তাঁকে খুন করা হয় ১৯৬৫ সালের ২২ নভেম্বর

দিপা নসুনতারা আইদিত

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মঞ্চে পর্দা নামার ঠিক তিন বছরের মাথায় ইন্দোনেশিয়ায় কমিউনিস্ট সহমর্মী সেনাসদস্য আর র্টির কর্মীরা মিলে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে। দেশটির জাভা রাজ্যে বরাবরই সমাজতন্ত্রীদের প্রভাব বেশি ছিলো। কিন্তু সেনাবাহিনী সেই বিদ্রোহ দমন করে।

পরাস্ত বিদ্রোহীদের অনেকেই পালিয়ে যায় দেশের বাইরে। এদের সঙ্গে দেশ ছাড়েন বিদ্রোহে অংশ নেয়া এক তরুণ বামপন্থী। তার নাম দিপা নসুনতারা আইদিত। তখনও দেশটির রাজনৈতিক মঞ্চে তার আগমনের সময় হয়নি। ঘটনার পৃষ্ঠা উল্টে পার হয়ে যায় সময়। দু’বছর পর অজ্ঞানবাস থেকে দেশে ফিরে আসেন সেই তরুণ কমিউনিস্ট আইদিত। ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি(পিকেআই)-নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেন রাজনৈতিক দক্ষতায়। মাত্র ৩১ বছর বয়সে তিনি ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদকের চেয়ারে বসেন।তাঁর আমলেই দেশটির কমিউনিস্ট পার্টি পৃথিবীর তৃতীয় বৃহৎ দলে পরিণত হয়।

কে ছিলেন এই দিপা নসুনতারা আইদিত?পৃথিবীর সমাজতান্ত্রিক ইতিহাসেও বোধ হয় বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেছেন এই মানুষটি।

এলো ১৯৬৪ সাল। তখন ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুকর্নে’র সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্ক ছিন্ন হচ্ছে। তিনি ঘনিষ্ট হচ্ছেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির। সুকর্ন’র নীতির সমর্থক ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টিও। আইদিতও ঝুঁকে পড়েছিলেন চীনা কমরেডদের প্রতি।সেই সময়ে গোটা ইন্দোনেশিয়ায় শুরু হয় সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন। মানুষের মিছিল এসে পুড়িয়ে দেয় জাকার্তায় মার্কিন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। ঘেরাও করে রাখা হয় মার্কিন দূতাবাস। বন্ধ করে দেয়া হয় সেখানে মার্কিন নাগরিকদের পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ। সে এক ভীষণ অস্থিতিশীল রাজনৈতিক কাল। কিন্তু তখন কি নসুনতারা আইদিত ঘুণাক্ষরে আঁচ করতে পেরেছিলেন তার জন্য নিকট ভবিষ্যতে কি অপেক্ষা করছে?

জাকার্তা তখন মৃত্যুপুরী

সুকর্ন নিজে কমিউনিস্টদের ঘোরতর সমর্থক হলেও তার বেশিরভাগ সেনা জেনারেলরা ছিলো বিপক্ষে। ফলে জাকার্তায় ষাটের দশকের শুরুতেই ঘুরপাক খাচ্ছিলো ষড়যন্ত্রের হাওয়া।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুস্তাফা সাজারিফ ছিলেন সেই ঘনিয়ে ওঠা ঝড়ের কেন্দ্রে। কিছুই টের পাননি আইদিত। বুঝতে পারেননি সুকর্নও। ১৯৬৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের ইন্দোনেশিয়ার রাতের হাওয়ায় অস্বস্তি ছিলো, ছিলো বন্দুকের বোল্ট টানার একরোখা শব্দ। সে রাতেই হামলা চালানো হলো সুকর্ন’র অনুগত জেনারেলদের উপর। ছয় জেনারেলের মধ্যে তিনজনই সে রাতে খুন হলেন। বাকী তিনজনকে ধরে নিয়ে গিয়ে জবাই করা হলো নির্মম ভাবে। কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থক জেনারেল অন্তুং পাল্টা প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও তা ব্যর্থ করে দেন জেনারেল সুহার্তো। আইদিতকে বিমান বাহিনী প্রধান প্লেনে তুলে পাঠিয়ে দেন মধ্য জাভায়। প্রেসিডেন্ট সুকর্ন যাত্রা করেন অজ্ঞাত স্থানের দিকে।

ধরা পড়লেন আইদিত

জাকার্তার রাস্তায় ভোর নেমে আসতেই হাজির কমিউনিস্ট বিরোধীরা। তারা ধ্বংস করতে চায় কমিউনিস্ট পার্টি, রক্ত দেখতে চায় আইদিতের। চোখের পলকে তারা গুঁড়িয়ে দেয় পার্টি অফিস। উপড়ে ফেলা হয় ভবনের ইঁট। আগুন লাগানো হয় ভবনে। এই আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়নি আইদিতের বাড়িও।

আইদিত তখন জাভায় পলাতক। কমিউনিস্ট পার্টির শক্ত ঘাঁটি ছিলো জায়গাটা। সেখানকার দায়িত্ব নিয়ে আসেন আরেক জেনারেল সারো এদেহ। এই জেনারেল তার প্যারা-কমান্ডো বাহিনী ছাড়াও একত্রিত করেন বাম পন্থার বিরোধী শক্তিদের। তার এই মিলিশিয়া বাহিনীতে যুক্ত হয় জঙ্গী ইসলামপন্থীরাও। তাদের দু’একদিন মানুষ খুনের প্রশিক্ষণ দিয়ে নামিয়ে দেয়া হয় মাঠে। উদ্দেশ্য একটাই, সমাজতান্ত্রিকদের খুন করা। ইন্দোনেশিয়ায় তখন রক্তের নদী বয়ে গিয়েছিলো। বলা হয়ে থাকে, জাভায় নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের লাশে।সমুদ্রের তীর, বন্দর, রাস্তা, গলি সর্বত্রই তখন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের লাশ পড়ে থাকতো। খুনের রাজত্ব কায়েম হয়েছিলো দেশটায়।সেই খুনের রাজত্বে খতম হয়েছিলো ৪ লক্ষ মানুষ।

আইদিতের খোঁজে শুরু হয় সেনা অভিযান। শেষ পর্যন্ত ধরা পড়েন এই নেতা একটি গ্রাম থেকে। ভাঙ্গা একটা বাড়িতে আত্নগোপন করেছিলেন তিনি। পরের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত। বিচারের নামে প্রহসন এবং মৃত্যুদণ্ড। ঠাণ্ডা মাথায় খুন করা হয় দিপা নসুনতারা আইদিতকে।

ইন্দোনেশিয়ার পাংকাল লালাঙ্ক নামে একটি জায়গায় আইদিতের জন্ম ১৯২৩ সালের ৩০ জুলাই। তাঁকে খুন করা হয় ১৯৬৫ সালের ২২ নভেম্বর।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া

ছবিঃ গুগল