তাহলে শুরু করা যাক গল্প…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

সর্ষের তেলের ঝাঁজ চোখে এসে লাগে। তবে, পেঁয়াজ দেয় না কিন্তু। এর পরে আছে সরপুঁটির মরিচ পোড়া ঝোল। পাতলা সোনালি তার রঙ। গরমের দিনে শেষবেলায় থাকে আমড়ার ডাল। খেলেই মুখ পরিষ্কার…
কলকাতা থেকে প্রাণের বাংলার জন্য নতুন একটি ধারাবাহিক লিখতে শুরু করলেন অধ্যাপক অমৃতা ভট্টাচার্য। তিনি বলছেন, এই গল্পের নানা পরিসর। আসলে গল্প তো নয়, গল্পের মতো যে জীবন তারই আখ্যান। আপনারা একে ছাপোষা বাঙালির ভাত ডাল মাছের ঝোলের গল্প বলতে পারেন, সে আপনাদের অভিপ্রায়। লেখা পড়তে পড়তে আমাদেরও মনে হয়েছে তেল-ঝাল-ঝোলের জগত নিয়ে নতুন আস্বাদের এই লেখা প্রাণের বাংলার পাঠকদের রসনাকেও তৃপ্ত করবে।

ছয়

বেলা পড়ে এলে যেমন ঘরে ঘরে বাতি জ্বলে, লম্ফ জ্বলে তেমনই মনের আঁধারে যখন ঘিরে ধরে মন তখন নিভৃতে একা একাই কুপি জ্বালাতে হয়। এই একক উদযাপন খুব সহজ তো নয়! তাই মায়েদের, মেয়েদের জীবনের আলো ক্রমে ক্রমে ধূসরতায় আবিল হয়। হেঁসেলের আঁচ তার উষ্ণতাটুকু ফিরিয়ে দিতে পারে না। যে শৈশব কৈশোর মানুষের ফাগুন দিনে রঙ ছড়ায় সে যেন এক ফেলে আসা বিগত উৎসব। এয়ো-স্ত্রীর অনুশাসনে ঘেরা জীবনে তার আর ফিরে আসার যো নেই। বড় বেশি ঘূর্ণায়মাণ এক জটিল আবর্ত এই সংসার। সেখানে পালা-পার্বণ একাদশী আছে, সেটুকু কে যদি বৈচিত্র্য বলো তবে তাই। তবু, তারও অতলে আছে বিবিধ মিথষ্ক্রিয়ার স্তর। মৃণালিনী এসব তার জীবন দিয়ে টের পায় প্রতিদিন। জ্ঞাতি গুষ্টি আত্মীয়-অনাত্মীয় এদের সকলকে দেখতে দেখতে একথা বারবার মনে হয়, – জীবন যাদের থেকে নিয়েছে শুধু, দেয়নি খুব বেশি কিছু তারা বড় অসহায়। আসলেই আসহায়। বাড়িতে নতুন বউ এলে সকলে যখন তার শাড়ি গয়না সব নেড়েচেড়ে দেখে তার মধ্যেও মিশে থাকে এক সামাজিক ব্যাধি। তা সহজে সারবার নয়। হেঁশেল আর ভাঁড়ারের ভাগ বাটোয়ারায় সেই বিষাদ বা বিদ্রোহ মিশে থাকে, মিশে যেতে থাকে দিনে রাতে। যার বরের পয়সা নেই তাকে গতর দিয়ে পুষিয়ে দিতে হয় অনেক সময়েই। তাকে উপযাচিকা হয়ে কড়াই মেজে দিতে হয়, মাছের ছোটো টুকরো খেতে হয়। সে যেন নিজে নিজেই টের পায়, মাছের মুড়ো আর ঘন দুধের বাটি তার জন্য নয়। যখন দুপুরের আলিস্যি ঘিরে ধরে এবাড়ির দেওয়াল চৌকাঠে, তখনও তাই নতুন বউ বসে বসে জাতি ঘোরায়,পুরনো তেঁতুল দিয়ে পেতলের বাসন মেজে সোনা- ঝকঝকে করে তোলে। দেশ-গাঁয়ে এসব যেন কাউকে শিখিয়ে দিতে হয় না। কত কত শ্যামলা মেয়ে আজন্ম মুখ চুন করে ঘুরে বেড়ায় একা একা। বৃহৎ যৌথ পরিবারের মাঝে থেকেও তারা যেন ভারী একলা। আরও আছে এমন কত কত বউ মেয়ে আমাদের ঘরে ঘরে। কেউ কেউ বছরে বছরে মেয়ে বিইয়ে যায়, কেউ বা বারমুখো স্বামীকে বশে আনতে অপরাগ। কী করবে তারা বলো? তাদের তো আর কিছু পুঁজি নেই? তাই তারা একা একা বেশি বেশি বাসন মাজে। পুকুর পাড়ে এক কাড়ি কাপড় সেদ্ধ নিয়ে বেলা অবধি বসে থাকে। শানে কাপড় ফেলে আছড়ায়। মৃণালিনী জানে, আছড়াতে আছড়াতে তাদের ক্রোধ,ঘৃণা সব ধুয়ে ধুয়ে মিশে যেতে থাকে পুকুরের জলে। বড় হিম শীতল সেই জল। সেই যেখানে রূপোলী মৃগেল তার নরম শরীর এলিয়ে দেয় বিষেদের দুপুরে। কেউ বা, মুখ চুন করে শাকান্ন খায় একা একা। মাছ ভালোবাসে সেও কিন্তু কী করবে বলো? বেকার বরের বউদের কত যে জ্বালা! সে খবর কি কেউ রাখে? এইসব নিয়েই একটা রাজনৈতিক প্রস্তাব একেকটা বাড়িতে তৈরি হয়, হতে থাকে সময়ের নিয়মে। রাঙা রাঙা রুইমাছের মুড়ো ল্যাজা কানকো পোটা সব সেই নিয়মে ভাগ হতে থাকে। ঘরে ঘরে। এই হলো জেনানা মহলের দস্তুর। আমাদের দেশ ভেদে, রাজ্য ভেদে, জাতি ভেদে আর্থিক বণ্টনের মতো। তবুও তো পেঁচা জাগে। গলিত স্থবির ব্যাঙ আরো দুই-মুহূর্তের ভিক্ষা মাগে – আরেকটি প্রভাতের ইশারায়। তাই ঘরে ঘরে শ্যামা মেয়েদের কেউ কেউ আদরের উষ্ণতা মাখে। কারো বা স্বামী মাছের এক পিঠ খেয়ে উঠে পড়ে। সে তো শুধু পেট ভরে গেছে বলে নয়! সে মাছ আর কেউ খাবে বলেই তো। এইসব দেখতে দেখতে মৃণালিনীর বিষাদ ধুয়ে যায়। রূপোলী মৃগেলের সঙ্গে তখন তার কথা জমে ওঠে নিভৃত নির্জন দুপুরে। পুকুরের কোল ঘেঁষে তখন কলমীর লতা হাওয়ায় হাওয়ায় দোলে। মৃণালিনী জানে, ওই আর্থিক বণ্টনের রাজনীতি পেরিয়েও মানুষের প্রেম ঠিক জিতে যাবে একদিন। জিতে যায় তো! নইলে কি অনন্তলতায় অহরহ রোদ্দুরের আনাগোনা চলতো?

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]