তার আর পর নেই

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ড: সেলিম জাহান

ড.সেলিম জাহান। আমেরিকার মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অভ্যাগত অধ্যাপক হিসেবে পড়িয়েছেন, পড়িয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কাজ করেছেন জাতিসংঘেও। লেখাপড়ার বিষয় অর্থনীতি হলেও লেখালেখি, আর তাঁর চিন্তার দিগন্ত একেবারেই ভিন্ন এক পৃথিবীর গল্প। প্রাণের বাংলার জন্য এবার সেই ভিন্ন পৃথিবীর গল্প ধারাবাহিক ভাবে লিখবেন তিনি। শোনাবেন পাঠকদের নিউইয়র্কের একটি দ্বীপে তার বসবাসের স্মৃতি।

তা’ বছর কুড়ির মতো তো হবেই। রুজভেল্ট দ্বীপের এ আবাসনে উঠে এসেছিলাম ২০০১ সাল নাগাদ। একই দালানবাড়ী, শুধু দশমতলা থেকে ষষ্ঠ তলায় স্থানান্তর। তখন থেকেই তো দেখছি, কোন যতি ছাড়াই। অতি প্রত্যূষকালে আবছা আবছা অন্ধকারের কুয়াশায় চোখে পড়ে। প্রভাতে নিদ্রাভঙ্গের পরেও দেখি। অনেক নি:স্তব্ধ দুপুরেও দেখা মিলেছে – ব্যতয় হয় নি অপরাহ্নেও। যখন ‘সন্ধ্যা নামিছে মন্দ মন্থরে’, তখনও ফাঁকি দেয় নি ওটা। গভীর রাতে তেষ্টা পেলে যখন জল গড়াতে গেছি, তখনও যেন শুনেছি, ‘জেগে আছি’। গত ২০ বছরে এক লহমার তরেও দৃশ্যপট বদলায়নি।

আসলে তেমন কিছুই নয়, মাত্র দু’টো বাতি – হলদে, বিবর্ণ, বুড়ো মানুষের ঘোলাটে চোখের মতো দু’টো বিজলী বাতি। একটি বহু পুরোনো বাড়ীর জানালা থেকে যেন তাকিয়ে আছে। দু’পাল্লার জানালার দু’টো ফাঁক দিয়ে যেন ইশারা করছে আমাকে। মাঝে মাঝে বাতি দু’টোর দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছে যে জন্ডিসের পীতাভ চোখ নিয়ে একটি কালো বেড়াল যেন ঘাপটি মেরে বসে আছে।

আমাদের আবাসিক ভবনের ছ’তলার বাড়ী থেকে দেখা যায় সামনের এক চিলতে সবুজ মাঠ। সেটা পেরিয়ে নদীপাড়ের পথ। তারপর বয়ে চলেছে পূর্বী নদী, যার ওপারে ম্যানহ্যাটনের আকাশরেখা জুড়ে সুউচ্চ হর্ম্যরাজি। বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটু বাঁয়ে তাকলেই চোখে পড়ে কর্ণেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের দিবাগত শৈল্যচিকিৎসার ভবনটি। ও ভবনের একদম ওপরতলার জায়গাটিকে এত দূর থেকেও চিহ্নিত করতে পারি। একটা সময়ে বহুক্ষন কেটেছে আমার সেখানে।

ডানে তাকালে বিরাট সুউচ্চ কালো যে ভবনটি দৃষ্টি কাড়ে, অনেক আগেই বুঝে গেছি যে ওটা একটা দাপ্তরিক ভবন। সকাল ৯টা নাগাদ তার সব গবাক্ষ পথে আলো জ্বলে ওঠে, বিকেল ৬টা নাগাদ সেগুলো নিভে যায়। তখন শুধু সাদা আলোর একটা দীর্ঘ রেখা উঠে যায় পুরো ভবনের একটা অংশ জুড়ে – বোঝা যায় ওটা তুলুনী যন্ত্রের জায়গা।এ দু’য়ের মাঝখানে পাঁচতলা পুরোনো বাড়ীটি গুটিসুটি মেরে সঙ্কুচিত বদনে দাঁড়িয়ে আছে। একসময় হয়তো লাল ইট ছিলো বাড়ীটির – এখন তা’ বিবর্ণ। এ বাড়ীরই পাঁচতলায় দু’পাল্লার জানালা দিয়ে ‘দীঘির ধারে ঐ যে কিসের আলো’র মতো দেখা যায় দু’টো বাতি -একই রকম দেখতে, একই উচ্চতায়, একই গবাক্ষ পথে।যতবার চোখ গেছে সে দিকে গত বিশ বছরে, এ দৃশ্যের কোন হের ফের হয়নি। অকম্প নক্ষত্রের মতো বাতিদুটো স্থির ওখানে। কিন্তু ও ঘরের গবাক্ষ পথ কখনও খুলতে দেখিনি, পর্দাবিহীন ওই জানালা দিয়ে ঘরের অন্য কিচ্ছু দেখা যায় না, দেখিনি কাউকে কোন দিন ওই জানালায় কিংবা ঘরে। বোঝা যায় না ওখানে কেউ কখনো ছিলো কিনা, শুধু দু’টো বাতি নিয়ে ঐ জানালাটি স্থির হয়ে আছে কত দিবস, কত রজনী!

অনেক দিন আমার মনে হয়েছে, হয়তো ঐ ঘর একজন চলৎশক্তিরহিত বৃদ্ধের ঘর। দিনের পর দিন বিছানাই যাঁর ঠাঁই। ছাদ আর দেয়ালের দিকে তাকিয়ে দিন, মাস বছর পার হয়ে যাচ্ছে। ‘গডোর প্রতীক্ষা’র মতো মৃত্যুর জন্য যিনি প্রতীক্ষমান। কখনো মনে হয়েছে হয়তো ও ঘরে আবাস একজন অতি বৃদ্ধার – দুলুনী কেদারাই যাঁর ঠিকানা। পায়ের ওপর মেলে দেয়া শতছিন্ন একটি রঙ্গ-জ্বলা একটি কম্বল, বৃদ্ধার মতো সেটিও বিগতা যৌবনা। বৃদ্ধা আর তাঁর কম্বল দু’জনাই যৌবন স্মৃতি কাতরতায় তাড়িত।আচ্ছা, এমনও তো হতে পারে যে ও’ঘরে দীর্ঘ অসুস্থতায় শায়িত একটি কিশোরী। তার আর মনে পড়ে না তার স্কুলের কথা, বন্ধুদের কথা, মাঠে ভোঁ দৌড়ের কথা। সে জানে, আর কোনদিন কোন কিশোর তার দিকে চোরা চোখে তাকাবে না, সে চুল ঝাঁকালে তা আর কম্পন তুলবে না কোন তরুনের বুকে, তাকে নৃত্যের আমন্ত্রন জানাবে না কোন লাজুক যুবক। সে আর কোনদিন ভালো হয়ে উঠবেনা। একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঐ কিশোরীটি হয়তো পাশ ফিরে শোয়, আর তার আর্তিতে ঘরের বাতাস এমন ঘন হয়ে ওঠে যে তা যেন ছুরি দিয়ে কাটা যাবে।

হয়তো মাঝে মাঝে কেউ ঐ ঘরে আসে – বৃদ্ধের মাথায় হাত রাখে, বৃদ্ধার কম্বলটি টেনে দেয়, কিশোরীর পাশে বসে। কে তাঁরা – বৃদ্ধের কন্যা, বৃদ্ধার পুত্র না কিশোরীর মাতা? না’কি কোন কর্ম-নিয়োজিত সেবিকা মাত্র? সারাদিনে হয়তো বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে ঐ টুকুই যেগাযোগ ঐ ঘরের বাসিন্দাদের। এমনও তো হতে পারে যে ঐ বৃদ্ধ, বৃদ্ধা বা কিশোরীটির অন্ধকারে বড় ভয় -না, তাঁরা আলো ছেড়ে আঁধারে যেতে চায় না। তাই ও ঘরের বাতি জাজ্বল্যমান অনুক্ষন।

কখনো কখনো আমার মনে হয়ছে হয়তো ও ঘর ভুতুড়ে – ও ঘরে ভূতদের বাস। তারা খায়-দায়, দাপিয়ে বেড়ায় ঐ ঘর, লন্ড-ভন্ড করে ঘরের জিনিসপত্র। মাঝে মাঝে এক লহমার তরে যে বাঁ’ দিকের বাতিটি অদৃশ্য হয়ে যায়, তার কারন একটা বাচ্চা ভূত হয়তে ঐ বাতিটি ধরে ঝুলে পড়ে। কোন এক সময়ে ঐ ভূতেরা পায়ে পায়ে জানালার কাছে এসে লুকিয়ে লুকিয়ে বাইরের জগৎটা দেখে, মানুষগুলোর কান্ড দেখে হাসে, ভাবে, তারা কখনো বাইরে আসবে না। কি এমন আছে বাইরে? তারপর রাত গভীর হ’লে তারা খোনা গলায় গান ধরে আর ভূতের নৃত্য জুড়ে দেয়।

হতে পারে, ও ঘরে কিছুই নেই, কেউ নেই। যারা ছিলো, অনেক আগে চলে গেছে। ঐ ঘরে অপঘাতে কোন মৃত্যুর পরে কেউ আর আসেনি।হয়তো যাওয়ার সময়ে বাতি নেভাতে ভুলে গেছে।ঘরের দরজায় ঝুলছে বড় তালা। বহুকাল ঐ মরচে ধরা তালা খুলে ঐ ঘরে কেউ ঢোকে নি, কেউ বারও হয় নি। ঐ ঘরের সামনে দিয়ে যেতে গা ছমছম করে। ‘ঘোড়সওয়ার’ কবিতার মতো কেউ হয়তো জিজ্ঞেস করে, ‘ভেতরে কেউ আছো কি?’ ঘরের সামনে দাঁড়ালে ভেতরে হাওয়ার হু হু শব্দ শোনা যায়। ভালো করে কান পাতলে মনে হয়, ওটা হাওয়া নয়, মৃদু কান্নার শব্দ। ঐ ঘর যেন মৃত, ঐ ঘরে যেন নিস্তদ্ধতাও নিশ্চুপ হয়ে আছে, ওখানে মৃত্যুরও মৃত্যু ঘটেছে।

তারপর হয়তো কোন একদিন ঐ জানালায় কেউ একজন এসে দাঁড়াবে – হয়তো কোন এক রমনী। দু’হাত টেনে খুলে দেবে জানালার পাল্লা দু’টো। জানালা গলিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখবে নীচের রাস্তা, মানুষ, জনপদ।বুকভরে নি:শ্বাস নেবে। মৃদু হাসির চিলিক উঠবে তার ওষ্ঠে – কেন এবং কার জন্যে, কে জানে।

তারপর একসময় সেই মেয়েটি জানালা থেকে সরে যাবে। তারপর ধীর পায়ে গিয়ে হয়তো বাতি দু’টো নিবিয়ে দেবে। তারপর যে ঘোলাটে বাতি কখনো নেভে নি, সে বাতি নিভে যাবে। তারপর? তার আর হয়তো কোন পর থাকবেনা।

লেখক:ভূতপূর্ব পরিচালক

মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং 

দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগ

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী

নিউইয়র্কযুক্তরাষ্ট্র

ছবি: লেখক

 


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box