তাকে ভুলে…

সংসারে প্রতিদিন কতকিছু হারিয়ে যায়। চশমা, পুরনো ছাতা, জরুরী ফোন নম্বর, লেখা চিরকুট থেকে কথা, জীবনের আদর্শ-যেন হারানোই মানুষের নিয়তি। কিন্তু মানুষ কি হারিয়ে যায় জীবন থেকে? শারীরিক অথবা মানসিক বিচ্ছেদ সম্পর্কের ওপর টেনে দেয় যতি রেখা? কত প্রিয় মানুষকে আমরা হারিয়ে ফেলি জীবনের খাতা থেকে। তারা কেউ পৃথিবীতে থেকেও অচেনা হয়ে যায়। আবার কেউ সংযুক্ত হয় মহাকালের সঙ্গে। ব্যাপারটা আসলে হারিয়ে ফেলা। কিন্তু সত্যিই কি হারিয়ে ফেলি আমরা তাকে? আমাদের অন্যমনষ্ক মনের প্রান্তরে তো তার স্মৃতিরেখা রয়ে যায়। অনুপস্থিতির তীব্র এক যন্ত্রণা বয়ে বেড়াই সর্বক্ষণ। হয়তো ভুলে থাকতে চাই, বিস্মরণের জন্য প্রাণপণ প্রার্থনা করি। কিন্তু তবুও তাকে মনে পড়ে। স্মৃতি আসলে এক গভীর ষড়যন্ত্র, সর্বক্ষণ মনে পড়ানোর খেলায় মেতে থাকে। মনের মধ্যে তৈরী করে হাহাকার।
এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজন সেই ভুলে থাকা মানুষটির সন্ধান, খুঁজতে চেষ্টা করা সেই অনুপস্থিতির বেদনাকেও। দেশ আর দেশের সীমানার বাইরের খ্যাতিমান অভিনেতা, অভিনেত্রী, সঙ্গীত শিল্পী আর বাচিক শিল্পী জানিয়েছেন তাদের অনুভূতির কথা।

শম্পা রেজাঃ পুরো ব্যাপারটা তো আসলে ভুলে থাকা নয়।আর আমার নির্দিস্ট কোন ভুলে থাকার কেউ নেই। প্রিয়জনদের কথা আমার সব সময়ই মনে পড়ে। কাউকে কখনও ভুলে থাকি না।আসলে আমরা অনেক সময় প্রিয় মানুষদের অনুপস্থিতিকে ঢেকে রাখতে ভুলে থাকার চেষ্টা করি। মানুষের স্মৃতি তো সাধারণত মধুর হয়। কিন্তু অনুপস্থিতি বেদনার। আমি এসব ভুলে থাকার চেষ্টা করি। সেটা না করতে পারলে তো জীবনের গতিই স্থবির হয়ে যায়। মন ভারাক্রান্ত হলে তো সামনে এগিয়ে যাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। স্রষ্টা আসলে আমাদের মনের মধ্যে এই বেদনাকে সরিয়ে রাখার একটা ক্ষমতা তৈরী করে দিয়েছেন। তাই আমরা মনে-না করার চেষ্টা করি। ব্যস্ত হয়ে উঠি এই বর্তমান পৃথিবীর রাজ্যের যত কাজ নিয়ে। অনুপস্থিতির কষ্টটা দূরে রাখতে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করি। আসলে পুরো ব্যাপারটাই একটা প্রক্রিয়া। আমরা এই প্রক্রিয়ার অনুশীলন করি। এভাবে বাঁচতে হয়, আমরা এভাবেই বেঁচে থাকি।

আইয়ুব বাচ্চুঃ   ভুলে থাকার প্রসঙ্গ উঠলে বলবো তাঁকে আমি কখনোই ভুলে থাকতে চাই না। সেই মানুষটি এখন আমার স্মৃতির এক গভীর অংশ। প্রতিদিন তাঁর শরীরী উপস্থিতি আমি ভীষণভাবে মিস করি। তবে তিনি জায়গা করে নিয়েছে আমার স্মৃতিতে। তিনি আমার মা। তিনি আমার হাত ছেড়ে দিয়েছেন বারো বছর আগে। চলে গেছেন এই জীবন নদীর ওপারে। কিন্তু সত্যিই কী তিনি আমাকে ছেড়ে চলে গেছেন?না, আমি জানি যতদিন এই পৃথিবীতে আমি নিঃশ্বাস নেবো ততদিন তিনি আমার সঙ্গে থাকবেন।
এই জীবনে আমি মা-পাগল মানুষ। মা চলে যাবার আগেও ছিলাম, এখনো আছি। আমি আমার গানে, আমার কষ্টে, আমার সুখের মুহূর্তে-সব সময়ই তার অনুপস্থিতিটুকু অনুভব করি। যতক্ষণ আমি জেগে থাকি ততক্ষণ তিনি আমার কাছে থাকেন। ঘুমিয়ে পড়লেও মাঝে মাঝে মা আমার স্বপ্নে দেখা দেন। তখন অনেক কথা বলি তাঁর সঙ্গে। খুব যখন একা হয়ে থাকি তখনও মায়ের সঙ্গে, তাঁর স্মৃতির সঙ্গে কথা বলে সেই একাকীত্বকে দূর করি।
মা চলে গেছেন এই পৃথিবী থেকে সেটা আমার জীবনে সবচাইতে বড় কষ্টের অনুভূতি। আমি ভাবতে চাইনা মায়ের এই অনুপস্থিতির কথা। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, তাঁর অনুপস্থিতি নিয়ে আমি বেঁচে আছি, কষ্টেও আছি।

কণকচাঁপা: তাকে ভুলে? বাবা? তোমাকে ভুলে? তোমাকে ছেড়ে? আমি আমাকে ভাবতেই পারিনা।আমি নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবতেইই পারিনা। এখনো আমি ভাবি,আমি তোমার দেহের একটা অংশ।আসলেই তো,আমি তোমার রক্তকনা দিয়েই তিলে তিলে তৈরি হলাম।আমি মার পেটে বড় হওয়ার কথা বলিনাই বাবা। মা এবং তুমি আমার অক্সিজেন। সে কথা অন্য গভীরতায় পোঁতা আছে বাবা। আমি বলছিলাম আমাকে বড় করে তুলতে তোমার যত যুদ্ধ, সেই সব দিনকে রাত করে ফেলা অসম্ভব ফেনায়িত যুদ্ধ গুলো কিভাবে তুমি একহাতে শেষ করেছো! বাবা? বাবা,আমার খুব দুঃখ হত আপনার কাছে আপনার ছোটবেলার গল্প শুনে।জলপাই গুড়ির সেই জিলা ইস্কুলের কাছে আপনাদের ছোট একটি বাড়ি,দাদাভাই ও দাদী বুজির প্রেমময় সংসার,বাবার হাত ধরে আপনার সাপ্তাহিক বাজারে যাওয়া,ঘোড়াগাড়ি করে বাবার সঙ্গে স্কুলে যাওয়া, দাদাভাই যখন জমিদার বাড়ি টিউশনি করতে যেতেন তখন তার সঙ্গে আপনার আনন্দ ভ্রমণ, সব কিছু আপনার কাছে শুনে শুনে পুরা চিত্রকল্প মুখস্ত হয়ে গেল।

তারপর একদিন সেই চিত্রকল্পে দেখলাম খোকা নামের বালক ভয়ে চিৎকার করতে নিয়েও নিজেকে সম্বরণ করে নিল। বাবার যক্ষা ধরা পড়েছে! চিকিৎসাতে আবহাওয়া চেঞ্জে দার্জিলিং যেতে হল। চাকরী চলে গেল।এবং একসময় বাবা না ফেরার দেশে চলে গেলো। ছোট পরিবারটি ভেঙে পড়লো মানসিক ও আর্থিক ভাবে। সেখান থেকে মোটামুটি সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে একমাত্র আদরের খোকাকে বুকে নিয়ে দাদীমা ফিরে এলেন সিরাজগঞ্জ। জীবনরেখা বদলে গেল। বদলে যেতেই থাকলো বাবা? আব্বা? সেই যে আপনার কঠিন জীবন যাত্রা শুরু হলো একজন এতিম বালক হিসেবে তা কি কখনওই শেষ হয়েছিল? সুখী একটা সংসার ছিল আপনার,কিন্তু আমাকে তৈরি করতে গিয়ে আপনার যুদ্ধ সে যে এযাবৎকালে সবচেয়ে সেরা যুদ্ধতে পরিণত হল।এজন্য আমার নিজেকে বড়ই দোষী বলে মনে হয়। আব্বা, আপনি যে আমার গানের জন্য সারাজীবনের আনন্দ, সচ্ছলতা সব বিসর্জন দিলেন,আপনাকে তো কিছুই দিতে পারিনি আব্বা?

আম্মা আপনার এতো যত্ন করতেন,কিন্তু আপনি এতো দুর্বল কিভাবে হয়ে গেলেন? কতটা ব্যস্ত হলে এমন বাবা কে ভুলে ব্যস্ত হয়ে থাকা যায়? আব্বা? ডঃ আমাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললেন,আপনার বাবার লাংকস পানিতে পরিপূর্ণ, সেই থেকে বাবা,আমি জলহস্তী হয়ে গেলাম বাবা।আমি এখন পানির নীচে ঘুমাই,পানির ভেতর জাগি! বাবা,আপনার সেই অত্যাশ্চর্য হাতের লেখা! আপনার কাব্য,আপনার সেলাই,আপনার কাঠের কারুকাজ, আব্বা,আপনার রং-তুলির অপূর্ব টান! আমি বিস্মিত।আপনার গানের গলা? কি অপূর্ব সে কন্ঠ! আমার বিস্ময় আপনার হাতে লেখা কোরানের হরফ,কি অদ্ভুত, কি অপূর্ব! কিন্তু আমার সকল বিস্ময় সীমা ছাড়িয়ে আকাশে গিয়ে ঠেকে,যখন আপনার স্মিতহাস্য বিনয়ী মুখখানা মনে পড়ে! আপনার যুদ্ধংদেহী মানসিকতায় এই হাসিমুখ আমার বিস্ময়। আমার সকালের বিস্ময়, আমার রাতের বিস্ময়, আমার আজীবনের বিস্ময়। বাবা– আমার সব্যসাচী খোকা! আমি আপনাকে ছেড়ে, আপনাকে না দেখে আর কতদিন থাকবো? এভাবে আর কতদিন থাকা যায় বাবা? আপনার গানের পাখীর জীবনের সব আনন্দ কোথায় জানেন বাবা? আপনার হাতের মুঠোয়। আপনার প্রাণহীন দেহের কাছে গিয়ে শেষবার যখন দাঁড়িয়েছিলাম তখন আপনার হাত মুঠ করা ছিল।বাবা,আপনার ওই মুঠ করা হাতের তালুতে আপনার ছোট গানের পাখির পরাণ! বাবা,যাবার সময় আপনি ঠিকানা বলে যাননি বাবা,আপনাকে ভুলে কি করে ভালো থাকি, বাবা? বাবাগোওওওও।

আফসানা মিমিঃ  আমরা ভীষণ একটা বন্ধুদের দল ছিলাম। সেই বন্ধুদলের মাঝে আড্ডার মধ্যমণি ছিল আমার বন্ধু মনিরুল ইসলাম। যাকে আমরা সবাই ডাকতাম মনির বলে। মনির আমাদের ছেড়ে ২০০৭ সালের ২৩ মার্চ আচমকা চলে যায় জীবনের ওপারে।
মনিরের সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সাহিত্য পাঠচক্রে। তখনও বন্ধুত্বটা গড়ে ওঠে নি। সেই সময়ের স্মৃতিও আমার বিশেষ মনে পড়ে না। টেলিভিশন মিডিয়ায় কাজ করতে এসে আবার নতুন করে মনিরের সঙ্গে বন্ধুত্ব। একটা সময়ে মনির আর তার সঙ্গীরা ‘প্যাকেজ নাটক’ নির্মাণ করছিল। তখন আমিও সেসব নাটকে কাজ করেছি। আমি যখন প্রোডাকশন হাউজের সঙ্গে যুক্ত হলাম তখনই সব বন্ধুরা একটি কেন্দ্রে মিলিত হতে শুরু করলাম। আর তখনই মনির এলো। তখন অফিসে প্রতিদিনের আড্ডার সভ্য ছিল ইন্তেখাব দিনার, আবুল কালাম আজাদ পাভেল, বদরুল আনাম সৌদ, সানজিদা প্রীতি আর রহমতউল্লাহ তুহিন। মনির ছিল আমাদের সেইসব আড্ডার কেন্দ্র। মনির চলে গেছে ১০ বছর হয়ে গেল। এক অর্থে তো মনিরকে ভুলেই গেছি। ভুলে থাকার বদলে বলা যায় তাকে ফেলে আমরা যে যার কক্ষপথে ছুটে চলেছি। আমার মনে আছে অনেক বছর আগে কোন এক ঈদের দিনে বাবা মায়ের সঙ্গে মনমালিন্য ঘটিয়ে আমি আমার একা বাড়িতে গুটিয়ে বসে আছি। হঠাৎ এলো মনিরের ফোন। জানতে চাইলো কী করছি। আমি ওকে বলেছিলাম, একা বাড়িতে আছি। মনির ভীষণ অবাক হয়ে বলেছিল, ‘ঈদের দিনে মানুষ একলা থাকে! মানুষ কেন একা থাকবে?’ মনিরের এই কথাটা আমার খুব মনে পড়ে। আমাদের মধ্যে ও্-ই প্রথম চলে গেছে চির বিচ্ছেদে। মানুষ কেন একলা থাকবে প্রশ্ন করে মনিরই একলা হয়ে চলে গেছে। এখন আমাদের ওই সময়ের বন্ধুদের মধ্যে অনেক দূরত্ব বেড়েছে। মনে হয় মনির থাকলে হয়তো আমাদের বিচ্ছিন্ন হতে দিত না। আমরা আমাদের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়েছি নানা অজুহাতে। একে অপরের কাছ থেকে সরে আছি। মনির বেঁচে থাকলে হয়তো এমনটা ঘটতো না। আবার কখনো এমনও ভাবি, চলে গিয়ে হয়তো মনির বেঁচে গেছে। এতো ক্ষরণ, এতো পতন দেখতে হলো না। তাই ভাবি, আমরা বন্ধুরা সবাই মনিরকে ফেলে চলে গেছি দূরে।তবে ভুলে যাইনি।

রিনি বিশ্বাসঃ  যাবো? না যাবোনা…. কি করণীয়? হাজারবার ভেবেও কূল পাইনি! এমন সুযোগ চট্ করে আসেনা, সবাই পায়-ও না, ভবিষ্যতে হয়ত আর কোনদিনই এমন সুযোগ আসবেওনা…রাজি হওয়াই তো উচিত! হোক না সাত সমুদ্র পাড়ে, তবু যে কেউ বলবে ‘না’ বলা এক্ষেত্রে বোকামো! আমিও বোকামো করলামনা… ‘হ্যাঁ’-ই বললাম… এবং তারপর থেকে কেঁদে আকুল হলাম! কি মরতে রাজি হলাম! কেন রাজি হলাম! কি করে যাবো একা! যে মেয়ে কাজের বাইরে এখনও দু পা একা নড়েনা, সে কি করে যাবে ওই বিদেশে! তাও এক দুদিন তো নয়, বছরখানেক!! ওরে বাবা! আর সবাইকে ছেড়ে তবুও নাহয় যাওয়া গেল, কিন্তু কোলের ছেলে-যে সদ্য কথা বলতে শিখেছে.. আধো আধো কথায় যে বাড়ি সরগরম করে রাখছে চব্বিশটি ঘন্টা! যা শেখানো হচ্ছে সে তৎক্ষণাৎ তাই বলে দিচ্ছে! কি বলছে সব বুঝতে না পারলেও সে যে কি শ্রুতিমধুর! সর্বক্ষণ সে পায়ে পায়ে ঘোরে, এঘর থেকে ওঘর গিয়েই তার মায়ের জন্য মন কাঁদে আর তক্ষুণি ছোট্ট পায়ে দুদ্দার দৌড়ে সে মায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে! মায়ের গায়ে লেপটে ঘুমোয়, মা উঠে বিছানা থেকে মাটিতে পা রাখার যা দেরি-সে গোল গোল করে তাকায়, তার সব ঘুম অমনি হাওয়া! এমন দেবশিশুকে রেখে যাই কি করে!!! উফ্ কি কুক্ষণে হ্যাঁ বললাম! এসব ভাবতে ভাবতে আর নিজেকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে করাতেই দিনটা এসে গেল… দিল্লী থেকে ফ্লাইট ছাড়লো যখন, তখন মধ্যরাত! রানওয়ের আলোগুলো সব জলে গলে ঝাপসা…. হাজারবার, লক্ষবার নিজেকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর পরে তখন আমি নিজের সঙ্গে একদম একা…! সে এক অন্য যুদ্ধ! ‘তাকে ভুলে থাকার’ যুদ্ধ…. ভুলে থাকা বললেই কি ভোলা যায়?! না সত্যি ভুলতে চেয়েছি কোন মুহূর্তে? কিন্তু তাকে মনে রাখলে তো একটা মুহূর্তও কাটছেনা! একেক সেকেন্ডকে মনে হচ্ছে ঘন্টার পর ঘন্টা! যার জন্য বাঁচি, তাকেই মন থেকে যে করে হোক সরিয়ে তবেই বাঁচতে হবে ক’টা মাস… এ যুদ্ধের চেয়ে কম কিসে!!! দুপুরে খাইয়ে, কোলে নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে যখন তাকে বিছানায় শুইয়ে দিলাম, সে তো জানতেও পারলোনা তার মা তাকে ছেড়ে চললো কত্তদূরে! হাপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতে তৈরি হলাম… মা বকলো, বাবাই সরিয়ে দিলো ওঘর থেকে.. ‘তুই ওঘরে গিয়ে রেডি হ’….ওর সামনে থাকলে যেতে পারবিনা…’ এয়ারপোর্টে যেতে দিলামনা মা-বাবাইকে….ওঁরা সামনে থাকলে কান্না আসবেই! রাজ্যের লোকের সামনে কেঁদেকেটে ‘সিন’ করার কোন মানেই হয়না! সোনাকাকা, ভাইকে যখন হাত নেড়ে টা টা করে এয়ারপোর্টের ভেতরে ঢুকছি, বেআক্কেলে চোখ তখনও একইরকম অবাধ্য! বুদাপেস্ট বড্ড সুন্দর শহর… বড় বেশি সুন্দর… ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইতিহাস কিরকম যেন সুন্দরভাবে মিশে আছে আজকের শহরের সঙ্গে…কোন বিবাদ নেই.. সব এত সুন্দর, তবু মনকেমন করে… শীত আসি আসি করছে… শহর কলকাতার শীতকাতুরে ঘরকুনো এই ‘আমি’র জন্য বুদাপেস্টের প্রথম হাওয়াই ছিল হাড়কাঁপিয়ে দেওয়া… চারপাশটা ধূসর… সবসময়ই আকাশ মেঘলা… দিনের আলো দেখতে অপেক্ষা করতে হয় সকাল সাড়ে আটটা-নটা অবধি, ওদিকে দুপুর আড়াইটেতেই সন্ধ্যের অন্ধকার! রাস্তার আলো কতটুকু সময় নেভে সেটা বুঝতেই চলে গেল বেশ ক’টা দিন! এ যেন নতুন করে বাঁচতে শেখা.. নতুন হাঁটতে শেখা, কথা শেখা, নতুন করে সবটা দেখা… যেখানে ছিলাম আজন্ম, তার সঙ্গে কোথাও কোন মিল নেই, জেনেও মিল খুঁজি হরবখত… সাজানো দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে বুঝতে চেষ্টা করি ছেলেকে কেমন লাগবে এই জামা পরে, ওই জুতো পায়ে… হিসেবি দিনের মধ্যেও একেকদিন করে ফেলি বেহিসেবি খরচ… ছোট্ট পায়ের জন্য কিনে ফেলি জুতো, খেলনা… তারপর সেসব জমিয়ে রাখি নিজের কাছে… নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলি, যেন সে বলছে… এই ক’দিনে সে কি আরেকটু বড় হল? টলোমলো পা কি থিতু হল অল্প? ছড়া বলতে পারে কি এখন? প্রশ্নও করি আমি, উত্তর দেবার জন্যও আমিই ভরসা… আর আছে ইন্টারনেট… ই মেল! রোজ ফোন করার বিলাসিতা কল্পনা করাও ছিল অসম্ভব! অগত্যা ই মেল… মা বাবাই শিখে গেল মেল করতে…. রোজ নির্দিষ্ট সময়ে অফিসের কম্পিউটারে বসি… মেল খুলি… এক মেল যে কতবার পড়ি তার ইয়ত্তা নেই! বাবাই লিখেছে ‘রিনু, দাদাই পুরো বীরপুরুষ বলতে পারছে এখন…’ অস্থির হয়ে উঠি শোনার জন্য.. ! ঘরে ফিরে বালিশ ভেজাই… পয়সা জমাই ফোন করার জন্য… ফোনে সে কথা বলে না! অভিমান?! অভিমানের কি বয়স হয়েছে তার?! না অন্য কিছু, যার নাগাল কেউ পায়না? টিভি তে মাকে দেখা গেলেই সে দৌড়ে যায় টিভির সামনে, আড়াল করে দাঁড়িয়ে বলে ‘না, না, না’… কেন বলে এমন?! আজও বুঝিনি…! দাদাইয়ের কাছে অক্ষর চিনছে সে…’র’ দেখলেই আঙুল বুলিয়ে বলে ‘রিনুর “র”… কিন্তু মাকে দেখতে তার বড় আপত্তি!!! তারও হয়ত যুদ্ধ চলছে, সেও হয়ত তার মাকে ভোলার জন্য চেষ্টা করছে, আপ্রাণ… কত কিছুই ঘটে জীবনে… সবই দরকারি… সবই প্রয়োজন… বাঁচার জন্য সব অভিজ্ঞতাই জরুরি…. যাকে কেন্দ্র করে প্রত্যেক মুহূর্ত কাটে, দিন যায়, বছর ঘোরে-সে যখন দূরে চলে যায়, তখন সব ওলোটপালোট! ছবির রঙ ফিকে হতে সময় লাগেনা বিশেষ! অথচ তারপর একসময় মানিয়ে নিই আমরা,হয়ত বা মেনে নিই খানিকটা! অভিমানের পাহাড় জমে, কখনও নিজের উপর, কখনও আর কারুর উপর; তারপর আপোষ করি, কেউ বলে দেয়নি, তবুও আমরা জানি এই আপোষের নামই বেঁচে থাকা…. দেড় বছরের শিশু তাই মাকে ভুলতে টিভির স্ক্রিন গার্ড করে দাঁড়ায়, মাকে দেখলে যে তার মায়ের কথা মনে পড়বেই!এমন করতে কেউ কি বলে দিলো তাকে?! সে তো নিজেই শিখলো…আবার বছরখানেকের বদলে তিনমাস পরে মা যখন ফিরে এলো, তখন মাকে আরো বেশি করে আঁকড়ে ধরতেও তো কেউ বললোনা…. সেই শিখে নিল…. আমরা সবাই যে যার নিজের মত করে একটা সময়-বেঁচে থাকতে শিখে নিই, অনেক প্রিয়কে ভুলে গিয়ে, বা ভোলার ভান করতে করতে….

মুকিত জাকারিয়াঃ তাকে ভুলে…প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ কাহিনির নাম। কথাটা শুনেই মনে পড়লো মা, স্ত্রী আর সন্তানের কথা। এরা সবাই কিন্তু আমার সঙ্গেই থাকে। এদের ঘিরেই আমার প্রতিদিনকার দিনলিপি লেখা হয়। কিন্তু বাড়ির বাইরে, অফিসের কাজ অথবা শ্যুটিং ফ্লোরে থাকার সময়টা আমি তাদের মিস করতে থাকি। তাই এদের ভুলে থাকা সম্ভব হয় না। খুব বেশী কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলে অথবা বাড়ির বাইরে থাকলে এক ধরণের অপরাধবোধ আমাকে ঘিরে ধরে। মনে হয় ওদের আমি বঞ্চিত করছি।ঠিক সময় দিচ্ছিনা ওদের।আমি আসলে ভুলে থাকা বিষয়টাকে ভয় পাই। বিস্মৃতি নামের মানসিক অনুভূতিটাকে আমি এড়িয়ে চলতে চাই।

নয়ন আহমেদ ও স্বাগতা জাহ্নবী