তাহলে শুরু করা যাক গল্প…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

সর্ষের তেলের ঝাঁজ চোখে এসে লাগে। তবে, পেঁয়াজ দেয় না কিন্তু। এর পরে আছে সরপুঁটির মরিচ পোড়া ঝোল। পাতলা সোনালি তার রঙ। গরমের দিনে শেষবেলায় থাকে আমড়ার ডাল। খেলেই মুখ পরিষ্কার…
কলকাতা থেকে প্রাণের বাংলার জন্য নতুন একটি ধারাবাহিক লিখতে শুরু করলেন অধ্যাপক অমৃতা ভট্টাচার্য। তিনি বলছেন, এই গল্পের নানা পরিসর। আসলে গল্প তো নয়, গল্পের মতো যে জীবন তারই আখ্যান। আপনারা একে ছাপোষা বাঙালির ভাত ডাল মাছের ঝোলের গল্প বলতে পারেন, সে আপনাদের অভিপ্রায়। লেখা পড়তে পড়তে আমাদেরও মনে হয়েছে তেল-ঝাল-ঝোলের জগত নিয়ে নতুন আস্বাদের এই লেখা প্রাণের বাংলার পাঠকদের রসনাকেও তৃপ্ত করবে।

হাওয়ায় লেগেছে শরতের গন্ধ। রোদ্দুরে লেগেছে কাঁচা সোনার বরণ। মৃণাল আজ দেরাজ খুলে বসেছে সক্কাল সক্কাল। বর্ষার গন্ধ লেগে থাকা কাপড়ের পরতে পরতে যেন বিগত জন্মের স্মৃতিরা লুকিয়ে আছে কত অভিমানে। মৃণাল জানে অভিমান পুষে রেখে লাভ নেই। শিউলিরা কেমন ফুল ঝরিয়ে দেয় নির্বিবাদে! কেউ কেউ কাপড় পেতে ফুল কুড়িয়ে নেয় সকাল হলে। ঠিক তেমনই, মৃণালের ভাবতে ইচ্ছে করে, ওই ঝরে পড়া অভিমানদের কেউ আদরে সোহাগে আঁচলে জড়িয়ে নিচ্ছে কোনো প্রত্যাশা না করেই। হয় তো এমন। হয় না! মৃণাল ঠিক জানেনা। মৃণালের দেরাজ তাই আধখোলা হয়ে আলো আর হাওয়ার দিকে হাত বাড়ায়। ওর ভিতরের জমিয়ে তোলা দুঃখের সমুদ্রে ঝড় তুলে সোনার বরণ রোদ্দুরের সঙ্গে ওর মিতালি করার কত শখ। মৃণাল আজ সেজ ননদের হাতে হেঁশেলের ভার তুলে একটু আড়াল খুঁজেছে একা হবে বলে। শরতের রোদ্দুরে ওর আসলে ঘরে মন টেকে না। ওর ইচ্ছে করে পাল তোলা জাহাজ সাজিয়ে নিরুদ্দেশ হতে। তবে, সেই পাল তোলার যখন কোনো সম্ভাবনাই নেই তখন আর কী করে! অগত্যা পুব দক্ষিণ খোলা বারান্দার দরজা এলো করে দিয়ে দেরাজ খুলে বসেছে সওদাগর পুত্তুরের মতো। ওই রঙিণ সাদা জাফরানি কাপড়েরা যেন সেই কোন বাণিজ্য তরীর পসরা। মৃণালের খুব মনে আছে, দিদিমা বলতেন ভাদ্র মাসের অমাবস্যায় দেরাজ বাক্স খুলে কাপড় চোপড় রোদে দিতে হয়। এখন আর দিদিমা নেই কিন্তু শেষ ভাদ্রের রোদে শরতের টান লাগে আজও। এই সময়ে সর্ষে ফোড়ন দিয়ে পাতলা করে দেশি আমড়ার টক খেতে ভারী ভালোলাগে মৃণালের। ওর ভিতরের তেতেপুড়ে থাকা কলিজার আগুন কেমন নিভিয়ে দিয়ে যায় শেষ পাতের ওই অম্বলটুকু। আর পারে বলেই বোধহয় দেশ গাঁয়ের মানুষ এমন করে খাদ্য খাবারের মালা গেঁথেছে রোদ্দুর আর হাওয়াকে ভালোবেসে। এই অভ্যাস তো আর এক প্রজন্মের বিশ্বাসে মানুষ আয়ত্ত করেনি! করা সম্ভবও নয়। মৃণাল জানে ওর ভিতরের আগুনে মাঝে মধ্যেই জ্বলে পুড়ে যায় হেঁশেলের ভূগোল ইতিহাস। মনে যেদিন রাগ গজগজ করে, মাথার পোকারা কুরে কুরে খায় অশান্তির আগুন হয়ে, সেদিন মৃণাল কবজি ডলে ডলে শুকনো মরিচ বাটে। মরিচেরা পেষাই হতে হতে চন্দনের মতো মোলাম হয়ে গেলে যেন খানিক রাগ কমে। কড়াই বসিয়ে দিয়ে মৃণাল তখন আঁচ জোরে ঠেলে দেয়। দাউ দাউ করে আগুনের তাপ এদিক সেদিক দিয়ে বেরিয়ে পড়তে চায় তখন। তেল গরম হয়ে যায় অন্যদিনের চেয়ে কিছু বেশিই সেদিন। মেথি, জিরা সব পুড়ে যায় নিমেষেই। মৃণাল জানে এমনটা করে লাভ নেই কিছু, তবু কেন যে ও নিজেকে সামলাতে পারে না! জোরে জোরে হাত নেড়ে তখন ও মশল্লা কষায়। মশলা কষানো হলে যখন তেল ছেড়ে দেয়, তখন ওর রাগ খানিক পড়ে। দিদি শাশুড়ি ঠিক টের পান। বলেন, আয় বোস আমার কাছে। নিরামিষ হেঁশেল থেকে আমড়ার বা চালতার পাতলা অম্বল বের করে দেন। বলেন শেষ পাতে চুমুক দিয়ে খাস বউ কলিজা জুড়োবে খানিক। কোনোদিন না কাঁচা তেঁতুলের ঝোল দেন ফুলকাটা বাটি ভরে। একটু গলা নামিয়ে বলেন, কারো মাথা গরম হয় কারো বা শরীর। বিধবাদের জীবন তো আমার মতো এত কাছ থেকে তুই দেখিসনি বউ! তাই তুই বুঝবি না। এইটুকু বলেই ভারী বিষাদ আর মায়া ভরা হাসি হাসেন তিনি। মৃণালের দুঃখ তখন খানিক কমে বৈকি। পিঠে আঁচল ফেলে খিড়কির দুয়োর দিয়ে ও তখন চানে যায়। সাঁতরায় এপাড় ওপাড়। চোখ লাল হলে উঠে আসে ভারী শ্লথ পায়ে। এবারে এলো চুল মেলে দিয়ে ও খেতে বসবে একা একা। শেষ পাতে অম্বলের বাটিতে চুমুক দিলে ওর চোখ ভাসবে জলে। অম্বল খেলে বুঝি চোখে জল আসতে আছে?
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]