তাহলে শুরু করা যাক গল্প…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সর্ষের তেলের ঝাঁজ চোখে এসে লাগে। তবে, পেঁয়াজ দেয় না কিন্তু। এর পরে আছে সরপুঁটির মরিচ পোড়া ঝোল। পাতলা সোনালি তার রঙ। গরমের দিনে শেষবেলায় থাকে আমড়ার ডাল। খেলেই মুখ পরিষ্কার…
কলকাতা থেকে প্রাণের বাংলার জন্য নতুন একটি ধারাবাহিক লিখতে শুরু করলেন অধ্যাপক অমৃতা ভট্টাচার্য। তিনি বলছেন, এই গল্পের নানা পরিসর। আসলে গল্প তো নয়, গল্পের মতো যে জীবন তারই আখ্যান। আপনারা একে ছাপোষা বাঙালির ভাত ডাল মাছের ঝোলের গল্প বলতে পারেন, সে আপনাদের অভিপ্রায়। লেখা পড়তে পড়তে আমাদেরও মনে হয়েছে তেল-ঝাল-ঝোলের জগত নিয়ে নতুন আস্বাদের এই লেখা প্রাণের বাংলার পাঠকদের রসনাকেও তৃপ্ত করবে।

এক.

তাহলে শুরু করা যাক গল্প। সেই যে এক দেশ ছিলো সবুজ মাঠ আর নদী পুকুর বিল আর শাপলায় ঘেরা। সেখানে পাখি ছিলো, ফুল ছিলো। ঋতুতে ঋতুতে পালা-পার্বণের অগাধ আয়োজন ছিলো। আর ছিলো গেরস্তের সুখ- দুঃখ ঘেরা জীবন। সুখু দুখুর গল্পের মতো সেখানে গল্পের লাটাই কেবলই গড়িয়ে চলতো এক থেকে আরেক উপাখ্যানে। সেই দেশে রাজপুত্র রাজকন্যাদের বিয়েতে পায়েসের পুকুর কাটা হতো। গাঁয়ের মানুষ মাসভর কবজি ডুবিয়ে খেতো। কতো কতো সব সুখ্যাত করতো তারা সে আর কি বলবো! তারপর উৎসব ফুরোলে আবার তাদের জীবনে ফিরে আসতো আউশ ধানের গন্ধ, রূপোলী ফলুই মাছের আদুরে স্নিগ্ধতা। এইসব জীবন এখন সময়ের ইজেল হয়ে থমকে গেছে। তাকে খুঁজে নিতে হবে সযতনে। আর সে

পথেই আমার দেখা হয়ে যায় কত কত মানুষের সঙ্গে। তাদের কেউ বা মাছ ধরে, কেউবা ধান বোনে, কেউ বা আমার অ্যালুমনিয়ামের টিফিন কৌটো ঝুলিয়ে বাপের জন্য পান্তা নিয়ে যায় বিল-ধারের জমিতে। আসলে তারাই এই গল্পের চরিত্র। তারা আমায় চিনিয়ে দেয় কেমন ভাবে কাদায় গোড়ালি ডুবিয়ে ধান রুইতে হয় । আল মাহমুদের কবিতার মতো নিবিড় বর্ষায় আমোদিত হই আমি। এইসব নিয়েই এই গল্পের নানা পরিসর। আসলে গল্প তো নয়, গল্পের মতো যে জীবন তারই আখ্যান। আপনারা একে ছাপোষা বাঙালির ভাত ডাল মাছের ঝোলের গল্প বলতে পারেন, সে আপনাদের অভিপ্রায়। নামে কীই-বা যায় আসে বলুন, তবে ঢুকে পড়া যাক কোনো এক সময়ের গহ্বরে। সেই যেখানে যমুনা নদী ছিল, আম-কাঁঠালের বাগান ছিল আর ছিল নগর বাড়ির ঘাট। সেই ঘাট বরাবর কিছুদূর গেলেই ভটচায বাড়ি। এরা হল মথুরার ভটচায। বাড়ি ভর্তি লোক। সারাদিন যেন বাড়িখানি গমগম করছে কল্লোলে কোলাহলে। এবাড়িতে পাত পড়ে অনেকগুলি। ছেলেরা সব খেতে বসে সার দিয়ে। সেটাই দস্তুর। মেয়েদের ব্যবস্থা পরে। সে তাদের খিদে পাক আর ছাই নাই পাক। গরম ভাতে ঘি মেখে নিতে নিতে লঙ্কার গুঁড়ো মেখে নেয় তারা। ধুতির খুট দিয়ে নাক মোছে বার বার। তারপর বেলেমাছের ভর্তা দিয়ে ভাত মেখে নেয়। এই ভর্তায় আদার গন্ধ ভুর ভুর করে। সর্ষের তেলের ঝাঁজ চোখে এসে লাগে। তবে, পেঁয়াজ দেয় না কিন্তু। এর পরে আছে সরপুঁটির মরিচ পোড়া ঝোল। পাতলা সোনালি তার রঙ। গরমের দিনে শেষবেলায় থাকে আমড়ার ডাল। খেলেই মুখ পরিষ্কার। আর আসে পাথরের বাটিতে পাতা দই। গুমোট গরম পড়লে দইয়ে একটা ভ্যাপসা গন্ধ হয়। এইসব ফুরোলে তাদের বাড়িতে ভাতঘুমের দুপুর নামে নিরালা নিঃঝুম। তবে, এ হল পুরুষমহলের কথা। মেয়েদের খাওয়া হবে এইবার। তারপর রান্নাঘর পরিষ্কার হলে, নিভু আঁচে দুধের কড়াই আগুন পোহাবে দুপুর ভর। রাত্তিরে সববাই আম দিয়ে ঘন দুধ খাবে। কেউ বা কাঁঠালের রস দিয়ে ক্ষীর খাবে। খুব সামান্য, তবে নিপাট আয়োজন প্রতিদিনের এই ঘরকন্নায়। প্রথম পাতের তেতো থেকে শেষ পাতের দুধ-দই এর যেন ছেদ নেই কোনো। এ বাড়ির বড় বউমার হাতের খ্যাতি আছে। সে বড় যত্ন করে আচার বানায়। নিজেই শুকোয়, বয়মে ভরে, রোদে দেয়। কেউ ধরতে গেলে বিরক্ত হয়। বাচ্চারা কেউ হাত পাতলে চামচে করে অল্প তুলে হাতের তালুর উপর দিয়ে বলে, নে দ। আর বড় সুন্দর করে সে ভর্তা বানায়। ওল সেদ্ধয় দেয় সর্ষেবাটা আর গন্ধলেবুর রস তো মটর ডাল সেদ্ধয় দেয় মরিচ পোড়া। বড় কম মশলায়, বড় স্নিগ্ধ তার হাতের ঝোল। যখন সে কড়া নামায় তখন রান্নাঘরের পুবদিকে পেঁপেগাছ খানি আলো করে বসে ল্যাজঝোলা ফিঙে। এদিক ওদিক চেয়ে বাস নেয় সে-ও। কোনো মশলা নেই পাতি নেই শুধুই ফোড়নের ঝোল। সে বড় সাধারণ। গেরস্ত ঘরের নিরাভরণ কিশোরী মেয়েটির মতো সে যেন লাবণ্যে ভরপুর। ফোড়নও কি এক রকমের কত যে তার ভেদ কত যে তার বৈচিত্র্য। সে গল্প তবে আরেকদিন হবে। আগে তো তেল গরম হোক!

(চলবে)
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]