তাহলে শুরু করা যাক গল্প…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

অমৃতা ভট্টাচার্য

সর্ষের তেলের ঝাঁজ চোখে এসে লাগে। তবে, পেঁয়াজ দেয় না কিন্তু। এর পরে আছে সরপুঁটির মরিচ পোড়া ঝোল। পাতলা সোনালি তার রঙ। গরমের দিনে শেষবেলায় থাকে আমড়ার ডাল। খেলেই মুখ পরিষ্কার…
কলকাতা থেকে প্রাণের বাংলার জন্য নতুন একটি ধারাবাহিক লিখতে শুরু করলেন অধ্যাপক অমৃতা ভট্টাচার্য। তিনি বলছেন, এই গল্পের নানা পরিসর। আসলে গল্প তো নয়, গল্পের মতো যে জীবন তারই আখ্যান। আপনারা একে ছাপোষা বাঙালির ভাত ডাল মাছের ঝোলের গল্প বলতে পারেন, সে আপনাদের অভিপ্রায়। লেখা পড়তে পড়তে আমাদেরও মনে হয়েছে তেল-ঝাল-ঝোলের জগত নিয়ে নতুন আস্বাদের এই লেখা প্রাণের বাংলার পাঠকদের রসনাকেও তৃপ্ত করবে।

আট

ফাগুনের চাঁদ ওই উঁচু ডালে ধরা দিতে না দিতেই বসন্ত এসে পড়লো ঋজু ভঙ্গিমায়। ভোরের হাওয়ায় এখনও শিরিশিরে ভাব টের পাওয়া যায়। তখন আলগোছে কাঁথা, সুজনি টেনে নেয় ডাকাবুকো পুরুষেরাও। বাড়ির মেয়েদের অবিশ্যি আলসেমি করলে চলে না। বিছানার উষ্ণতা, সোহাগের ওম ফেলে রেখেই ব্যস্ত হয়ে পড়তে হয় গেরস্থালি কাজে। বাংলাদেশের ঘরে ঘরে ভোরের ছবি আছে যত তার মধ্যে মেয়েলি সকাল গুলো বোধহয় একইরকম। এবাড়িতেও তার ব্যত্যয় নেই। ফাগুনের নিমফুল ঝরা সকালেও না। মেজ পিসিমা থেকে দিদি শাশুড়ি, নতুন বউ থেকে দাঁতে মিশি লেপা ঝি সকলের জন্যই এক নিয়ম। সকাল গুলো যে আসলেই অন্যরকমের হয়, হতে পারে তা দেখবার ফুরসৎ কই? তবু, মৃণালিনী জল ছড়া দিতে দিতে ওই দূরে উদ্বাহু শালের মঞ্জরীর দিকে অপলক চেয়ে থাকে। তার মনে হতে থাকে সারা সারা রাত চাঁদের সোহাগ মেখে বীতকাম মঞ্জরীরা এখন ভোরের আতপ্ত আলোয় উদাসীন হতে চাইছে। এই উদাসীনতা শালের মঞ্জরীকে মানায়। বাড়ির বউকে নয়। তার কি বীতকাম হওয়ার জো আছে? তবু, এসব নিয়ে নালিশ করতে গেলে সংসার চলে না। লোকে বলবে, ওমা! বউটার আদিখ্যেতা দেখো!
এসব জানে মৃণালিনী। আর জানে বলেই জলের গভীরে চলা মাছের মতো বড় নিঃশব্দে সে প্রকৃতিকে দেখে। পুকুরের পথে এখন আলো হয়ে আছে ভাট ফুলেরা। মাটির গন্ধ মেখে বসন্ত বাঁধা পড়েছে ওইখানে। ওই পায়ে চলা পথের প্রান্তে, খিড়কির দুয়ার পেরিয়ে ব্যক্তিগত পরিসরের চলাচলে। এইসব নিয়েই তো গাঁ-ঘরের মেয়ে বউদের বসন্ত। শিবরাত্রির জন্য বেলপাতা বাছতে বাছতে, আকন্দের মালা গাঁথতে গাঁথতে কত শত বসন্ত মরে যায়। তার খবর কেই-বা রাখে? বছর বছর শিবরাত্তির এলেই মৃণালিনীর মনে পড়ে ইন্দুর কথা। পাড়াতুতো ননদ হলে কী হবে, বিয়ের পর সেই ছিলো এ পাড়ায় তার প্রথম বন্ধু, প্রথম সই। কত সব ব্রত করেছে তারা! শিবরাত্তিরে শিব গড়ে পুজো করেছে প্রহরে প্রহরে। বিন্দু মনে মনে শিবের মতো বড় চেয়েছিলো সত্য কিন্তু সে চাওয়ায় অন্যায় তো কিছু ছিল না! তবু, ইন্দুকে ফিরে আসতে হলো। তার কারণ যাইহোক না কেন। ইন্দু যা চেয়েছিলো তা তো সে পায়নি! তবু ইন্দু শিব রাত্তির করে। এখনও। এই করে যাওয়ার মধ্যে এক ধরণের বশ্যতা, এক ধরণের অভ্যাসের দায় কি মিলেমিশে থাকে না? থাকে। নিশ্চয়ই থাকে। বেলের পানা করতে করতে এইসব সাতপাঁচ ভাবে মৃণাল। আর ভেবেই বা কি করবে সে? তার মা-দিদিমা থেকে শুরু করে ননদ ভাজ সকলের সঙ্গে সেও তো নিরম্বু উপবাস করে চতুর্দশীর রাত জাগে। পাছা পেড়ে শাড়ি পরে যাত্রা শুনতে বসে চিকের আড়ালে। আসলে চাইলেও এই অলাতচক্র থেকে সে বেরোতে পারে না। এই না পারায় কিন্তু কোনো ক্ষোভ নেই। থাকবেই বা কেন? মৃণাল তো জানে, আর চোখেই শালের মঞ্জরী দেখতে হয়। কেই বা শুনেছে ঘোমটা খসিয়ে আদুর চোখে এয়োস্ত্রী বসন্তের আকাশ দেখে আক্ষেপানুরাগে আকুল হচ্ছে! ওসব নাটলীলায় হয়। শিব রাত্তিরের রাতে চাঁদোয়া খাটিয়ে ওই যে সেবার অন্নদামঙ্গল হলো, সেই বা বিরহানলে জ্বলে পুড়ে মরলো অগনিত বউ-ঝিরা – সে তো সত্যি নয়। সে তো গল্প। সে তো কেচ্ছা। বাংলাদেশের অন্দরমহলে কুমারী মেয়ে পোয়াতি হয়ে পেট খসাতে পারে কিন্তু তাই বলে কি সে শিব পুজো করবে না? ভাট ফুল মাড়িয়ে জল আনবে না? ভাবতে ভাবতে সব যেন তালগোল পাকিয়ে যায়। মৃণাল হয়তো অন্যদের থেকে একটু অন্যরকম কিন্তু তাই বলেও সে কতটুকুই বা ভাবতে পারে? সে তো নন্দিনীকে চেনে না! কিশোরকেও না। সে কী করে জানবে, মারের মুখের উপর দিয়েও রক্তকরবী এনে দেওয়ার কত সুখ! সে তাই সাবু খেয়ে পাটপাতার জল খেয়ে উপবাস ভঙ্গ করে। ইশ্‌ মৃণাল যদি জানতো, কত কত মেয়ে কত কত উপোসী রাত কাটায় কত কত উপোসী বসন্ত কাটায়! আহা রে, মৃণাল যদি জানতো! (চলবে)

ছবিঃ গুগল

 

 

 

 

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]