তাহলে শুরু করা যাক গল্প…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

সর্ষের তেলের ঝাঁজ চোখে এসে লাগে। তবে, পেঁয়াজ দেয় না কিন্তু। এর পরে আছে সরপুঁটির মরিচ পোড়া ঝোল। পাতলা সোনালি তার রঙ। গরমের দিনে শেষবেলায় থাকে আমড়ার ডাল। খেলেই মুখ পরিষ্কার…
কলকাতা থেকে প্রাণের বাংলার জন্য নতুন একটি ধারাবাহিক লিখতে শুরু করলেন অধ্যাপক অমৃতা ভট্টাচার্য। তিনি বলছেন, এই গল্পের নানা পরিসর। আসলে গল্প তো নয়, গল্পের মতো যে জীবন তারই আখ্যান। আপনারা একে ছাপোষা বাঙালির ভাত ডাল মাছের ঝোলের গল্প বলতে পারেন, সে আপনাদের অভিপ্রায়। লেখা পড়তে পড়তে আমাদেরও মনে হয়েছে তেল-ঝাল-ঝোলের জগত নিয়ে নতুন আস্বাদের এই লেখা প্রাণের বাংলার পাঠকদের রসনাকেও তৃপ্ত করবে।

সাত 

সংসারের আবর্তে দিন যায় মাস যায় বছর যায় ঋতু বদলায়। এই সেদিন লেপ সুজনি কেমন রোদ্দুরে গরম হচ্ছিলো, এখন সব তোরঙ্গে উঠবে উঠবে করছে। শীতের জাক কমে আসছে ধীরে ধীরে। শিমূলের পাতা ঝরা ডালে কুড়ি দেখা দিয়েছে ওই উঁচু আকাশের গায়ে। পুকুরের পথে দু‘পাশ বরাবর ঘেঁটু ফুলের মঞ্জরী আন্দোলিত হচ্ছে নতুন বসন্তের হাওয়ায়। ঘরে ঘরে এখন মা-মাসিদের দয়া হবে। হাম-বসন্তের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে সন্তর্পণে নির্ভার জীবন কাটাতে চাইবে মানুষ। ছেলেপুলে নিয়ে সম্বচ্ছর এই যে ভালো থাকার চেষ্টা একে কি স্বার্থপরতা বলা যায়? মৃণালিনী জানে না। জানতে চায়ও না বোধহয়। সুস্থ থাকা মানেই কি ভালো থাকা? বিকেল বিকেল চুল বেঁধে,কাপড় ছেড়ে কোচড় ভরে সে শিম তুলে আনে পশ্চিমের বেড়া থেকে। দুপুর দুপুর নিম শিম হবে, নিম বেগুন হবে – বাড়ির সকলে খাবে। এই যত্নের মধ্যে কি মিশে যেতে পারে আত্মরতি? পারেই তো! নয়তো সে কেন নিজের জন্য তুলে রাখবে নিম শিম? সেকি কেবল বসন্তের ছোয়া বাঁচাতে? তা তো নয়! সে ভালোবাসে। বড় ভালোবাসে এই তেতো। সেই যে ছেলেবেলায় তার রাঙাদিদিমা তাকে প্রথম গরাসে তেতো খাইয়ে দিত! কী অপূর্ব তার স্বাদ! ঘি চপচপে সেই শৈশবকে সে ফিরে পেতে চায়। কেউ না দিলেও সে নিজেই ফিরিয়ে দেয় এইটুকু। সকলের নজর এড়িয়ে এটুকুই তো! তাও কি সে পারে না?
বসন্তের রোদ্দুরে যখন আমের বোলে মৌমাছিরা উড়ে উড়ে বেড়ায় তখন তার মনখানি আর হেঁসেলের অন্ধকারে আটকা থাকতে চায় না। তখন তার ফোড়ন দিতে ভুল হয়ে যায়। গরমিল হয়ে যায় হিসেবে। তবু বউ মানুষের কি অত ভুলো হলে চলে? নাকি আত্মরতি এত প্রবল হলে চলে? বিয়ের আগে মা, সেজ মা কত বার করে বলে দিয়েছে, শাউড়ির ঘর করতে গিয়ে অত নোলা হলে চলে না। সেখানে আমার আমার করতে নেই। সেখানে পেট না ভরলেও ঠোঁট রাঙিয়ে হাসি মুখে আড় ঘোমটায় উজ্জ্বল হাসি হাসতে হয়। কেউ যেন তোমার দোষ ধরতে না পারে। কেউ যেন না বলে হাভাতের ঘরের মেয়ে। তবু একবাটি নিমশিম লুকিয়ে আলাদা করে তুলে রাখে সে। কেউ খোঁজ নেবে না, সে খেল কি খেল না। কর্তাদের খাওয়া হলে আঁশ নিরামিষ সব হেঁসেলের খোঁজ নিয়ে, কাজের লোকেদের বিলি ব্যবস্থা করতেই বেলা গড়িয়ে যায়। তখন নিজের মতো করে খেতে বসে মৃণালিনী। কোনোদিন খায়, কোনোদিন উঠে যায় নানা আছিলায়। কত কত দিন সে একা থেকে আরও একা হয়েছে বসন্তের দুপুরে সে খবর কেউ রাখেনি। না রাখাই যে দস্তুর। এই দস্তুরের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে আজ নিজের জন্য সামান্য নিমশিম তুলে রেখেছে এ বাড়ির বউ। ভারী যত্নে নিজেকে ভালোবেসে এটুকুই আর কিছু নয়। এ কথা আর কেউ জানবে না, জানতে চাইবেও না। নিজের মত করে আজ আসন পেতে একলা খেতে বসেছে মৃণাল। যত্নে পেতেছে ফুলদিদিমার করা আসনখানি। খাবার তো সামান্যই। তবু তাতে পারিপাট্যের ছোঁয়া দিতে চেয়েছে সে। বাটি ভরে নিয়েছে নিমশিম। আর এক পাশে বেড়ে নিয়েছে শিস পালঙের ঘণ্ট। এটুকুই। তবু, নিজেকে যত্ন করে খাওয়াবে সে আজ।মানুষ যেমন করে নিজেকে সাজায়, তার মধ্যেও তো মিশে থাকে ইন্দ্রিয় সুখের রোজনামচা। নিজের ভালো না লাগলেও যেমন করে সে কাচপোকার টিপ পরে বিশেষ বিশেষ রাতে, তেমনটি আজ করবে না। কিছুতেই না। খাওয়া হলে বড়ইয়ের আচার নিয়ে সে একা হবে খুব একা। তারপর, নরম আলোয় চুল বাঁধবে কাঁকই দিয়ে। সাবান মাটি দিয়ে মুখ ধোবে। নরম কাপড়ে গা ঢেকে আলোয়ান জড়াবে গভীর উষ্ণতায়। আজ শুধু নিজেকে ভালোবাসবে সে। একটু পরেই যখন মাঘী পূর্ণিমার চাঁদ উঠবে, তখন ওই উঁচু শিমূলের ডালে তার চোখ আটকিয়ে যাবে। সে তখন ঠিক দেখতে পাবে ফাগুনের আলোয় গাছেরা কেমন করে নিজেকে ভালোবাসে রাতভোর। দেখতে দেখতে নিজের জন্য নিমশিম লুকিয়ে রাখার আত্মগ্লানি তার ধুয়ে যাবে ক্রমশ। জোছনা যেমন করে ধুঁয়ে দেয় বিগত শোক, তেমন করে । ঠিক তেমন করে অন্তত আজকের রাতটুকু মৃণাল সব ভুলে নিজেকে ভালোবাসবে। হেঁশেলের বারান্দা তখন আলো মাখবে। ফাগুনের চাঁদের আলো। (চলবে)
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]