তারামন বুবু, তুমি সত্য, তুমি সুন্দর, তুমি আমাদের সাহস

লুৎফুল কবির রনি

চৈত্র দিনের কথা। সময়টা কেমন যেনো, একটা গুমোট ভাব চারদিকে। ভ্যাপসা গরম। ঠিক যেনো রাজনীতির মতো। রাজনৈতিক আবহাওয়াও উত্তাল। মানুষ প্রায়ই গুজব ছড়াচ্ছে, বাতাসে কত রকমের গুঞ্জন। প্রতিদিন দেশের দৃশ্যপট একটু একটু করে পাল্টাচ্ছে।
সময়টা যে একাত্তর!

একাত্তর এমনই এক সময়, যেনো মানুষের বেঁচে থাকার উপরই অলিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে কেউ। যেনো এদেশে কারো বেঁচে থাকাটাই বড় অপরাধ। জীবন বাঁচাতে মানুষ শুধু ছুটছে, শহর থেকে শহরে, গ্রাম থেকে গ্রামে। তবুও রেহাই নেই। রেহাই পাওয়ার যেনো কোনো নিয়ম নেই।

তারামন বিবি এসবের কিছু জানতেন না। বুঝতেন না। যুদ্ধের বারুদের উত্তাপ তখনো তার গ্রামকে ছুঁয়ে যায়নি। ছুঁয়ে যায়নি তারামন বিবিকেও। নির্ভার ছিলেন। বয়স মাত্র চৌদ্দ। এই বয়সী মেয়েরা যেমন হয়,স্বপ্ন দেখার ব্যামো। তারামন বিবিরও তা-ই হয়েছিলো। আর কিছুদিন বাদে তার বিয়ে হবে, স্বামী সংসার হবে। বাচ্চা কাচ্চা হবে। তারা হাসবে, কাঁদবে -এসব দেখে বারবার তিনি মুগ্ধ হবেন। জীবন কেটে যাবে নিস্তরঙ্গ আনন্দে। বেঁচে থাকা হবে অসাধারণ আনন্দময় ব্যাপার।
কিন্তু সময়টা যে একাত্তর!

একাত্তর মানেই বেঁচে থাকার উপর অলিখিত অবরোধ। তারামন বিবিরা থাকতেন কুড়িগ্রাম এ। কুড়িগ্রামের রাজীবপুরের শংকর মাধবপুর ইউনিয়ন। এখানে নিজ বাড়ি। সুপারি গাছ, পেয়ারা গাছ, নিজের আপন করে নেয়া আলো বাতাস। নিজের পরিচিত কিছু শ্বাস প্রশ্বাস। কিন্তু থাকতে পারলেন না এখানে। শান্ত স্নিগ্ধা গ্রামেও তোলপাড় শুরু হলো। মুক্তি সংগ্রামের আচঁ লাগতে শুরু হলো গ্রামে।

সেই প্রথম বুঝলেন তারামন বিবি, দেশটা আগের মতো নেই। সবাই পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কার যেনো ভয়, কি যে ভয়! ওরা কারা? তারামন বিবি তাদের দেখেননি, কিন্তু অবচেতন মনে কিছু ভয় তারও জমা হয়েছে।

তারামন বিবিরা নৌকায় করে রাজীবপুরের আরেক ইউনিয়নে গেলেন। কোদালকাঠিতে। নতুন জায়গা কিন্তু তারামন বিবির মায়ের মনে হাজার বছরের পুরানো ভয়। বাপ মরা এই সাত সন্তানকে নিয়ে তিনি কোথায় যাবেন আর! কতদিন লুকিয়ে রাখতে পারবেন! তিনি শুনেছেন মিলিটারি পাকিস্থানী হায়েনারা নাকি অল্প বয়সী মেয়েদের ধরে নিয়ে যায়। ভয়ের শীতলা স্রোত ভয়ে যায় তারামন বিবির মায়ের মনে।

এদিকে মানুষ বাড়ছে কোদালকাঠিতে। পেট বাড়ছে অথচ খাবার নেই, কাজ নেই কোথাও। তারামন বিবি কাজ খোঁজেন। মানুষের বাড়ির ঘরোয়া কাজ। কাজ পেলে কিছু খেতে পারেন। নাহলে না। সময়টা তাদের পক্ষে নেই, কারো পক্ষেই নেই অবশ্য। কিন্তু একদিন বিশেষ দিন। তারামন বিবি কচুরমুখী তুলছিলেন। ভর দুপুরের কথা। বয়স্ক এক লোক তারামন বিবির দিকে এগিয়ে আসছেন। তারামন জানে সময় ভালো না। সে চলে যেতে নিলো কিন্তু তার আগেই লোকটা তাকে বললো, এই মেয়ে শুনো। ভয়ে ভয়ে তারামন তার সামনে দাঁড়ালো।

-নাম কি মা তোমার?
-তারামন। আমার নাম তারামন বিবি।
-শুনেছি তুমি বাড়িতে বাড়িতে কাজ করো?
-জি।
-আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে কাজ করবে?
-কি কাজ?
-আমাদের জন্য ভাত রাইন্ধা দিবা, আমাদের সাথে কাজ করবা। কি পারবা না মা?

লোকটার নাম মুহিফ হালদার। মুক্তিযোদ্ধা। তার কন্ঠে মা ডাক শুনে তারামন বিবির মায়া লাগতে লাগলো। তাছাড়া সেই দু:সময়ে যেনো নতুন করে শক্তি পেলেন তারামন। এমনিতেও তার মাথার উপর ছায়া নাই যার ভরসায় বেঁচে থাকা যাবে। আর মরতে তো হবেই। সবাই মরবে। এমনি শুধু শুধু মরার চেয়ে যুদ্ধের মরণ বেশি ভালো মনে হলো তারামন বিবির কাছে। কিন্তু আগে মায়ের অনুমতি নিতে হবে।

সেদিন সন্ধ্যায় আজিজ মাস্টার আর মুহিফ হালদার গেলেন তারামন বিবির বাড়ি। মাস্টার সাহেবের কথায় কিছুটা ঘাবড়ে গেলেন মা। ক্যাম্পে নিলে এই মেয়ের ভবিষ্যতে আর বিয়া দেয়া যাবে না। মানুষ নানান কথা বলবে। মইরা গেলে তো যন্ত্রণা শেষ কিন্তু বাঁচলে যন্ত্রণার ইতি হবে না। তবুও মা বললেন, “দেশ স্বাধীন হইবো তো?”

তারামন বিবির নতুন জীবন শুরু হলো।

’৭১ এ চৌদ্দ বছর বয়সের এক বাচ্চা মেয়ে।
কমান্ডারের নির্দেশে- একটা কলাগাছ বুকে নিয়ে নদী পার হয়ে পাকিস্তানী ক্যাম্পে গেলেন গুপ্তচর হিসেবে।
সারা রাত নদী সাঁতরে ওই একা কিশোরী খরস্রোতা নদী পার হলেন। শত্রু শিবির কাছেই।

নোংরা কাপড় আর চুলের মধ্যে কাদা মেখে ‘পাগলীর’ বেশ ধরলেন।

সারা শরীরে পায়খানা মেখে ঘুরতে থাকলেন ক্যাম্পের আশেপাশে। চারদিকে বমি আসার মতো নোংরা দুর্গন্ধ আর চিৎকার চেচামেচি করে মিলিটারি ক্যাম্পের সবাইকে বুঝালেন- তিনি আসলেই পাগলীনি।

দিন দিন এভাবেই- তারামন বিবি পকিস্তানি ক্যাম্পের সমস্ত খবরাখবর নিয়ে আসতেন।

কতগুলো অস্ত্র আছে। কয়টা মেয়ে ক্যাম্পে প্রতিদিন ধর্ষিত হচ্ছে। পাকিস্তানি আর রাজাকাররা কোথায় ক’টায় অপারেশন চালাবে। সমস্ত ফিরিস্তি তিনি পাচার করে দিতেন মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে।

অথচ এই সংগ্রামী তারামন বিবির কিশোরবেলার স্বপ্ন ছিলো রোজগেরে গিন্নি হওয়ার। গোলাভরা ধান ছিলো। ঐশ্বর্য্য ছিলো। পাকিস্তানি মিলিটারি এসে তছনছ করে দিয়েছিলো সব।

সেই ঘরছাড়া কিশোরী মেয়ে মায়ের সঙ্গে ভিক্ষে করতেন।
কচুর মাথা সেদ্ধ করে পেট চালাতেন।

অন্য গাঁয়ে শরনার্থী হওয়ার পর কাজ পেলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের ভাত রেঁধে দেয়ার চুক্তি হিসেবে।

মুক্তিযোদ্ধাদের কমান্ডার আজিজ মাস্টার তাকে রাজি করিয়েছিলেন নিজের ‘ধর্ম মেয়ে’ বানিয়ে।

বলেছিলেন- পাকিদের ক্যাম্পে প্রতিদিন ধর্ষিতা বোনদের জন্য হলেও উনি যেন মুক্তিযোদ্ধা ভাইদের এটুকু সাহায্য করেন।

এমনিতেও রাজাকারের ধরে নিয়ে যাবে, এজন্য খুঁজছে।

নিজের ধর্ম বাপের কথায় রাজি হয়ে তারামন বিবি ভাত রাঁধবার চাকরি নিয়েছিলেন,পেটের তাগিদে। নিরাপত্তার খাতিরে।

কিন্তু হাড়ি মুছতে গিয়ে একদিন ভারী অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন- আদর্শের জন্যই।
চোখ বন্ধ করলে সে আদর্শ টের পাওয়া যায় না।

কিন্তু দৃশ্যটা কল্পনা করতে চেষ্টা করতে পারা যায়।

যুদ্ধের গুলাগুলির মধ্যে গেরিলাদের ভাত রেঁধে দিচ্ছে এক ১৪ বছরের কিশোরী।

ভাইদের প্রয়োজনে- পাকিস্তানী ক্যাম্পে শরীরে পায়খানা মেখে পাগলিনী বেশে গুপ্তচর দিন কাটাচ্ছেন সেই তারামন বিবি।

গাছের ডগায় উঠে পাকিদের অস্ত্র গুণতে থাকা এক চঞ্চল জেদী পাগলিনী।

তারপর একদিন নিজেই মুক্তিযুদ্ধের রণাংগনে অস্ত্র চালনা করা বীর প্রতীক বিবি।

১৪ বছরের ছিপছিপে তরুণী দিনের পর দিন নোংরা ডোবার মধ্যে দিয়ে রেকি করছেন।
পৃথিবীর সেরা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত শত্রুসৈন্যের বুকের দিকে তাক করে স্টেনগান চালাচ্ছেন।

আর ওই পবিত্র সুন্দর হাতে গুলি লেগেছে। দরদর করে রক্ত ঝড়ছে। তবুও দেশ স্বাধীন অবধি চলেছিল যার সংগ্রাম।

দেশ স্বাধীনের পরেও কি কম? এই দেশ তাকে কতটুকু মূল্যায়ন করতে পেরেছে?

১৯৯৫ সালে ময়মনসিংহের এক গবেষক তাকে খুঁজে পান। সেবছর তাকে স্বাধীনতা যুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বীরত্বের পুরস্কার দেয়া হয়। বাংলাদেশে দুইজন মাত্র খেতাবধারী নারী মুক্তিযোদ্ধা আছেন। তারামন বিবি একমাত্র নারী যিনি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছিলেন। সম্মুখ যুদ্ধে সবার মতো অংশ নিয়েছিলেন। এজন্যে তারামন বিবিকে বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করা হয়।

তবে তারামনদের কেউ মনে রাখেনি। নারী বলেই কি না কে জানে, অবহেলায় অবহেলায় এতো বেলা পার করে দিলেন তারামন। তবুও তারামন নামের এক পাগলি, স্বপ্নালু, চঞ্চল, সাহসী মেয়ের গল্প আমাদের মনে থাকবে। তারামন বুবু, তুমি সত্য, তুমি সুন্দর, তুমি আমার সাহস!

মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবি চলে গেলেন আজ।
এই যে ত্যাগ তিতীক্ষা আর সংগ্রামের জন্য যে বারুদ লাগে। যে আদর্শ লাগে। তার নাম- দেশ, মাটি আর মা।
সেই স্বাধীন মাটিতেই শয়ন নিলেন, আজ তারামন বিবি।

ছবি: গুগল