তাহলে শুরু করা যাক গল্প…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

সর্ষের তেলের ঝাঁজ চোখে এসে লাগে। তবে, পেঁয়াজ দেয় না কিন্তু। এর পরে আছে সরপুঁটির মরিচ পোড়া ঝোল। পাতলা সোনালি তার রঙ। গরমের দিনে শেষবেলায় থাকে আমড়ার ডাল। খেলেই মুখ পরিষ্কার…
কলকাতা থেকে প্রাণের বাংলার জন্য নতুন একটি ধারাবাহিক লিখতে শুরু করলেন অধ্যাপক অমৃতা ভট্টাচার্য। তিনি বলছেন, এই গল্পের নানা পরিসর। আসলে গল্প তো নয়, গল্পের মতো যে জীবন তারই আখ্যান। আপনারা একে ছাপোষা বাঙালির ভাত ডাল মাছের ঝোলের গল্প বলতে পারেন, সে আপনাদের অভিপ্রায়। লেখা পড়তে পড়তে আমাদেরও মনে হয়েছে তেল-ঝাল-ঝোলের জগত নিয়ে নতুন আস্বাদের এই লেখা প্রাণের বাংলার পাঠকদের রসনাকেও তৃপ্ত করবে।

তিন.

সেই যে বড় বউয়ের গল্প বলেছিলাম, তার নামখানিও ভারী চমৎকার! নাম তার মৃণালিণী। কে যে অমন সুন্দর নাম লিখেছিলো তার, কে জানে! সে তো তেমন ডাকসাইটে সুন্দরী নয়। সে বড় সাধারণ। বাংলাদেশের ঘরে ঘরে যেমন মেয়ে বউরা হয় আর কী। সে যখন পাছাপেড়ে শাড়ি পড়ে পেতলের কড়া নামায় তখন গনগনে আঁচে তার মুখখানি রাঙা হয়ে ওঠে। আহা! সে বড় সুন্দর। সেইকোন ছোটবেলায় এ বাড়ির বউ হয়ে এসেছে সে। বাসন্তী পুজোয় যখন মোষ বলি হতো, তখন এই এত্তটুকু মেয়ে খাটের তলায় লুকিয়ে থাকতো ভয়ে। কত সাধ্য সাধনা করে তার শাশুড়ি তাকে বের করে আনতো। তারপর রান্না হতো সেই বলির মাংস। সে কিন্তু মোটেই খেতো না! সবার চোখ এড়িয়ে সে চুপটি করে সরে যেতো অন্য কাজের আছিলায়। এ বাড়ির কত যে সব অদ্ভুত আচার সে এইসবের মানে বোঝে না। তার কেবলই মনে হয় জীবনের বড় অপচয়। ঠিক যেমন, বর্ষায় যখন ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ওঠে তখন ইলিশের ডিমের পাতুরি হয়, ভাজা হয়। মাছগুলো আর খায়না কেউ। জেলেরা,কামলারা সেসব নিয়ে যায় ঝুড়ি বোঝাই করে। আহা রে, মৃণালিনীর শ্বশুরবাড়ি! তাদের কীইবা দোষ! তারা দেশভাগ দেখেনি, জলের লাইন দেখেনি, ফ্যানের জন্য মানুষের হাহাকার দেখেনি। এইসব নানা কথা নানা চিন্তা মাথায় নিয়েই এ বাড়ির বড় বউ রান্না করে, পিঠের দিনে পিঠে গড়ে, আলপনা দেয় যত্ন করে। কত রকমের যে পিঠে! নতুন আতপ চালের গন্ধ আর নতুন গুড়ের মরিচ রঙা বাহার তখন শীতের রোদের মতোই আতপ্ত আদরে ঘিরে ধরতে চায়। সারা রাত্তির জেগে কত কাজ তখন। চিতৈ পিঠে হবে, মুগপুলি হবে, গোকুল পিঠে থেকে রসবড়া, কত যে সব তার যেন অন্ত নেই। রসবড়ার জন্য বিউলির ডাল বাটতে বাটতে কবজিতে ব্যথা করে। তবু, বচ্ছরকার দিন। ব্যথা- বেদনাকে পাত্তা দিলে তখন চলে না। আর, ডাল বাটলেই তো হলো না! ডাল ফেটিয়ে ফেটিয়ে তবে না যুতসই বড়া হবে। গোকুলপিঠের বড়ার জন্য আবার আলাদা গোলা। তার আগে আছে নরম খির্সা বানানোর পালা। সেই খির্সায় ছড়িয়ে দাও জয়িত্রীর গুড়ো। বড় মৃদু অথচ কড়া সে গন্ধ। পৌষের শেষবেলায় ঠিক যেন যুগসন্ধিক্ষণের মতো সেই গন্ধ যেন থমকে থাকতে চায় এইসব জেনানা মহলের অনিদ্রা হয়ে। দুধ চিতইরা তখন তরল অভিমানে ডুবে যেতে চায়। রাতের উষ্ণতা তাদের জন্য নয়। আর আছে রসপুলি সেদ্ধপুলি আরও অনেক অনেক অনেক । বাড়ির বউরা বড় যত্নে এসব বানায়। শরীরের ক্লান্তি তখন সোহাগের তৃপ্তিতে মুছে যেতে চায়। পরিবার পরিজনের মানুষদের খাইয়ে যে আনন্দ সে তো বড় কম নয়! বৈরাগ্য সাধনের মতো সে বড় সাধনার ধন। আমি ঠিক জানিনা, তবে জানতে চাই এই সাধন ধনে মেয়েরা, মায়েরা কি স্বভাবতই ধনী? নাকি ছোটো থকেই তার শরীর আর মন ঘিরে ঘিরে এইসব বিপরীত-রতি বুনে দেওয়া হয়? সব কথার কি উত্তর মেলে? নরম পাটালি দিয়ে গুড়ের পায়েসের কেমন গাঢ় সুন্দর রঙ হয়! আহা। ঘন দুধের আবর্তে গলে মিশে গেলো যে ঘনবস্তু তার কি হারিয়ে যাবার ভয় নেই? নাকি সে ওই মৃণালিনীর মতোই মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতে ভালোবাসে সংক্রান্তির নরম রোদে। তার আধভেজা চুল ঘোমটার ভিতর রয়েই যায় সারা সারা বেলা। আমি জানি ওর খিদে পায়। ও তো ডালিম ফুলি কন্যে নয়, যে কিনা সোনার কাঠির ছোয়ায় ঘুমিয়ে পড়বে। ওর রাগ আছে, খিদে আছে, খেদও আছে বুঝিবা। সে খবর কে রাখে! রাত ফুরোয়। অবশিষ্ট পিঠেরা ওই উঁচু শিকেতে ঘুম যায়। শীতের রাতের উষ্ণতা বঞ্চিত বাঙালিনীর খোঁজ কেই বা রাখে! ঘুমাও মৃণাল, দু দণ্ড জিরিয়ে নাও। আমি ততক্ষণে পক্ষীরাজের পাখা মেলি। তুমি তো একা নও! কত কত মা, মাসি, খালারা ঘুমোয় না কতকাল! সে খবর কি তুমি রাখো? (চলবে)
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]