তারা ভালোবেসেছিলেন…

উল্লাস চট্টোপাধ্যায়

তখন মহারাণী ভিক্টোরিয়ার রাজত্ব।১৮৯৯ খ্রীস্টাব্দ।এক নামকরা মাসিক বাংলা পত্রিকার নবীনা সম্পাদিকা ও এক  উঠতি নবীন লেখকের মধ্যে প্রণয় হয়ে গেলো। প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে… স্বয়ং যিনি লিখলেন তার অজানা রইলো না এই প্রেম কথা।১৮৯৯ তে সেই তরুণীটি যখন পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব নিলেন তখন

সরলা দেবী

পত্রিকার বয়স কিন্ত ২৩ বছর।উঠতি লেখকটি গোঁড়া রবীন্দ্রভক্ত।কবিতা লিখতেন ।মাঝে মাঝে গল্প।রবীন্দ্রনাথের থেকে ১২ বছরের ছোট এই নবীন লেখককে রবীন্দ্রনাথ শেখাতেন কেমন করে ছোটগল্প লিখতে হয়।এই নবীন  লেখকের জীবনে ইতিমধ্যে ঘটে গেছে একটি গুরুতর বিপর্যয়।স্ত্রী বিয়োগ ঘটে তার হঠাৎ।বাবাও।কিন্ত তার মুখে সবসময় লেগে থাকত স্নিগ্ধ মৃদু হাসি। সামান্য মাইনে কষ্ট করে সংসার চালান এই নবীন লেখক।

নিয়মিত ঠাকুরবাড়িতে আসতেন তিনি। সাদামাটা অথচ বুদ্ধিমান হাসিখুশি এই তরুণ সকলের সঙ্গে তরুনী সম্পাদিকার মনে যে কখন দাগ ফেলতে শুরু করেছেন দু’জনে কেউ বুঝতে পারেননি।বুঝেছিলেন কিন্ত রবীন্দ্রনাথ।তিনি চাইছিলেন দুজনের মধুর সম্পর্কটি আরো নিবিড় হোক।একজনের কাছে অন্যের এমন প্রশংসা করতেন কেউ বুঝতেই পারতেন না এর পিছনে বক্তার কি উদ্দেশ্য।

তরুণী সম্পাদিকা মায়ের মত সুন্দরী না হলেও বিদূষী কিন্ত। ব্যক্তিত্বসম্পন্না ও দৃঢ় মানসিক গঠন তাঁর। এদিকে নবীন সাহিত্যিকের সঙ্গে নিয়মিত দেখা হতে লাগলো।কাজের সূত্রে অবশ্যই। কিন্ত সময়ের বিচারে এটাও বৈপ্লবিক।সে যুগে স্ত্রী স্বাধীনতার সবে কুঁড়ি ফুটছে। সেটা আবার সীমাবদ্ধ ঠাকুর বাড়ীর মত কয়েকটি পরিবারে।তরুণ তরুণীর নিভৃতে দেখা হওয়া , মন দেওয়া নেওয়ার অবকাশ অসম্ভব।কিন্ত স্বয়ং বিধাতা যদি চান আর স্বয়ং প্রেমের রবি যেখানে ফাঁদ পেতেছেন সেখানে ওই সাহিত্য আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে কখন দু’জনের মনের অনুরাগের নিভৃত পাপড়িটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়ে গেলো।

প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়

এবার তো সৌরভ চাপা দিয়ে রাখা যাবেনা।প্রণয়ের সংবাদ একে একে গুরুজনদের কানে পৌছাতে লাগলো।সবাই রাজী।শুধু আগের পক্ষের দুটি সন্তান একটু বাধা হয়ে উঠছিলো।স্বয়ং পাত্রী কিন্ত একে বাধা বলে মনে করলেন না এবং বিয়েতে সম্মতি জানালেন। আর একটা কথা উঠলো।ছেলে ভালো ।কিন্ত সামান্য চাকরি। ভাবনা হচ্ছিলো এমন বিদূষী কন্যার সঙ্গে এ পরিণয়ে অর্থনৈতিক সমস্যা যদি দেখা দেয়। সব সমস্যার সমাধান করলেন সত্যেন্দ্রনাথ। সমস্ত খরচ নিজে দিয়ে ব্যরিস্টারি পড়াতে বিলেতে পাঠালেন তরুন লেখক পাত্রকে।

ব্যরিস্টার হয়ে দেশে ফিরলেন পাত্র। ১৯০৩ ডিসেম্বর সময়টায়। রক্ষণশীলা মা ছেলের বিয়েতে মত তো দিলেনই না উল্টে ঘোষনা করলেন যে এই বিয়ে হলে তিনি আত্মঘাতী হবেন।তিনি বিলেত যাওয়ার ব্যাপারটা জানতেন না। সবাই চমকে গেলেন।অন্ধকার নেমে এলো যেন দু’জনের জীবনে এবং পুরো ঠাকুর পরিবার আকস্মিকতায় একটু হলেও দুঃখ পেলো।

তখন পাত্রীর বয়স ৩৩। যুগের হিসেবে বেশ বেশি। মা বাবা সবাই উপযুক্ত পাত্র খুজঁতে লাগলেন।পাঞ্জাবী এক সুদর্শন শিক্ষিত পাত্র পাওয়া গেলো।বিয়ে হয়ে গেল তরুনী সম্পাদিকার রামভজ দত্ত চৌধুরীর সঙ্গে।এই দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতিতে কিন্ত সত্যেন্দ্রনাথ থেকে রবীন্দ্রনাথ সকলের সঙ্গে তরুণ লেখকের হৃদ্য সম্পর্ক নষ্ট হয়নি।কিন্তু এক বৈপ্লবিক প্রেমের সমাধি ঘটলো ।

এই তরুণ লেখক ধীরে ধীরে লেখক হিসেবে জনপ্রিয়তার উচ্চ শীর্ষে উঠতে লাগলেন।এই লেখকের সততা ও গভীর ভালোবাসার দিক হলো তিনি ব্যরিস্টারি করলেন না, আর সারাজীবন একা রয়ে গেলেন।বিয়ে তিনি আর করেননি।

ছোটগল্পে রবীন্দ্রনাথের পরেই তাঁর স্থান। বেশির ভাগ গল্পে, লেখায় , এমনকি দাম্পত্যজীবন বর্ণনায় এক সুমধুর নির্মল হাস্যরসোজ্জ্বলতা সকলকে মুগ্ধ করে দিতো।কেউ বুঝতেই পারতো না এই হাসির গভীরে কত বেদনা তিনি লুকিয়ে রেখেছেন।কিন্ত একা নিভৃত অবকাশে রক্ত ঝরতো হৃদয় গভীরে, বেদনার কাঁটার যন্ত্রণা হাসির আড়ালে চাপা দিয়ে রাখলেন সারাজীবন, এই মানুষটি।

হয়তো কখনও তাঁর প্রিয় কবি মুদিত নয়নের সামনে এসে দাঁড়াতেন

যা হবার তা হবে।
যে আমারে কাঁদায় সেকি অমনি ছেড়ে রবে?
পথ হতে যে ভুলিয়ে আনে পথ যে কোথায় সেইতো জানে/
ঘর যে ছাড়ায় হাত সে বাড়ায়-সেই তো ঘরে লবে।।

তরুণী সম্পাদিকা ছিলেন রবীন্দ্রনাথের দিদি স্বর্ণকুমারী দেবীর মেয়ে জীবনের ঝরাপাতার সরলাদেবী।তাঁকে ভালোবেসে সারাজীবন একা থাকলেন যিনি তিনি প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়।যে সাময়িক পত্রিকার বাতায়নে রচিত হয়েছিলো এক অনিন্দ্য দুঃখের প্রেম কাব্য তা হলো ভারতী।

ছবি: গুগল