তারকাদের ঘর ভাঙ্গার হাওয়া

এখন বোধ হয় পাখিদের ঘর ভাঙ্গার সময়-বহুদিন আগে একজন কথাশিল্পীর গল্পের শুরুতে লাইনটি পড়েছিলাম । পাখিদের কী ঘর ভাঙ্গার সময় নির্দিষ্ট থাকে? হয়তো থাকে, আমরা জানি না। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জগতের কিছু খবর সেই পাখিদের ঘর ভাঙ্গার সময়ের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। এই প্রজন্মের শোবিজ তারকাদের একের পর এক প্রেম, বিয়ে এবং অতঃপর বিচ্ছেদের ঘটনা নিয়ে উঠেছে আলোচনার ঝড়। চলছে সমালোচনাও।
এসব ঘটনা এবং তার প্রতিক্রিয়া নিয়ে প্রাণের বাংলা কথা বলেছে সমাজবিজ্ঞানী ও চিকিৎসকদের সঙ্গে। তাদের বিশ্লেষণ নিয়েই এই সংখ্যা প্রাণের বাংলার এবারের প্রচ্ছদ আয়োজন।

এ বছর চলচ্চিত্রের তারকা অভিনেতা শাকিব খানের গোপন সংসার হঠাৎ করেই ভাঙ্গনের মুখে পড়ে গরম খবরের উৎস হয়ে উঠেছিলো। অভিনেত্রী অপু বিশ্বাসকে কয়েক বছর আগে গোপনে বিয়ে করেছিলেন শাকিব। সেই অপু বিশ্বাস তার সংসার ভাঙ্গার খবর নিয়ে টিভি পর্দায় হাজির হলে, শাকিবের ভক্তকূল নড়েচড়ে বসেন। সে খবরটিও বেশ অনেকটাই থিতিয়ে আসতে না আসতেই গায়ক ও অভিনেতা দম্পতি তাহসান ও মিথিলার ডিভোর্সের ঘোষণা আবারও এই আলোচনাকে সামনে নিয়ে আসে। ২০শে জুলাই তাহসান মিথিলা ঘোষণা দেন তাদের বিচ্ছেদের।  সংসারে আছে তাদের একমাত্র কন্যা আইরা তাহরিম খান। এতটা বছর একসঙ্গে থাকার পর তাহসান-মিথিলার এমন বিচ্ছেদ অবাক করেছে সবাইকে।

১১ বছরের সংসারের অবসান হলো তাদের। এতটা বছর এক ছাদের নিচে থাকার পর তাদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। অনেক চেষ্টা করেও নাকি তারা একে অন্যকে মানিয়ে নিতে পারেননি  মিডিয়ার কাছে তারা এমনটাই জানিয়েছেন।তারপর? তারপর কাজে ফিরে গেছেন এই দম্পতি। তাহসান মঞ্চে সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন। মিথিলা দাঁড়িয়েছেন ক্যামেরার সামনে অভিনয়ের জন্য।
কেন ভাঙ্গে সংসার? এমন প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেয়া খুব মুশকিল। অল্পশিক্ষিত, কম শিক্ষিত শুধু নয়; উচ্চ শিক্ষিত পরিবারেও এ ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। সমাজ বিশ্লেষক ও মনবিজ্ঞানীরা বলছেন, সামাজিক অস্থিরতা, সমাজের নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আগ্রাসন, নারী ও পুরুষের ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব আর তারসঙ্গে হাত ধরে থাকা পরকীয়া প্রণয়ের সম্পর্ক এ ধরণের বিচ্ছেদের ঘটনার পেছনে দায়ী।সমাজের নানামুখী প্রবাহের দিকে নজর রাখেন এমন মহলগুলো মনে করছেন, মাদকাসক্তি এ ধরণের ঘটনার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে ইয়াবা নামের ওষুধটি নারী অথবা পুরুষ নির্বিশেষে বহুল ব্যবহৃত হয়ে উঠেছে। চিকিৎসকরা বলছেন, স্নায়ু উত্তেজক এই নেশা সংসার ভাঙ্গার পেছনে পরোক্ষ ভূমিকা রাখছে। মনের স্থিতি নষ্ট করে দেয়া এই বিশেষ ধরণের ড্রাগ মানুষের মনের ওপর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরী করছে। একজন নারী অথবা পুরুষ এই নেশায় আসক্ত হয়ে বেশী মাত্রায় স্পর্শকাতর হয়ে উঠছে। ফলে নিয়ন্ত্রের বাইরে চলে যাচ্ছে তাদের আচরণ, কার‌যকলাপ।

সম্প্রতি এক জরিপে দেখা গেছে ৭০ দশমিক ৮৫ ভাগ নারী এবং ২৯ দশমিক ১৫ ভাগ তালাক দিচ্ছেন পুরুষরা। ঢাকা সিটি করপোরেশন দক্ষিণ ও উত্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০১০-২০১৬ সাল পর্যন্ত রাজধানীতে তালাকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫২ হাজার। গতবছর এই সংখ্যা ছিল সাড়ে ৬ হাজার। যা ২০১৫ সালে ছিল প্রায় ৯ হাজার। এর আগে ২০১৪ সালে ৮ হাজার ২১৫টি, ২০১৩ সালে ৮ হাজার ২১৪, ২০১২ সালে ৭ হাজার ৯৯৫, ২০১১ সালে বিয়ে বিচ্ছেদ হয়েছে ৫ হাজার ৩২২ এবং ২০১০ সালে বিয়ে বিচ্ছেদ হয়েছে সাড়ে ৫ হাজার। প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০টির মতো বিচ্ছেদের আবেদন জমা হচ্ছে।

একজন জনপ্রিয় শিল্পীকে অনুসরণ করেন তার লক্ষ-কোটি ভক্ত। সেদিক থেকে এসব বিচ্ছেদ কিংবা স্ক্যান্ডাল আহত করে সেই শ্রোতা-ভক্তদের।আর শোবিজের মানুষগুলো সম্পর্কে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয় তাদের মধ্যে । সুতরাং, এই বিষয়ে শিল্পীরা সচেতন না হলে আরো বেশি ইমেজ সংকটে পড়বে সংস্কৃতিক অঙ্গন, এমনটাই বলছেন সবাই।

গেল বছর দেশের ছোট ও বড় পর্দার অভিনেত্রী সোহানা সাবার ঘর ভাঙ্গার সংবাদ নিয়ে মুখর হয়ে উঠেছিল মিডিয়া। জোর আলোচনা চলেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। স্বামী পরিচালক আরমান পারভেজ মুরাদকে ছেড়ে একমাত্র পুত্র সন্তানকে নিয়ে আলাদা হয়ে গেছেন সাবা। তবে গণমাধ্যমের কাছে বিচ্ছেদের কারণ নিয়ে মুখ খোলেননি তিনি।

জনপ্রিয় গায়ক হাবিব ওয়াহিদের সঙ্গে তার স্ত্রী রেহানের পাঁচ বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসান হয় কয়েক মাস আগে। হাবিব ঘোষণা দেন স্ত্রীর সঙ্গে তার বনিবনা না হওয়ায় দুজন মিলেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অথচ তার স্ত্রী রেহান জানান মডেল-অভিনেত্রী তানজিন তিশার সঙ্গে সম্পর্কের রেশ ধরেই হাবিবের সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয়েছে। এমনকি তিনি অভিযোগ করেন তিশার সঙ্গে নাকি হাবিব লিভ টুগেদারও করছেন।

২০১৪ সালের ১লা আগস্ট ভালোবেসে মডেল-অভিনেত্রী সুজানা জাফরকে বিয়ে করেছিলেন হৃদয় খান। বছর  ঘুরতে না ঘুরতেই তাদের বিচ্ছেদ ঘটে। বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তের কথা একটি ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে জানান দেন হৃদয়। আর মিডিয়াকে সুজানা হৃদয়ের বিরুদ্ধে তাকে ও তার পরিবারকে বার বার অসম্মান করার কথা জানান।  ফলে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। অবশেষে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত।তাদের এই বিচ্ছেদে বিস্মিত হয়েছেন তাদের ভক্তরা।

জনপ্রিয় তারকা জুটি শখ-নিলয়। বছর না গড়াতেই বিয়ের সমাপ্তিরেখা টানার খবর।নায়িকা মাহিয়া মাহির তালাকের কাহিনী তো আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে।

অন্যদিকে সংগীতের আরেক ক্রেজ আরফিন রুমি ২০০৮ সালে অনন্যাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু এক বছরের মাথায় আমেরিকায় শো করতে গিয়ে কামরুন্নেসার সঙ্গে পরিচয় হয় তারপর প্রণয়। ২০১২ সালে তাকে বিয়ে করেন রুমি। পরবর্তীকালে অনন্যা রুমির বিরুদ্ধে নির্যাতনের মামলা করেন। অবশেষে ২০১৪ ভরণপোষণের অর্থ দিয়ে অনন্যাকে পাকাপাকিভাবে তালাক দেন রুমি। তাদের ঘরেও আছে আরিয়ান নামের একটি পুত্রসন্তান।

ক্লোজআপ ওয়ান তারকা সালমা গতবছর আগে স্বামী শিবলী সাদিককে ডিভোর্স দিয়েছেন। দিনাজপুর-৬ আসনের এমপি শিবলি সাদিককে ২০ লাখ টাকা দিয়ে রফাদফা করতে হয়েছে।

অভিনেতা ও মডেল শিমুলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রেমের সংসারের ইতি টেনে গত বছর ১৪ জানুয়ারি অভিনেতা নাঈমের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধেন মডেল ও অভিনেত্রী নাদিয়া।

এর রেশ না ফুরাতেই জানা গেল পরকীয়ার জেরে ভাঙছে সঙ্গীত পরিচালক ইবরার টিপুর সঙ্গে স্ত্রী মিথিলার দীর্ঘদিনের বৈবাহিক সম্পর্ক।

জানা যায়, বছর না পেরুতেই স্বামী মাহিম করিমের সংসারের ইতি টেনে মেয়েকে নিয়ে আলাদা থাকছেন জনপ্রিয় মডেল ও অভিনেত্রী সারিকা।

২০১৬ সালের ১৩ আগস্ট মনোমালিন্য ও মতের অমিলের যুক্তিতে ফেসবুকে দ্বিতীয় সংসারে দাঁড়ি দেয়ার ঘোষণা দেন মডেল ও অভিনেত্রী শ্রাবস্তী দত্ত তিন্নি।

সারা পৃথিবীজুড়ে শোবিজের সঙ্গে জড়িত তারকাদের জীবনে এই ভাঙ্গা গড়ার খেলা নিরন্তর চলছে। এই কিছুদিন আগে হলিউডের তারকা দম্পতি অ্যাঞ্জেলিনা জোলি আর ব্র্যাড পিট তাদের সংসার জীবনের ওপর ইতি টেনেছেন। সেখানেও তাদের ভক্তকূল মহা শোরগোল তুলেছিলেন এই খবরে। তারপর বিষয়টা থিতিয়ে গেছে।কিন্তু তাহলে বাংলাদেশে এ ধরণের সংবাদ সমাজকে এতোটা আলোড়িত করছে কেন? আমাদের সমাজ কাঠামোর গঠন এবং প্রচ্যের সংস্কৃতিই সম্ভবত এই প্রতিক্রিয়ার উৎস। অনেকে বলছেন, শুধু তারকাদের জীবন নয় গোটা সমাজের ভেতরেই এই বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে চলেছে।

সমাজবিজ্ঞানী প্রফেসর মেহতাব খানমের মতে দুটি কারণে ইদানিং বিবাহ-বিচ্ছেদ বাড়ছে। প্রথমত, মেয়েরা আগের চেয়ে বেশি শিক্ষিত হচ্ছে।কারণ তারা এখন অনেক সচেতন। মুখ বুজে নির্যাতন সহ্য না করে ডিভোর্সের পথ বেছে নিচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, মোবাইল কোম্পানিগুলোর নানা অফার, ইন্টারনেট, ওয়েবসাইট, ফেসবুক এবং পর্নোগ্রাফির মতো সহজলভ্য উপাদান থেকে আকৃষ্ট হয়ে মূল্যবোধ ও নৈতিকতা হারাচ্ছেন। ফলে বিয়ের মতো সুদৃঢ় সম্পর্ক এবং নৈতিক বিষয়টি ছিন্ন করতে একটুও দ্বিধা করছেন না তারা।
এই বিচ্ছেদে পুরুষের চেয়ে নারীরাই নারীরাই এগিয়ে আছেন।তবে শিক্ষিত কর্মজীবী নারীরা বিবাহ-বিচ্ছেদে এগিয়ে রয়েছেন বেশী।

স্বাগতা জাহ্নবী
ছবিঃ গুগল