তাহলে শুরু করা যাক গল্প…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সর্ষের তেলের ঝাঁজ চোখে এসে লাগে। তবে, পেঁয়াজ দেয় না কিন্তু। এর পরে আছে সরপুঁটির মরিচ পোড়া ঝোল। পাতলা সোনালি তার রঙ। গরমের দিনে শেষবেলায় থাকে আমড়ার ডাল। খেলেই মুখ পরিষ্কার…
কলকাতা থেকে প্রাণের বাংলার জন্য নতুন একটি ধারাবাহিক লিখতে শুরু করলেন অধ্যাপক অমৃতা ভট্টাচার্য। তিনি বলছেন, এই গল্পের নানা পরিসর। আসলে গল্প তো নয়, গল্পের মতো যে জীবন তারই আখ্যান। আপনারা একে ছাপোষা বাঙালির ভাত ডাল মাছের ঝোলের গল্প বলতে পারেন, সে আপনাদের অভিপ্রায়। লেখা পড়তে পড়তে আমাদেরও মনে হয়েছে তেল-ঝাল-ঝোলের জগত নিয়ে নতুন আস্বাদের এই লেখা প্রাণের বাংলার পাঠকদের রসনাকেও তৃপ্ত করবে।

অমৃতা ভট্টাচার্য

নয়  

এ বছর শিব রাত্তির পোহাতেই হুড়মিড়িয়ে দোল এসে পড়লো। ছেলেপুলেরা নেড়া পোড়ার আয়োজনে ব্যস্ত। গিন্নিরাও বাড়ির কাজ সামলিয়ে আমোদে যোগ দিতে চায়। মৃণালিনী দাওয়ায় বসে বসে কুচকুচ করে জাতি দিয়ে সুপুরি কাটে আর মজা দেখে। এইসব উৎসবের দিন তার ভারী ভালো লাগে। দোলের দিনে মানুষে মানুষে এই যে রঙ খেলার উৎসব এর একটা মাহাত্ম্য আছে। কত রাগ কত অভিমান এই রঙে মিলেমিশে যায়। তাই তো মৃণালের খালি মনে হয়, কেবলই মনে হয় এইসব এমন উৎসব আরও হোক।মানুষের সাদা কালো মন রঙিণ হোক খোল করতাল আর সংকীর্তনের ধুলোয় ধুলোয়।
প্রতি বচ্ছর এই বসন্তে গাছেরা ফুলে ফুলে ভরে ওঠে, পাখিরা উড়ে বেড়ায় এই ডাল থেকে সেই ডালে। আমের বোলের গন্ধ ঘিরে থাকে এ পথ সে পথ জুড়ে। এমন দিনে কি মান করা সাজে? বসন্তের হাওয়া মানুষের অভিমান মুছে দেয়। তাই তো রান্নাঘরের পিছনে শিমূল গাছ রাঙা হয়ে থাকে, তাই তো গিরিপুষ্প তার নরম রঙের ফুল ঝরায় নিজের খেয়ালে। এমন দিনে অবিশ্যি ঘরে ঘরে হাম-বসন্তের ছোঁয়াচ লাগে। ভাতের পাতে সজনা ফুল আর যক্তি ফুল তখন নিরাময়ের পথ্যি হয়ে ওঠে। কেউ বা আবার মা শেতলার স্মরণ নেন। সেই যে এক দেবী আছেন না, -‘ গর্দভ উপরি সাজের আরম্ভ/ মাথায় সোনার কুলো কাঁখে হেমকুম্ভ’! ভারী চমৎকার মায়ের মুখখানি। মৃণালিনীর কিছুতেই তাকে বসন্ত আর কলেরার দেবী বলে ভাবতে ভালো লাগে না। কে যেন সেই ছোটবেলায় তাকে বলেছিলো, মা শেতলাই হলেন জ্যেষ্ঠা দেবী। হ্যা, মনে পড়েছে সেই মাঠের পাশের উমনো দিদি। উমনো দিদি তাদের বাড়িতে চাল কুটতে আসতো। ঢেকির পাড় দিতে দিতে উমনো দিদি গল্প বলতো। সেই যে দেবতারা যখন সমুদ্র মন্থন করলো, তখন সুমুদ্দুরের তলা থেকে এক দেবী উঠে এলো। তার হাতে রক্তকমল, তার গলে রক্তমালা। কেউ বললো, এই হলো লক্ষ্মীর বড় বোন। ইনি দুর্ভাগ্যের দেবী। এর নাম জ্যেষ্ঠা। মাগো, এমন দেবীকে কে বিয়ে করবে বলো!
দেবতা, অসুর কেউ তাকে বিয়ে করতে চাইলো না। তখন, মহাতপা দুঃসহ তাকে বিয়ে করলো বটে, কিন্তু ঘর করতে পারলো না। তাকে ত্যাগ দিলেন। এই দেবীরই অংশ মা শেতলা। রক্ষা কোরো মা, ছেলে পুলে নাতি পুতি নিয়ে ঘর করি মা। এইসব বলতে বলতে উমনো দিদি গলায় আঁচল দিয়ে হাত জোড় করতো। বসন্তের হাওয়া তখন অনেক চেষ্টাতেও তার আঁচল খসিয়ে দিতে পারতো না। পাকা চুলে লাল সিঁথি উজ্জ্বল হয়ে থাকতো শেষবেলাকার আকাশটার মতো। মৃণালের খালি মনে হতো আহারে! জ্যেষ্ঠাকে কেউ বিয়েই করতে চায় না? দুর্ভাগ্য কি মানুষের ঘর পর মানে? মহাতপা দুঃসহ যাকে ত্যাগ করলো তার কি হবে? তাকে তো আর কেউ নেবে না! বরে না নিলে তখন কী করতে হয় মৃণাল তা জানে না। তবে জানতে চায়। তার খালি মনে হয় সেইসব ঘরছাড়া মেয়েদের দুঃখ বসন্তের ফুল হয়ে ফোটে বুঝি বা।
প্রতিবার দোলযাত্রার দিনে তাদের বাড়িতে নারায়ণের পুজো হয়। রঙ খেলা হয়ে গেলে সারা পাড়া যখন রঙিণ হয়ে থাকে তখন তাদের বাড়ি ভরে থাকে ফুলে আর ধুপের গন্ধে। প্রতি বচ্ছর বোষ্টম দিদি এই দিনে তাদের বাড়িতে আসে। রসকলি কাটা কী লাবণ্যময়ী যে সে! খঞ্জনি বাজিয়ে যখন সে গান ধরে আহা! বড় সুন্দর সে গান। গৌরের নাম শুনতে শুনতে তখন তন্ময় হয়ে যায় এ বাড়ির অনেকেই। ভিড় একটু পাতলা হলে প্রসাদী ফল বাতাসা নিয়ে মৃণাল গিয়ে বসে তার পাশে। চন্দনের গন্ধে সুরভিত বোষ্টম দিদি কত গল্প করে। মৃণাল কত দিন ধরে ভেবেছে, – একা একা পথ চলতে বোষ্টম দিদির ভয় করে না? একা একা থাকতে পারে সে কেমন করে? বোষ্টম দিদি বলে, সে তো একা নেই তার তো গৌর আছেন, মাধব আছেন! মৃণাল ঠিক বুঝে উঠতে পারেনা এসব কথার ভিতরের বিষয়টি। মনে মনে অনেক অঙ্ক মিলিয়ে দিতে চায় সে এই দোলযাত্রার দিনে। তার কেবলই মনে হয়, সেই জ্যেষ্ঠা দেবীও ঠিক তার বোষ্টম দিদির মতো। একা একা পথ চলতে সে ভয় পায় না। যার গৌর আছে সে যেমন একা নয়, তেমনই যার অশোক পালাশ আর গিরিপুষ্প আছে সেও। দোলযাত্রা ফুরোবে আজ না হয় কাল কিন্তু বোষ্টম দিদিদের পথ চলার শেষ নেই। পথ তাদের ডেকেছে।

ছবিঃ গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]