তাহলে শুরু করা যাক গল্প…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

সর্ষের তেলের ঝাঁজ চোখে এসে লাগে। তবে, পেঁয়াজ দেয় না কিন্তু। এর পরে আছে সরপুঁটির মরিচ পোড়া ঝোল। পাতলা সোনালি তার রঙ। গরমের দিনে শেষবেলায় থাকে আমড়ার ডাল। খেলেই মুখ পরিষ্কার…
কলকাতা থেকে প্রাণের বাংলার জন্য নতুন একটি ধারাবাহিক লিখতে শুরু করলেন অধ্যাপক অমৃতা ভট্টাচার্য। তিনি বলছেন, এই গল্পের নানা পরিসর। আসলে গল্প তো নয়, গল্পের মতো যে জীবন তারই আখ্যান। আপনারা একে ছাপোষা বাঙালির ভাত ডাল মাছের ঝোলের গল্প বলতে পারেন, সে আপনাদের অভিপ্রায়। লেখা পড়তে পড়তে আমাদেরও মনে হয়েছে তেল-ঝাল-ঝোলের জগত নিয়ে নতুন আস্বাদের এই লেখা প্রাণের বাংলার পাঠকদের রসনাকেও তৃপ্ত করবে।

দশ

পুজো-পার্বণ মিটলে বড় পিতলের গামলা, কাঠের বারকোশ, ফুলকাটা রেকাব সব আবার ধুয়ে মেযে ঠাকুরঘরের দেরাজে গিয়ে ওঠে। সেই পুরনো দিনের ভারী পাল্লা। টেনে খোলা যায় না যেন! অনেক টেনেটুনে ধরলে খোলে বটে । ভিতর থেকে একটা ঠাণ্ডা গন্ধ বেরিয়ে আসে। সেই গন্ধে অন্ধকার আর অহংকার মিশে আছে। হিসেবের নিক্তিতে এ বাড়ির গরিমা, মর্যাদার শরিক ওরাও। ওই কাঁসা পিতল আর তামার তৈজস। কত সব বছর ধরে ওরা এ বাড়ির মান মর্যাদার শরিক হয়ে উঠেছে। এদের ক্ষয় নেই, কেবলই আছে পরিমার্জনা। আর বুঝি ক্লান্তি।
খিড়কির পুকুরে সেই যেবার জালিকাটা চন্দনের বাটি খোয়া গেল? সেবার সকলে ধরেই নিলো বান্তি ঝি-ই ওটা চুরি করেছে। এখন এসে হারিয়ে যাওয়ার গল্প বলে সাধু সাজছে। কেউ বললো তিন পুরুষ আগেকার চন্দন বাটি, এ হারানো কি সোজা কথা? এ যে বিষম অমঙ্গলের। কেউ বললো, এত আস্পর্দা ওকে মেরে তাড়িয়ে দাও। মেজ ভাসুরের মুখ থম থম করতে লাগলো রাগে। সকলে এমন ভাব করলো, যেন ওই বাটির জোরেই এ বাড়ির সম্মানটুকু টিকে আছে। বিন্তি কিন্তু মুখ নীচু করে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলো ভয়ে। চুরির ভয়ে না, অপমানের। মৃণাল তা জানে। আর জানে বলেই ওর মন খারাপ হয়ে যাচ্ছিলো ক্রমশ। এ তো আর কিছু নয়, সামান্য একটা চন্দনের বাটি। হতে পারে সেটি পুরনো তবু, কী করবে বিন্তি! খিড়কির পুকুরে বড় ঢালু তলদেশ। পা গড়িয়ে যায় কতো দিন। আর একটা বাটি তলিয়ে গেলে, গড়াবে না?
সারাদিনের জল্পনার পরে বিন্তির শাস্তি ঘোষণা হলো। নতুন লোক হলে তাকে দূর করেই দেওয়া হতো। নেহাত বড়’মার শেষ সময় থেকে আছে তাই সে টিকে গেলো। তবে, শুচিশুদ্ধ ঠাকুর ঘরের কাজে তাকে আর রাখা হলো না। বিন্তি এখন বিচালি কাটে, গোয়াল ঘরে গরুর জাবনা দেয়। ভর দুপুরে লালি আর কালির জন্য কুটনোর খোসা, পাতা এইসব দিয়ে মেশানো ফ্যান বয়ে বয়ে মাঠে নিয়ে যায়। তার যেতে দেরী হলেই লালি আর কালি ডাকাডাকি শুরু করে দেয়। বিন্তি তখন গজর গজর করতে করতে হাঁটা লাগায়। বলে, ‘ কী জ্বালা রে তোদের নিয়ে! একটু কি জিরোতে দিবি না তোরা?’ মৃণাল জানে, এই সবই হলো বিন্তির স্নেহের প্রকাশ। নিঃসন্তান বিন্তির বুক জুড়ে এখন লালি আর কালি। ওদের ডাগর ডাগর চোখে পৌরুষ নেই। বিন্তির জন্য ভালোবাসা আছে। অবলা প্রাণী, কী আর বোঝে! তবু, বিন্তির আদর চায় ওরা। বিন্তির চোর অপবাদ ওরা ধুয়ে মুছে দিয়েছে। মৃণালেরও মনে হয়, খিড়কির পুকুরে বাসন মাজার চেয়ে গরু চড়ানো ঢের ঢের ভালো। ওই মাঠে আলো আছে, সবুজ আছে। ঠাকুরঘরের দেরাজের গন্ধ সেখানে আর নেই। লালি-কালির মা বিন্তি এখন সারাদিনের পর বাড়ি ফিরে মাটির হাড়িতে সেদ্ধ ভাত খাবে। মালসার গন্ধ মিশে থাকবে ভাতে। খাওয়া হলে উনোন নিভিয়ে বিন্তি যাবে, পুকুর ঘাটে। ঠিক পুকুর বলা ভুল। তার বাড়ির পিছনেই ছোট্ট ডোবা। সেই ডোবার ধারে, মালসা জলে ডুবিয়ে রাখবে বিন্তি। ভিজে নরম হয়ে গেলে মাজতে সুবিধে। বিন্তি তাই মালসা ডুবিয়ে ঘরে ফিরবে সুজনির ওম নিতে। কুপি নিভিয়ে মাদুর পেতে নেবে খুব তাড়াতাড়ি। সারাদিনের ক্লান্তিতে তার চোখ জুড়িয়ে তখন ঘুম নামবে অচিরেই। ওদিকে মালসার ভিতরে লেগে থাকা অবশিষ্ট ভাত খুঁটে খুঁটে খাবে মাছেরা। বিন্তির বাড়ির ডোবা জুড়ে তখন মাছেদের কোলাহল। জলে ঢেউ তুলে তারা আসবে যাবে।জলা ঘাস আর জোনাকিদের তখন কতো কথা কতো গল্প।
মৃণাল অনেক দূরে থেকেও এসব টের পায়। ও জানে, মাছেরাও দু’মুঠো ভাত চায়। মাটির গন্ধ চায়। চন্দনের বাটিতে তাদের কোনো লোভ নেই।

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]