদ বিমানবন্দর থেকে ফিরে যেতে হয়েছে তাকে।আওরঙ্গাবাদের পুলিশ জানিয়েছে, লেখিকা তসলিমা নাসরিন শহরের একটি হোটেলে থাকার জন্য ঘর বুক করেছিলেন – কিন্তু সন্ধ্যায় মুম্বই থেকে আওরঙ্গাবাদ বিমানবন্দরে নামার পরই তিনি প্রবল বিক্ষোভের মুখে পড়েন।

অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (এআইএমআইএম) নামে একটি রাজনৈতিক সংগঠনের শত শত কর্মী বিমানবন্দরের বাইরে জড়ো হয়ে ‘তসলিমা গো ব্যাক’ শ্লোগান দিতে থাকেন।শেষ পর্যন্ত বিমানবন্দর থেকেই ফিরতি বিমানে উড়ে চলে যেতে হয় তাকে।

তদের বক্তব্য ছিল, ইসলাম-বিরোধী লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে কিছুতেই আওরঙ্গাবাদ শহরে পা রাখতে দেওয়া হবে না। এর আগে হায়দ্রাবাদ ও কলকাতাসহ ভারতের বিভিন্ন শহরেই এরকম বিক্ষোভের মুখে পড়েছেন তিনি। কোথাও তাকে শারীরিকভাবেও লাঞ্ছিত করারও চেষ্টা হয়েছে। ফেইসবুকে পাওয়া তসলিমা নাসরিনের বেশ পুরনো একটি সাক্ষাৎকারে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, এই যে লেখালেখি করলেন,এর মূল উদ্দেশ্য কি ছিল,দেহের স্বাধীনতা না চিন্তার স্বাধীনতা?

তসলিমা নাসরিনের উত্তরটাও ছিলো খুব সহজ এবং সোজা-‘আসলে আমি তো পেশায় ছিলাম চিকিৎসক। আমার বাবা চেয়েছিলেন তার মতো হতে। আমিও অধ্যাপক ডা. রজব আলীর মতো একজন চিকিৎসক হই। শৈশবে,কৈশোর এবং যৌবনে আমি অনুভব করি,নারীরা আমাদের সমাজে ক্রীতদাসীর মতো। পুরুষরা তাদের ভোগ্যপণ্যের মতো ব্যবহার করে। এ কারণেই বিষয়গুলো নিয়ে প্রথমে লেখালেখির কথা ভাবি।’

এই লেখালেখির ভাবনাই হয়তো তসলিমা নাসরিনের ভেতরে অঙ্কুরিত করেছে নির্বাসিত জীবনের বীজ। কী বলতে চেয়েছেন তসলিমা নাসরিন নিজের লেখায়? কেউ বলেন নারীর বিরুদ্ধে পুরুষ শাসিত সমাজের নিপীড়নের কথা সাহস করে উচ্চারণ করেছেন তিনি। আবার কারো অভিযোগ অকারণে নারীর শরীরকে শস্তায় বাজারজাত করে নিজেকে তুলে এনেছেন পাদপ্রদীপের আলোয়। কেউ আবার ধর্মের বিরুদ্ধে তার খোলামেলা লেখাকে অন্যায় বলে চিহ্নিত করেছেন।

বছর কয়েক আগে কলকাতার সিনেমা পরিচালক কৌশিক গাঙ্গুলী নির্মাণ করেছিলেন ‘নির্বাসিত’। ছবিটি তসলিমা নাসরিনের জীবন নির্ভর অনেকটাই। দেশ থেকে বিতাড়িত এক লেখিকা কীভাবে একটু একটু করে উন্মূল হয়ে গেলেন তার আশপশের প্রতিবেশ থেকে তারই গল্প বলেছেন পরিচালক। সিনেমায় কোথায় যেন বিষাদের ছোঁয়া আছে। একজন দেশহীন মানুষের গল্প! অথবা দেশ থেকেও সে মানচিত্রে তিনি নিষিদ্ধ। তার নিজের বইয়ের নাম ‘সকল গৃহ হারালো যার’। বইয়ের নামের ভেতরেই ছড়িয়ে আছে একটি মেয়ের ভীড়ের ভেতরে একা হয়ে যাওয়ার গন্ধ।

তসলিমা নাসরিনের বই সর্বদাই ঝড় তোলে পাঠকের মনে। তার লেখা ‘লজ্জা’, ‘ক’, ‘নষ্ট মেয়ের নষ্ট গদ্য’ অথবা ‘আমার মেয়েবেলা’ বই নিয়ে আছে যেমন ছিছিক্কার তেমনি আছে সমর্থনও। বাংলাদেশে প্রগতীশীল নারীদের একটি বড় অংশ সমর্থন করেন তসলিমা নাসরিনের লেখা। বহু পুরুষও তার সমর্থক। আবার তার লেখা বই এই ঢাকা শহরের পথে নামিয়ে আনে উত্তপ্ত, প্রতিবাদী মিছিল।সে মিছিল এগিয়ে গিয়ে জমাট বাঁধে পৃথিবীর মানচিত্রে অন্য কোনো শহরে। সবসময় স্রোতের বিরুদ্ধে সাঁতার কাটেন তসলিমা নাসরিন। তার কলমও চলমান প্রবণতার বাইরে গিয়ে কথা বলে। চলে লেখা।

হয়তো নিজেকে আলোচনায় রাখতে ভালোবাসেন তিনি। অথবা উচ্চারণ করতে চান সত্য। কিন্তু সেই ল্যাপটপের সামনে বসে থাকা বিড়ালটির যেথায় খুশি চলে যাওয়ার অধিকার থাকলেও তার কিন্তু অধিকার নেই দেশে ফেরার। পরবাসে একা-ই তসলিমা নাসরিন।একা তার নিজস্ব নির্জনে। এতো আলোচনা, সমালোচনা, এতো নিন্দার ঝড়, প্রশংসায়ে উপচে পড়া পাত্রের সামনে তার একলা নিয়তি।

ইরাজ আহমেদ
তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট, তসলিমা নাসরিনের ফেইসবুক
ছবিঃ তসলিমা নাসরিনের ফেইসবুক, গুগল