তাহলে শুরু করা যাক গল্প…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

কোথাকার জল যে কোথায় গড়ায় তার কী ঠিক আছে! মনের জানলা খুলে তাই বসে থাকতে হয় দিনে রাতে। জানলার শার্সি বেয়ে জলকণারা যেমন গড়িয়ে পড়ে চুপি চুপি ঠিক তেমনি করে ভারী নিঃসাড়ে জীবনের গল্প বর্ষার নদী হয়ে নদীতে মিশতে চায়। বুক ভরে কত কত জল বয়ে নিয়ে চলে নদী, তার সঙ্গে গড়িয়ে চলে নুড়ি পাথর, মাটি, বালুকণা আর রূপোলী মাছেরা। যাদের জীবন নিজের ইচ্ছেয় বা নিতান্ত অভ্যাসে এমনই হাজারটা থোড় বড়ি আর হলুদ-মরিচ নিয়ে উজান স্রোতে এগিয়ে চলে, সে জীবন নদীর মতো বৈকি! সেখানে হাজারো গল্প কত সব সম্ভাবনার মুহূর্ত তৈরি করেও বুদবুদের মতো মিলিয়ে যায় জলের আবর্তে। মৃণাল জানে জীবন এমনই হয়, তাই এই জীবনের অভ্যাস নিয়ে ও কখনও প্রশ্ন তোলে না।  খুব ছোট থেকেই হেঁশেলের আশেপাশে ঘুরে ঘুরে যাদের জীবন কাটে, যারা শিখে নেয় অন্দরের নানা প্রকৌশল, তাদের শিখন রীতির মধ্যে একধরণের নির্মাণ আছে। আর আছে বলেই তো প্রশ্নহীন আনুগত্য আছে। মৃণাল এসব বোঝে। একেকদিন ওর মনে হয় সংসারটা নিজেই আসলে ঘুরছে নিজের ছন্দে, নিজের পাকে পাকে। ও না-চাইলেও এই সংসার ওকে ঠিক ডেকে নেবে নাগরদোলার ঘূর্ণিপাকে। সেই ঘূর্ণি পাকে ক্রমাগত ছড়িয়ে পড়তে চাইছে কত মানুষের নরম শিশির ভেজা মন! তবু কী আশ্চর্য সেই কেন্দ্রীয় টান! ভাবলে ওর খুব অবাকই লাগে কিন্তু। এই যে আজ ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষ, আজ এ বাড়ির বউরা সব চাপড় ষষ্ঠী পালন করবে। পাকুরে চাপড়া ভাসাবে, পিটুলি দিয়ে পুতল গড়বে এর মধ্যেও তো মিশে আছে কত বছরের অভ্যাস আর আবর্ত। এই ব্রত করলে মায়েরা পুত্রের মৃত্যুশোক পায় না। আহারে, মায়েদের শোক নিয়ে সকলে কত ভাবেন! জীবনের এই রাঙচিতার বেড়া ঘেরা পালা-পার্বণ তাই মৃণালকে নিয়ে যায় বিষাদের আর ক্লান্তির মধ্যিখানে। সেই যেখানে ষষ্ঠীর দিনে মেয়েরা ভাতের বদলে ময়দা খায়। লুচির গন্ধে বর্ষার হাওয়া ভারী হয়ে চেপে বসে মৃণালের বুকের ভিতর। আর এভাবেই বর্ষার নিস্তেজ হয়ে আসা একেকটা বেলায় কখনও চাপড় ষষ্ঠীর ব্রতকথা, কখনও মনসার ভাসান ওকে ভারী একলা করে দেয়। সনকা বুঝি চাপড় ষষ্ঠীর মাহাত্ম্য জানতো না? কে জানে! প্রশ্নহীন আনুগত্য শিখিয়েছে নিরামিষ বটি দিয়ে কুমড়ো কাটতে, লুচির ময়দা মাখতে, তাই এই প্রশ্ন তুলে রাখে মৃণাল ওই উঁচু কুলুঙ্গির তাকে, ওই তেলচিটে শিকের বুকের মধ্যে। আর এভাবেই রান্নাঘরের আনাচে কানাচে প্রতিদিন কত যে প্রশ্ন জমতে থাকে! বয়াম ভরে যায়, শিশি বোতল ভরে যায়। কাছারি বাড়ির লাল শালু বাঁধা হলদে কাগজের মতো একটা পুরনো গন্ধ লেগে থাকে তাই ভাঁড়ার ঘরের বদ্ধ হাওয়ায়। লোকে ভাবে ছিটকিনি তুলে দিলেই বুঝি প্রশ্নেরা তামাদি হয়ে যাবে বর্ষার ভিজে হাওয়ায়। ভাবে, এই ভেজা হাওয়া ওদের নেতিয়ে নিস্তেজ করে দেবে। আসলে তেমনটা হয় না। প্রশ্নদের বুঝি বা অক্ষয় পরমায়ু। এ বাড়ি যখন নিদালি মন্ত্রে নিঃঝুম হয়ে যায়, তখন টিকটিকি আর তেলাপোকাদের আসর জমে ভাঁড়ার ঘরে, পাকঘরে। হয়তো মুলতুবি হয়ে থাকা প্রশ্নেরা তখন রাত জেগে জাগরণ পালার উত্তেজনা পোহায় নিস্তেজ উনুনের নিভু আঁচে। অন্তত মৃণালের এমনটা মনে হয় , যদিও ওর মনে হওয়াটা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়, তবুও।
মৃণাল তাই ঠেসে ঠেসে এখন ময়দা মাখছে। আজ লুচি হবে, নারকেল দিয়ে ছোলার ডাইল হবে, কুমড়োর ছেচকি হবে। দিদি শাশুড়ি ভাঁড়ার থেকে তক্তি বের করে দেবেন খানিক। দু’চার দানা গুঁড়ো গুঁড়ো নারকেল তাদের চিনিমাখা শরীর নিয়ে টুপ করে খসে পড়বে এদিক সেদিকে। পিঁপড়েরা আর তেলাপোকারা দেখবে এসব। ভাগ্যিস ওদের পুত্রশোকে কাতর হওয়ার অবকাশ নেই! ওরা তাই জাগরণ পালা শুনে চোখ ভেজায় না। ওরা তাই গুঁড়ো গুঁড়ো তক্তি ভারী আহ্লাদ করে খায়।

ছবিঃ গুগল

 


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments