তাহলে শুরু করা যাক গল্প…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

সর্ষের তেলের ঝাঁজ চোখে এসে লাগে। তবে, পেঁয়াজ দেয় না কিন্তু। এর পরে আছে সরপুঁটির মরিচ পোড়া ঝোল। পাতলা সোনালি তার রঙ। গরমের দিনে শেষবেলায় থাকে আমড়ার ডাল। খেলেই মুখ পরিষ্কার…
কলকাতা থেকে প্রাণের বাংলার জন্য নতুন একটি ধারাবাহিক লিখতে শুরু করলেন অধ্যাপক অমৃতা ভট্টাচার্য। তিনি বলছেন, এই গল্পের নানা পরিসর। আসলে গল্প তো নয়, গল্পের মতো যে জীবন তারই আখ্যান। আপনারা একে ছাপোষা বাঙালির ভাত ডাল মাছের ঝোলের গল্প বলতে পারেন, সে আপনাদের অভিপ্রায়। লেখা পড়তে পড়তে আমাদেরও মনে হয়েছে তেল-ঝাল-ঝোলের জগত নিয়ে নতুন আস্বাদের এই লেখা প্রাণের বাংলার পাঠকদের রসনাকেও তৃপ্ত করবে।

পাঁচ.

সারাদিন ধরে মাঘের রোদ্দুরে লেপকাঁথা সুজনি গরম হতে থাকে। কেউ এসে মাঝে মধ্যে উল্টে-পালটে দেয়।গোলাপজাম  গাছে বুরুশের মতো ফুল এসেছে।ফুলেফুলে ভরে গেছে গাছটা। পুকুরে আসতে যেতে বারে বারে মাথায় ছুঁয়ে যায় আনত ডাল আর গাঢ় সবুজ পাতারা। কুলোয় বড়ি শুকায়, লঙ্কা শুকায়, কুল শুকোয়। শীতের সঞ্চয় এসব। কলাইয়ের ডালের বড়িই হয় দু’তিন রকমের। কোনোটা হিং দিয়ে, কোনোটা আবার মশলা দিয়ে। ওলকপির বড়িও ভারী চমৎকার বানান মেজ পিসিমা। আর আছে মুসুরির ডালের ফুলবড়ি। ভাজা খাওয়ার। গৃহস্থ ঘরের এসব বড় ব্যক্তিগত সঞ্চয়। যার যার নিজের মত করে তার স্বাদ তার চেহারা। সেই যে গতবার মেদিনীপুর থেকে গয়না বড়ি পাঠিয়েছিলো সেজ ননদাই! সকলে তো খেয়ে অবাক! এমন ফুরফুরে বড়ি তারা জম্মে খায়নি। এ কি আর এক জন্মে হয়? কত কত বছর ধরে মা-মাসিদের হাতে হাতে, জিভের আস্বাদে তার নির্মাণ। রোদ্দুরের উঠানখানি তাই একটা ছবি হয়ে উঠতে চায়। রবি বর্মার ছবির মতো সে যেন বড় সজীব বড় বেশি চিত্রবৎ। আর আছে তেলের বাটি। সর্ষের তেলের জন্য, নারকেল তেলের জন্য। বাটি রোদে বসানোই থাকে। পুরুষেরা রোদ্দুরে পিঠ দিয়ে তেল মেখে ঘাটে চলে যান। মেয়ে বউরা তো আর আদুর গায়ে তেল মাখতে পারে না, তারা তখন আড়াল আবডাল খোঁজে। তবে মিঠে নারকেল তেল মাথায় দিলে বড় স্নিগ্ধ হয়ে যায় শরীর। সেই শীতের আগেই রাশি রাশি নারকেল পাড়া হয়। উঠোন জুড়ে নারকেল আর নারকেল। ঢোঁড়া সাপেরা কখনও তার গা বেয়ে বেয়ে চলে। সে ভারী মজার। তারপর একদিন মা-মাসি-পিসি সকলে মিলে সকাল সকাল রান্না সেরে নিয়ে নারকেল কোরাতে বসে। অত তেল হবে – সে কি আর একজনে পারে? কলাপাতা কেটে আনে পদ্ম ঝি। পাতা ধুয়ে, কুড়ানি ধুয়ে কাপড় ছেড়ে সকলে মিলে বসে। একদল নারকেল কোড়ায়, আরেকদল তখন নারকেল বাটে। বাটা হলে  সেই নারকেলের দুধ হবে। তবে সেই দুধ জাল হবে। জাল হতে হতে সাদা দুধ গলে যাবে। ফুটে ফুটে স্ফটিক স্বচ্ছ হলে তবে হবে তেল। এরা যদিও বলে ত্যাল। তো সেই ত্যাল তখন কিছু তুলে রাখবে আলাদা করে। আর কিছু নিমপাতায় ফুটিয়ে রাখা হবে। যা মিষ্টি! নইলে যে পিপড়া ধরে যায়! এই কাজ যেন কত কত বছর ধরে করছেন মৃণালিনী। বিয়ে হয়ে এই বাড়িতে আসার আগেও তার বাপের বাড়িতে এমন করেই তেল তৈরি হতো। তার দিদিমা, সেই কবে রাসের মেলা থাকে তাকে একখানি ছোটো ঘটি আর নারকেল কুড়ানি কিনে দিয়েছিলেন। সেও বড়দের সঙ্গে সেই কুড়ানি নিয়ে বসে পড়তো। দিদিমা চেঁচাতো, আরে ও মুখপুড়ি, বলি কাপড় ছেড়েছিস- না ছাড়িসনি! আজও যেন কানে বাজে । ভাবতে ভাবতে মৃণালিনীর মনে হয় এ যেন এক চক্রবৃত্তের পথ। মাস পক্ষ আর ঋতুক্রমের মতো গৃহস্থ হেঁসেলের একটানা সুর। যা কেবল বাজতেই থাকে, বাজতেই থাকে। যার কোনো ব্যত্যয় নেই। বছর বছর বাচ্চা বিয়ানোর মতোই যেন এক ক্রমান্বয় প্রক্রিয়া। তেল বানানোর পর এই তেল বোতলে তোলা হবে, তলায় পড়ে থাকা সুস্বাদু তলানি দিয়ে ছেলে-মেয়েরা সেদিন সন্ধ্যায় মুড়ি মেখে খাবে। চিনি দিয়ে মাখলে তার স্বাদ বেড়ে যাবে অনেক খানি। এই হলো সব শীতের সঞ্চয়ের তোড়জোড়। ঠিক যেমন বড়ি, যেমন আকাশমণি লঙ্কা, তেমনই। শুকিয়ে শুকিয়ে সব টিনে তোলা হবে। সেই টিন উঁচু তাকে তুলে রাখা হবে ভাঁড়ার ঘরে। বাচ্চাদের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে। তারপর সেই ঘরখানি সারাদিন শিকল তুলে একটেরে পড়ে থাকবে। প্রয়োজন মতো দিদি শাশুড়ি বা আর কেউ বের করে দেবেন রোজকার বরাদ্দ। এ যেন বাড়ির মধ্যেই একখানি রেশনের দোকান। সকলের জন্য নয় সেসব। বড় হিসেবের, বড় নিষেধের। মা-খালা নানীজানদের কড়া পাহারায় আগলানো মহিলা সমতির অপিস যেন এইসব হাড়ি পাতিলে ভরা ভাঁড়ার ঘর। না বাপু, একে গণতন্ত্র বলা চলে না। জেনানা মহলের সংবিধান বড় অগণতান্ত্রিক। সে কথা না হয় আরেকদিন বুঝিয়ে বলবো।

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]