তাঁর মনের আকাশের অভিমান কান্না হয়ে ঝরে পড়ছে

স্বরূপ সোহান (লেখক)

‘-লাফ দাও, আমি তোমাকে নীচ থেকে ধরবো..আমাকে বিশ্বাস করো.. আমি তোমার শিক্ষক.. আমাকে পয়সা দিয়েছো…তোমাকে শিখতে হবে… লাফাও, লাফাও’
না, কোন সার্কাস বা জিমনাস্টিক ট্রেনিং নয়। আত্মবিশ্বাসের ট্রেনিং। ভরসা জাগানোর মন্ত্র । যেখান থেকে জন্ম নেয় এক শিল্পীর, যিনি হয়ে ওঠেন সীমাহীন, ছাড়িয়ে যান নিজেকে নিজে। আর তাই প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে এক শিক্ষক পরম মমতা নিয়ে তার বুকে বুনে দিয়েছিলেন আত্মবিশ্বাস। শিখিয়েছিলেন কিভাবে নিজেকে, নিজের চারপাশটাকে চিনতে হয়। নিজের শহরে কিভাবে হারিয়ে গিয়ে প্রিয় মানুষকে খুঁজে পেতে হয়।এই খুঁজে পাওয়ার মাঝেই জন্ম শিল্পীর। গীর্জার ছাদ থেকে লাফ দিয়ে প্রবল আত্মবিশ্বাসের মাঝে জন্ম নেয় এক নাট্যজন। তিনি অঞ্জন। অঞ্জন দত্ত।
অভিনয় শিক্ষক, মঞ্চ নির্দেশক, লেখক বাদল সরকার সেই যে দু’হাত মেলে ধরেছিলেন ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়া কিশোর অঞ্জনকে, এক চরম জেদি স্বপ্নবাজকে, এমন এক নটবরকে যার একমাত্র ধ্যান ছিল অভিনেতা হওয়ার। না, সিনেমার ললিপপ নায়ক নয়, চেয়েছিলেন মঞ্চ, সিনেমায় তিনি থাকবেন আভিজাত্য নিয়ে, যেখানে বারবার তিনি নিজেকেই নিজে ভাঙ্গবেন। তাই তার ইনিংসটাও শুরু হয়েছিলো কিন্তু দারুন। মৃণাল সেনের ছবিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় দিয়েই বাজিমাৎ। সেই ৭০ দশকেই বর্লিন চলচিত্র উৎসবে সেরা অভিনেতার প্রাপ্তিযোগটা জানিয়ে দিয়েছিলো অভিনয়ে তার রাজাসনটা পাকা। আর তাই শুধু মৃনাল সেনই নন, গৌতম ঘোষ, ঋতুপর্ণ থেকে অপর্ণা সেন কখনোই হাত ছাড়েননি।
কিন্তু তারপরও। তারপরও এতো বিখ্যাত সব চলচিত্র নির্দেশকরা পারেননি। পারেননি মঞ্চের অঞ্জনকে, সিনেমার অঞ্জনকে অঞ্জননের মতো হয়ে উঠতে। এই যে খেদ, এই যে না পাওয়া, এটাই তাড়িয়ে নিয়ে বেরিয়েছে সারাজীবন অঞ্জনকে। তীব্র এই অভিমান থেকেই আবার পুনর্জন্ম অঞ্জনের। ৮০ দশকের শেষে এসে গীটার আর সুরে জন্ম নিলেন আমাদের বাংলা গানের দিক বদলে দেয়া গায়ক অঞ্জন দত্ত। মাত করলেন এপার বাংলা ওপার বাংলা ছাড়িয়ে সারা বিশ্বের এক নতুন ধারার শ্রোতদের।না, সিনেমা তিনি ছাড়েননি। বরং পরিচালক হয়ে বানিয়ে চলেছেন একের পর এক চলচিত্র। ব্যোমকেশ নিয়ে সিনেমা সিরিয়াল থেকে বং কানেকশন, ম্যাডলি বাঙ্গালী অথবা রঞ্জনা আমি আর আসবো না। জাতীয় চলচিত্র পুরস্কার অর্জন ও এখন তার স্বাভাবিকতা।
তবে ওই যে । গায়ক – পরিচালক অঞ্জন যে অভিনেতা অঞ্জন থেকে প্রবলভাবে দাঁড়িয়ে, এটা অঞ্জন এই মধ্য ষাটে এসে এখনো মেনে নিতে পারেন না। তার এই আক্ষেপ তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে জীবনভর। মঞ্চের, সিনেমার বাঘা সব পরিচালকরা অঞ্জনকে ব্যবহার করতে পারেলেন না। তার ভাষ্যে, জীবীকার তাগিদে গায়ক হওয়া, সিনেমা বানানো, কিন্তু মনের ক্ষিদেটা যে আজীবন রয়েই গেল।

আর তাই এই মধ্যষাটের তরুন অঞ্জন আজো তার মনের ক্ষিদে মেটান মঞ্চ দাপিয়ে।অভিনেতা অঞ্জন অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন, যেখানে তার অবদমিত তাড়না, তার আজীবনের খেদ ভেঙ্গে চুড়মার হয়ে যায়। দর্শক মুগ্ধ চোখে দেখেন সেই অঞ্জনকে যিনি প্রবলভাবে তার গায়কী স্বত্ত্বা থেকে হয়ে ওঠেন সেই বাদল সরকারের সদ্য তরুন মঞ্চাভিনেতা।
কোলকাতা শহর এই মঞ্চ কাপানো অভিনেতাকে চেনে। অঞ্জন তার অর্ধেক বয়সী দলের সদস্যদের নিয়ে প্রতিনিয়ত একের পর এক শো করে যাচ্ছেন তার প্রিয় এই শহরে। আর ঢাকায়? সেই ১৯৯৬ তে যাদুঘর মিলনায়তনে নিমা রহমানের সঙ্গে শ্রুতিনাটক দিয়ে তার ঢাকার যাত্রা শুরু। তবে ওই শো তে গায়ক অঞ্জনই মাতিয়েছিলেন। কেন নয়? ঢাকায় তো তিনি জনপ্রিয়তার শীর্ষে তখন বেলা বোসকে নিয়ে। ৯৬ এর পরও কিন্তু অঞ্জন নিয়মিত হয়েছেন তার গান নিয়েই। তবে অঞ্জন চাইতেন অন্যকিছু। চাইতেন তার এই প্রিয় শহর ঢাকায় যদি একটা মঞ্চ নাটক করা যেতো, তবে তিনি তার বাংলাদেশের ভক্তদের দেখাতেন অন্য এক অঞ্জনকে, যাকে তারা কখনোই দেখেননি।
অঞ্জননের মনের এই সুপ্ত ইচ্ছেটাকে কিভাবে যেনো টের পেলেন আমাদের ঢাকার ক্ষ্যাপাটে আরেক তরুন সাজ্জাদ হুসেইন। যিনি গত কয়েকটি বছর অঞ্জনের পিছু ছাড়েননি। ছায়ার মতো ঘুরে বেড়িয়েছেন শুধুমাত্র অঞ্জনকে নিয়ে লিখবেন বলে। কখনো কোলকাতা কখোনো দার্জিলিং বা ঢাকা, সারাক্ষনের সঙ্গী হয়ে লিখেছেন অঞ্জনের বায়োপিক ‘অঞ্জনযাত্রা’। অঞ্জন ভক্তরা জেনেছেন অঞ্জনের আদ্যপান্ত। কিন্তু এই যে নাট্যজন অঞ্জন, তাকে নিয়ে, তার খেদ নিয়ে এবার সাজ্জাদ লিখলেন নাট্যাঞ্জন। লিখলেন অঞ্জননের তাড়নার কথা, অঞ্জনরে মঞ্চজীবনের আখ্যান। আর এখানেই মিলে গেল অঞ্জনের সেই ইচ্ছেটি। সাজ্জাদ আয়োজন করলেন ঢাকায় অঞ্জনের প্রথম মঞ্চ নাটক প্রদর্শনী ‘সেলসম্যানের সংসার’।
জুলাইয়ের ৯ তারিখে মহিলা সমিতিতে যখন টিকেট কেটে সবাই ভিন্নরূপি অঞ্জননের অপেক্ষায়, তখনো সবার মুখে একটাই কথা , আচ্ছা অঞ্জন গাইবেন তো? কেনো যেনো সবাই মঞ্চাভিনেতা নন, গায়ক অঞ্জনকেই খুজছেন। অথচ, অঞ্জন যখন গীটার নিয়ে মঞ্চে এসে গানের সুরে বললেন ‘আমার জানলা দিয়ে আকাশ দেখা যায়, আমার কাজের কোন সীমারেখা নেই’ তখনই দর্শক বুঝে গিয়েছেন আজ মঞ্চ কাঁপাবেন অন্য এক অঞ্জন, যিনি গায়ক নন, স্রেফ উইলি লোম্যান।আর্থার মিলার সেলসম্যান এই উইলিকে সৃস্টি করেছিলেন সেই উনিশ শতকের গোড়ায়। অথচ প্রায় শতবর্ষ পরও চরিত্রটি কত জীবন্ত, কত প্রাসঙ্গিক । সারা জীবন পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটে কোম্পানীকে লাভ এনে দেয়া আজকের চাকরি খোয়ানো বুড়ো সেলসম্যান উইলি প্রবল ভাবে চায় তার সংসারটাকে বাচিয়ে রাখতে। বুনো ষাড়ের মতো বিভিন্ন চরিত্ররা যখন তার সংসার ভেঙ্গে চুরমার করতে চায়, তখনই বুড়ো উইলির আপ্রান চেষ্টা সংসারকে গুছিয়ে তোলা। দুই ছেলে বিফ আর হ্যাপী লোম্যান আর স্ত্রী কে নিয়ে নাটক সেলসম্যানের সংসার যেনো একালে ও মনে করিয়ে দিবে মধ্যবিত্ত এক ছাপোষা মানুষের টানপোড়ন। পুরো নাটক শুধু নির্দেশনা দিয়েই নয়, অঞ্জন মঞ্চে একাই কাঁদিয়েছেন, একাই হাসিয়েছেন। এ এক অন্য অঞ্জন, যেখানে তীব্রভাবে খুজে পাওয়া যায় এক অনন্য নাট্যাঞ্জনকে। আর তাই নাটক শেষে সবাই দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন সব কুশীলবদের। অঞ্জন তখন কাঁদছেন। হয়তো তাঁর মনের আকাশের অভিমান কান্না হয়ে ঝরে পড়ছে। তিনি যে গায়ক নন, অভিনেতাই হতে চেয়েছিলেন।

ছবিঃ লেখক