তাঁর তিন উপন্যাস আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিলো ষাটের উত্তাল আন্দোলনের পটভূমি কেবল ইতিহাসের ধারাবাহিক বর্ণনার মধ্যে নেই-আলী রীয়াজ

অধ্যাপক,আলী রীয়াজ

কিছু কিছু লেখক আছেন যারা জীবন সম্পর্কে, চারপাশের জগত সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে দেন; আমাদেরকে তাঁরা যা দেন তা হচ্ছে দেখার চোখ, সমাজকে বোঝার যুক্তি এবং অনুভব করবার মতো হৃদয়। এই ধরণের লেখকদের মধ্যে সৃষ্টিশীল লেখকরাই অন্যতম। অন্ততপক্ষে আমার জীবন, আমার বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে এমন প্রভাব রেখেছেন কিছু লেখক। কথাসাহিত্যিক শওকত আলী তাঁদের অন্যতম। তাঁকে খুব কাছে দেখবার সুযোগ হয় নি আমার, যে সামান্য সময়ে তাঁকে আমি কাছে থেকে দেখেছি তাঁকে আমি স্যার বলেই সম্বোধন করতাম। ‘করতাম’ বললাম কেননা স্যারের সঙ্গে এক দশকের বেশি সময় ধরে দেখা হয় নি। কিন্ত তার প্রভাব তার লেখার কারণে, আমি তাঁকে দেখেছি লেখার মধ্য দিয়ে। কিংবা বলতে পারি শওকত আলী নন, কথা সাহিত্যিক শওকত আলী আমাকে নির্মান করেছেন। সেটা তার জানার কথা নয়, কেননা এই রকম অসংখ্য মানুষ, অসংখ্য পাঠককে তিনি দিয়েছেন তাদের পৃথিবী। ১৯৭৬, ১৯৭৭ এবং ১৯৭৮ সালে তার তিনটি উপন্যাস – দক্ষিনায়নের দিন, কূলায় কালস্রোত এবং পূর্বদিন পূর্ব রাত্রি – প্রকাশিত হয়েছিলো সাপ্তাহিক বিচিত্রার ঈদ সংখ্যায়। এই ত্রয়ী উপন্যাসের আগে ‘পিঙ্গল আকাশ’ পড়বার সৌভাগ্য হয়েছে, কিন্ত এই তিন উপন্যাস আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিলো ষাটের দশকের উত্তাল আন্দোলনের পটভূমি কেবল ইতিহাসের ধারাবাহিক বর্ণনার মধ্যে নেই। যে জাগরণের উত্তরাধিকার হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ তা কেবল ঘটনা পরম্পরা নয়, সমাজের ভেতরে যে বদল ঘটেছিলো ধীরে ধীরে তাকে অনুভব না করে ইতিহাসকে বোঝার চেষ্টার মধ্যে অপূর্নতা থাকবে সেই সত্য আমি শওকত আলীর উপন্যাস পড়ে উপলব্ধি করি। এই যে উপন্যাসের মধ্যে, রাখির জীবনের মধ্যে, তার ব্যর্থতার, অপূর্নতার মধ্যে, দীর্ঘশ্বাসের মধ্যেই একটা জনপদের মানুষেরর ইতিহাস লেখা হয়েছে সেটা বুঝতে পারি কিন্ত উপন্যাসের যে শিল্পরূপ তাকে বাদ দিয়ে নয়। হৃদয় দিয়ে ইতিহাসকে বোঝার অর্থ যে সমাজের মর্মবানীকে উপেক্ষা করা নয় সে কথা আমকে আমার মতো করে বোঝার পথ করে দিয়েছিলো এই তিনটি উপন্যাস। কথাসাহিত্যিক শওকত আলীর জন্যে তা যে কোন অস্বাভাবিক ঘটনা নয় সেটা তার পাঠকেরা জানেন, ‘ওয়ারিশ’, ‘উত্তরের খেপ’ এবং ‘দলিল’ যারা পাঠ করেছেন তাঁরা শওকত আলীকে বোঝেন কোথায় তার শেকড়। আশ্চর্য এই নয় কি যে, ব্যক্তি জীবনের অভিজ্ঞতায় একার্থে তিনি উন্মুল, কিন্ত তার লেখার ভেতরে তিনি শেকড় গেড়ে বসে আছেন শহরের আলো থেকে দূরে এমন এক জীবনে যেখানে আমাদের বড় সংখ্যক লেখকেরা কখনো যান না। যে মানুষদের কথা তিনি লেখেন তাঁরা ব্রাত্যজন। যে জনপদের কথা তিনি লেখেন সেটি উত্তর বাংলার মানুষের জীবন – যাকে আমরা তার কলমেই চিনি। শওকত আলী আমাদেরকে ইতিহাসচারী হতে বলেছেন, অন্যথায় কেন তিনি ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ লিখবেন? একাধিক সাক্ষাতকারে তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন এটা ‘ঐতিহাসিক উপন্যাস নয়’। কিন্ত ইতিহাস বলতে আমরা কি বুঝবো – কেবল ঘটনার বর্ণনা নাকি তার মর্মবস্ত? কথাসাহিত্য আমাদের ইতিহাসের ধারাক্রম বোঝায় না, কিন্ত ফিকশন আমাদেরকে জানিয়ে দেয় সমাজের ভেতরে কী ধারাগুলো প্রবাহিত হয়েছিল। একে অপরের বিকল্প নয়, কিন্ত সমাজের ভেতরে আমাদেরকে নিয়ে যাতে পারেন কথাসাহিত্যিকরা। সবাই পারেন আমি সেই দাবি করিনা, কিন্ত শওকত আলী পারেন সেটা তার উপন্যাসের ছত্রে ছত্রে প্রকাশিত। আমি সেইভাবেই শওকত আলীকে বুঝি। সেইভাবেই শওকত আলী আমার দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে উপস্থিত থাকেন। গত বছরই জানতে পারি স্যারের শরীর ভালো নেই, নিঃসঙ্গতা এবং স্মৃতি কাতরতার পাশাপাশি লেখালেখি স্তিমিত হয়ে এসেছে, এ বছর জন্মদিন উপলক্ষে ফেব্রুয়ারিতে সাদিয়া মাহজাবিন ইমামের লেখায় জানতে পেরেছিলাম তার একান্ত নিঃসঙ্গ জীবনের কথা। সংবাদ মাধ্যমে খবর দেখি তিনি অসুস্থ্য হয়ে হাসপাতালে। স্যার সুস্থ্য হবেন সেই আশায় বুক বাঁধি।

লেখক:  অধ্যাপক, পলিটিক্স অ্যান্ড গভমেন্ট

ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ এশীয় রাজনীতি ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ