তাহলে শুরু করা যাক গল্প…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

সর্ষের তেলের ঝাঁজ চোখে এসে লাগে। তবে, পেঁয়াজ দেয় না কিন্তু। এর পরে আছে সরপুঁটির মরিচ পোড়া ঝোল। পাতলা সোনালি তার রঙ। গরমের দিনে শেষবেলায় থাকে আমড়ার ডাল। খেলেই মুখ পরিষ্কার…
কলকাতা থেকে প্রাণের বাংলার জন্য নতুন একটি ধারাবাহিক লিখতে শুরু করলেন অধ্যাপক অমৃতা ভট্টাচার্য। তিনি বলছেন, এই গল্পের নানা পরিসর। আসলে গল্প তো নয়, গল্পের মতো যে জীবন তারই আখ্যান। আপনারা একে ছাপোষা বাঙালির ভাত ডাল মাছের ঝোলের গল্প বলতে পারেন, সে আপনাদের অভিপ্রায়। লেখা পড়তে পড়তে আমাদেরও মনে হয়েছে তেল-ঝাল-ঝোলের জগত নিয়ে নতুন আস্বাদের এই লেখা প্রাণের বাংলার পাঠকদের রসনাকেও তৃপ্ত করবে।

চার.

শীতের সকালে জাড় যেন কাটতেই চায় না। কুণ্ডুলি পাকিয়ে যে নেড়িকুকুর সারারাত উনুনের ওম পোহায়, ভোরের রোদে সে আরেকটু গুটিশুটি মেরে শোয়। বাড়ির বউ মেয়েরা এসে তাকে উঠিয়ে দেয় জোর করে। এখনকি আর ঘুমোবার বেলা আছে? যতসব অনাসৃষ্টি কাণ্ড! এখন উনুন লেপতে হবে। দোরে দোরে জল ছড়া দিতে হবে। বাসি ঘরের বদ্ধ গন্ধ আটকা পড়েছে সারারাতের নৈঃশব্দে। তারাও এখন রোদ্দুর মাখতে চায়। বাড়ির বউরা বাসি কাপড় ছেড়ে তবে না উনোন ছোঁবে! বিগত রাতের আদর মাখা শাড়ি খানির প্রবেশাধিকার নেই এই পাকঘরে। শরিরখানিরও নেই। তাই কাপড় ছাড়তে হয়। শৌচ করতে হয়।আচ্ছা,যৌনতার মধ্যে অশুচি গন্ধ আছে কি?- তার উত্তর জানেনা এরা। শুধু জানে, পাকঘরের শুচিতা রক্ষার দায় তাদের আছে। অবিরত সেই দায় বহন করে যেতে হয় – শীতে, গ্রীষ্মে, আশ্বিনের শারদ প্রাতে।

গত রাতে বড় বাটিতে ডাল ভিজিয়ে রাখা হয়েছে। সেসব বেটে ধোকার ডালনা হবে আজ। তক্তি কাটার পিড়িখানি টেনে বের করে মৃণালিনী। ধোকা কেটে নিতে হবে সমান মাপে। তারপর ভাজা হবে, তারপর ঝোল। এক নিরন্তর প্রক্রিয়ায় এই ঝোল, ঝাল, নিরামিষের পর্ব চলবে। বাটিতে তেঁতুল ভিজিয়ে রাখা আছে এক পাশে। মানকচুর ডালনায় দিতে হবে। যদিও শীতের দিন, তবুও গলা যে ধরবে না, তার স্থিরতা নেই। এইসব হলে, সব শেষে হবে চালতার অম্বল। উঠোনের কোণে চালতা গাছখানি বহু প্রাচীন। বড় বড় পাতা। ছায়া ঘিরে থাকে উঠোনের প্রান্ত জুড়ে। সাদা ফুলে ভরে গেলে কী চমৎকার যে দেখায়! পাকা চালতার গন্ধে পাখিরা ভীড় করে। এইসব দেখতে বড় ভালোবাসেন মৃণালিনী। রান্নাঘরের দাওয়ায় বসলেই এইসব নিবিড় গাছগাছালি তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। তখন আর ডালের ফোড়ন, হাড়ি-পাতিলের হিসেব নিয়ে ভাবতে তার ভালোলাগে না। সে তখন দেখে পাকা চালতা কেমন পাপড়ির পরতে পরতে নিজেকেই জড়িয়ে ধরে শীতের আহ্লাদে। পাকঘর নিয়েই যাদের জীবন তাদের জীবনে আর এমন আহ্লাদ জোটে কই? ছেলেবেলার কথা তখন তার মনে পড়ে যায়। সর্ষে ক্ষেতের গন্ধ তখন সেই কোন সুদূর থেকে তার নাকে এসে লাগে। নরম রোদে তেলের বাটিতে নারকেল তেল গলে যায় সকলের অলক্ষ্যে, পাখিরা চালতার পাতায় আড়াল খোঁজে। এবার তাকে উঠে পড়তে হবে। তার কি অবসরের অবকাশ আছে? সে এখন পাকা চালতার অম্বল বানাবে রাঙামুলো দিয়ে। নরম আঁচে চালতা সেদ্ধ হলে তাতে আলগোছে মেশাতে হবে আতপচাল আর নারকেল বাটা। তারও পরে দিতে হবে নতুন গুড়। বড় নরম এই পাক। শেষ পাতে চুমুক দিলে শরীর জুড়িয়ে যায় আরামে। এইসব স্নিগ্ধতা নিরামিষ হেঁসেল জুড়ে নিত্যদিন নিস্তরঙ্গ জলতরঙ্গের মতো ঘুরে ঘুরে পাক খায়। শাশুড়ির জন্য রাঁধতে রাঁধতে নিরামিষ হেঁসেলের এইসব স্নিগ্ধ আয়োজনকে নিজের মতো করে বুঝতে চায় এ’বাড়ির বড় বউ। এই চাওয়া বড় নিঃসাড়ে, নিজের মতো করে। মানুষের যৌনতাকে স্তিমিত করে রাখার নিছক কৌশল এসব। এই হেঁসেলে তাই জীবনের অনেক অনেক চাওয়া-পাওয়ার প্রবেশাধিকার নেই। তবু, মাঘের রোদ্দুর ওম ছড়ায় তার স্বভাবে। নারকেল তেল গলে যায় আতপ্ত তালুর সোহাগে। যৌবনের দাবী বড় বিপুল। চালতার ফুলের মতো ঘন-সবুজ পাতার আড়ালেও সে রোদ্দুর খোঁজে একা একা। নিরামিষ হেঁসেল তার নাগাল পাবে কি?

মানুষের জীবনে, – পুঁই, মুসুরি আর রূপচাঁদার ঝোলের বরাদ্দ না থাক, রোদ্দুরের উষ্ণতা তবু সে খুঁজে নেয়। খুঁজে নেবেই। মৃণালিনী এইসব ভাবতে ভাবতে নিরামিষ হেঁশেলের জানলাখানি আরেকটু ফাঁক করে দেন। আসুক – রোদ্দুর আসুক, হাওয়া আসুক। আমিষ গন্ধ আসুক। পাকঘরখানি ভাসুক রোদ্দুরে, জোছনায়, মানুষের আদরে। বড় ঠাণ্ডা এই ঘরখানি সেই কবে থেকে মানুষের উষ্ণতাটুকু পেতে চাইছে …

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]